ভূমিকা:
ভারতের সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা ছিল একটি বিশেষ সাংবিধানিক বিধান, যা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় আলাদা মর্যাদা প্রদান করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় জম্মু ও কাশ্মীরের শাসক মহারাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন। সেই প্রেক্ষাপটে সংবিধানে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে এই ধারা সংযোজন করা হয়।
৩৭০ নম্বর ধারা অনুসারে, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে ভারতের সংসদের আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে প্রযোজ্য হতো না, যদি না রাজ্য সরকার সম্মতি দিত। এর ফলে রাজ্যটির নিজস্ব সংবিধান ও পৃথক পতাকা ছিল। এই বিশেষ মর্যাদা ভারতের সংবিধানের “অস্থায়ী, অন্তর্বর্তী ও বিশেষ বিধান” অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে এই ধারাটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। অনেকের মতে এটি কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় সহায়ক ছিল, আবার অন্যদের মতে এটি জাতীয় সংহতির পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। অবশেষে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে ৩৭০ নম্বর ধারার অধিকাংশ বিধান বাতিল করে এবং জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে।
এই সিদ্ধান্ত ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩৭০ নং ধারার মূল উদ্দেশ্য:
৩৭০ নং ধারা সংবিধানের একবিংশ অনুচ্ছেদে (Part XXI) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল— জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত রাখার পাশাপাশি তাকে কিছু স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার প্রদান করা।
এই ধারার মাধ্যমে বলা হয়েছিল যে— ভারতের সংবিধানের সব ধারা জম্মু ও কাশ্মীরে প্রযোজ্য হবে না। শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও যোগাযোগ বিষয়গুলি কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করবে, আর বাকিগুলো রাজ্য সরকার নিজে সিদ্ধান্ত নেবে।
এই ব্যবস্থার ফলে কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান, পতাকা এবং আইন প্রণয়নের স্বাধীনতা ছিল। অর্থাৎ, কাশ্মীর ভারতের অংশ হলেও, তার প্রশাসনিক কাঠামো অনেকটাই আলাদা ছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর জম্মু ও কাশ্মীর একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে অবস্থান করছিল। পাকিস্তানি অনুপ্রবেশের পর, মহারাজা হরি সিং ভারতীয় সরকারের সঙ্গে অভ্যর্থনা চুক্তি (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে রাজ্য ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে মহারাজা চাননি যে কেন্দ্র সরকার রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক। তাই সংবিধান প্রণয়নের সময় এই বিশেষ চুক্তির ভিত্তিতে ৩৭০ নং ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই ধারাটি ছিল অস্থায়ী ব্যবস্থা (Temporary Provision), কিন্তু বাস্তবে এটি প্রায় সাত দশক ধরে চালু ছিল।
৩৭০ নং ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- ভারতের সংবিধানের অনেক ধারা জম্মু ও কাশ্মীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হতো না।
- রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় আইনগুলিকে অনুমোদন না দিলে, সেগুলি রাজ্যে কার্যকর হতো না।
- রাজ্যের নিজস্ব সংবিধান ছিল, যা ১৯৫৭ সালে গৃহীত হয়।
- রাজ্যের নাগরিকদের জন্য ছিল বিশেষ “স্থায়ী বাসিন্দা (Permanent Resident)” মর্যাদা, যার মাধ্যমে তারা জমি কেনা, সরকারি চাকরি পাওয়া ইত্যাদিতে বিশেষ সুবিধা পেতেন।
৩৭০ নং ধারার বাতিলকরণ:
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার (নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার) এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। রাষ্ট্রপতির এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে (Presidential Order, 2019) ৩৭০ ধারা কার্যত বাতিল ঘোষণা করা হয়।
পরদিন, সংসদে “Jammu and Kashmir Reorganisation Act, 2019” পাশ হয়, যার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল—
- জম্মু ও কাশ্মীর।
- লাদাখ।
— এ বিভক্ত করা হয়।
এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই কেন্দ্রের সব আইন সেখানে প্রযোজ্য হয়।
সুপ্রিম কোর্টের রায়:
৩৭০ নং ধারা বাতিলের পর বেশ কিছু সংস্থা ও রাজনৈতিক দল এর বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানায় এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতিক্রমে রায় দেয় যে ৩৭০ নং ধারা বাতিলের প্রক্রিয়া সংবিধানসম্মত ও বৈধ ছিল। এর ফলে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা শেষ হওয়ার সিদ্ধান্ত স্থায়ীভাবে বহাল থাকে।
বাতিলকরণের প্রভাব:
আইন ও প্রশাসনে পরিবর্তন:
কাশ্মীরে এখন ভারতের সব কেন্দ্রীয় আইন প্রযোজ্য। করব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিচারব্যবস্থা—সবই ভারতের সাধারণ আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
জমি ও সম্পত্তির অধিকার:
আগে শুধুমাত্র কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা জমি কিনতে পারতেন। এখন ভারতের যে কোনো নাগরিক জম্মু ও কাশ্মীরে জমি ক্রয় করতে পারেন।
রাজ্য মর্যাদা হ্রাস:
কাশ্মীর আর পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়। এখন এটি একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, অর্থাৎ সেখানে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে কেন্দ্র সরকারের হাতে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব:
৩৭০ নং ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বহু দল ও সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। তবে কেন্দ্রের মতে, এই পদক্ষেপ কাশ্মীরকে ভারতের মূলধারায় আনতে সাহায্য করবে।
সমালোচনা ও বিতর্ক:
- অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই ধারা বাতিল করা হয়েছে রাজ্য সরকারের সম্মতি ছাড়াই, যা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।
- বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বলেছে, এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন।
- মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, এই সিদ্ধান্তে কাশ্মীরবাসীর স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
- অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, ৩৭০ ধারা ছিল ভারতের ঐক্যের পথে বাধা, যা অপসারণের ফলে এখন জম্মু ও কাশ্মীরও পূর্ণাঙ্গভাবে ভারতের অংশ হয়েছে।
উপসংহার:
ভারতের সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এটি ভারতের সংবিধান ও ফেডারেল কাঠামোকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। যদিও এটি মূলত অস্থায়ী ধারা ছিল, কিন্তু সাত দশক ধরে তা ভারতের ঐক্য ও সংবিধান নিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
২০১৯ সালে এই ধারা বাতিলের মাধ্যমে ভারত সরকার নতুন যুগের সূচনা করেছে— যেখানে জম্মু ও কাশ্মীরের ওপর কেন্দ্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ— শান্তি, উন্নয়ন ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপ ভারতের ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করবে কিনা, তা সময়ই প্রমাণ করবে।
সুতরাং বলা যায়, ৩৭০ ধারার ইতিহাস কেবল একটি আইনি প্রবন্ধ নয়, বরং ভারতের ঐক্য, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের এক গভীর শিক্ষা।