ভূমিকা:
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে অশোক এক অনন্য ও স্মরণীয় শাসক, যাঁর জীবন ও নীতির মধ্যে শক্তি ও মানবিকতার এক বিরল সমন্বয় দেখা যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট এবং তাঁর শাসনকাল ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক ঐক্য ও প্রশাসনিক সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ যুগ হিসেবে বিবেচিত। পিতা বিন্দুসার-এর মৃত্যুর পর অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং প্রথমদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারেই মনোনিবেশ করেন।
অশোকের জীবনের মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল কলিঙ্গ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে। ফলস্বরূপ তিনি যুদ্ধনীতি ত্যাগ করে ‘ধর্মবিজয়’-এর আদর্শ গ্রহণ করেন। তাঁর ধর্মনীতি ছিল কেবল বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ছিল নৈতিকতা, সহিষ্ণুতা, অহিংসা ও প্রজাকল্যাণের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক মানবিক শাসনদর্শন। তাঁর শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি থেকে জানা যায় যে তিনি প্রজাদের নৈতিক উন্নতি ও সামাজিক সম্প্রীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
অশোকের শাসনকাল প্রমাণ করে যে একজন শক্তিশালী সম্রাটও মানবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শাসনব্যবস্থাকে ন্যায় ও কল্যাণমুখী পথে পরিচালিত করতে পারেন। তাই তাঁর জীবন ও ধর্মনীতি ভারতীয় ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
অশোকের বংশপরিচয়:
মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট অশোক খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সম্রাট বিন্দুসার এবং মাতা ধর্মা (মতান্তরে সুভদ্রাঙ্গী/চম্পার রাজকন্যা)। অশোকের স্ত্রীরা ছিলেন— তিশ্যারাক্ষা, পদ্মাবতী, কারুভাকী ও বিদিশা।
অশোকের সিংহাসনলাভ:
মাত্র ১৮ বছর বয়সে অশোক উজ্জয়িনীর রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। তক্ষশীলায় বিদ্রোহ দমনে সাফল্যের পর তিনি সেখানে শাসকের দায়িত্ব পান। বিন্দুসারের অসুস্থতার পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং অশোক বহু প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইকে পরাজিত ও হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। সিংহলি কাহিনিতে বলা হয়, তিনি নাকি ৯৯ জন ভাইকে হত্যা করেছিলেন, এ জন্যই তিনি “চণ্ডাশোক” নামে পরিচিত হন।
তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দে সিংহাসনে বসেন এবং ২৬৯ অব্দে তাঁর অভিষেক হয়। রাজা হিসেবে তিনি “দেবানাম প্রিয় পিয়দাসী” উপাধি গ্রহণ করেন।
অশোকের কলিঙ্গ জয়:
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০–২৬৩ অব্দে অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। কলিঙ্গবাসীরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় ১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং ১.৫ লক্ষ মানুষের বন্দী হওয়ার ঘটনা অশোককে গভীরভাবে বিচলিত করে। কলিঙ্গযুদ্ধের রক্তপাত তাঁকে পরিবর্তিত করে; তিনি যুদ্ধনীতি ত্যাগ করে অহিংসা নীতি গ্রহণ করেন। “চণ্ডাশোক” থেকে তিনি রূপান্তরিত হন “ধর্মাশোক”-এ।
বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ ও ধর্মযাত্রা:
কলিঙ্গবিধ্বস্ততার পর তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু উপগুপ্তের কাছে দীক্ষা নেন। পরবর্তীতে তিনি বুদ্ধগয়া, সারনাথ, লুম্বিনী, কুশীনগরের মতো তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন। অশোক বিহারযাত্রার পরিবর্তে ধর্মযাত্রা শুরু করেন— যার উদ্দেশ্য ছিল দান-ধ্যান, বুদ্ধের বাণী প্রচার এবং নৈতিক উন্নতি।
অশোকের জনকল্যাণমূলক কাজ:
অশোক ছিলেন ভারতের প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রথম বৃহৎ জনকল্যাণমূলক নীতিনির্ধারক সম্রাট। তিনি—
- জনগণের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
- পথের ধারে বিশ্রামঘর, কূপ, জলাধার নির্মাণ করেন।
- পশুপাখির জন্যও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
- প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
- সিরিয়া, মিশর, সিংহল, থাইল্যান্ড, মায়ানমার প্রভৃতি অঞ্চলে ধর্মপ্রচারক পাঠান।
- রাজ্যে ধর্মমহামাত্র, যুক্ত ও মহাপাত্র প্রভৃতি নতুন প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি করেন।
অশোকের ধর্মনীতি:
অশোকের ধর্মনীতি মূলত বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষার উপর ভিত্তি করে গঠিত। তাঁর ধর্মনীতির মূল দিকগুলো:
- অহিংসা ও সহিষ্ণুতা।
- সকল সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
- প্রজাদের প্রতি রাজকর্মচারীদের সদাচরণ।
ধর্মপ্রচার ও নৈতিক উন্নতি:
বৌদ্ধ সংঘে ঐক্য স্থাপনের জন্য তিনি পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সংঘীতি আহ্বান করেন এবং পুত্র মহেন্দ্রকে সিংহলে ধর্মপ্রচারের জন্য পাঠান।
অশোকের লিপি ও স্তম্ভ:
অশোক তাঁর বাণী ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে পাথর, স্তম্ভ, পর্বতগুহায় খোদাই করান। এই লিপিগুলোকে বলা হয় অশোকলিপি। ব্রাহ্মীলিপি মৌর্য যুগে সর্বাধিক ব্যবহৃত হওয়ায় একে কখনও মৌর্যলিপিও বলা হয়।
অশোকস্তম্ভ ও অশোকচক্র:
অশোক কর্তৃক নির্মিত সবচেয়ে বিখ্যাত স্মারক হল সিংহচতুর্মুখ অশোকস্তম্ভ— যার উপরের চার সিংহ বর্তমানে ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
স্তম্ভে:
- চারটি সিংহ একে অপরের পিছনে যুক্ত।
- নিচে রয়েছে হাঁটা ঘোড়া, ষাঁড়, সিংহ ও হাতি।
- মাঝখানে খোদিত অশোকচক্র, যার ২৪টি শলাকা নৈতিক গুণ ও কর্তব্যের প্রতীক।
লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
অশোক বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী পরিদর্শন করে সেখানে একটি স্তম্ভ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে এই স্তম্ভ আবিষ্কারের ফলে বুদ্ধের আসল জন্মস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ফা-হিয়েন তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে এই স্তম্ভের উল্লেখ করেন।
সারনাথের অশোকস্তম্ভ:
১৯০৫ সালে ওয়ের্টেল সারনাথে অশোকের স্তম্ভাংশ উদ্ধার করেন। এখানকার সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষই ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়েছে (২৬ জানুয়ারি ১৯৫০)। প্রতীকের নিচে খোদিত আছে— “सत्यमेव जयते”।
অশোকের মৃত্যু:
খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ অব্দে অশোক মৃত্যুবরণ করেন। কিছু তিব্বতীয় কিম্বদন্তী অনুসারে তিনি তক্ষশীলায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
উপসংহার:
অশোক সম্রাটের জীবন এক বিরল ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যেখানে একজন বিজয়ী ও ক্ষমতাশালী শাসক আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নৈতিক ও মানবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর তাঁর মানসিক পরিবর্তন তাঁকে এক নতুন পথে পরিচালিত করে, যেখানে যুদ্ধ ও জয়লাভের পরিবর্তে শান্তি, সহিষ্ণুতা ও প্রজাকল্যাণ প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। তাঁর ‘ধর্মনীতি’ মূলত ছিল মানবিক মূল্যবোধের প্রচার—সত্যবাদিতা, দয়া, সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সম্প্রীতি।
অশোকের শাসনভার গ্রহণের মাধ্যমে মৌর্য সাম্রাজ্য কেবল ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হয়নি; নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তা এক উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছায়। তাঁর প্রবর্তিত শিলালিপি ও স্তম্ভলিপি প্রশাসনিক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অভিনব পদ্ধতি ছিল। পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের আন্তর্জাতিক বিস্তারে তাঁর অবদান ভারতীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে।
সবশেষে বলা যায়, অশোক কেবল একজন সামরিক বিজয়ী সম্রাট নন; তিনি ছিলেন নৈতিক শাসনের প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে প্রকৃত মহানতা শক্তির প্রদর্শনে নয়, বরং মানবিকতা ও ন্যায়বোধে নিহিত। তাই অশোক সম্রাট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।