ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি কি? Brahmaka Style.
ভারতীয় উপমহাদেশে শাড়ি পরার রীতির বিবর্তনে নানা আঞ্চলিক ভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ভূমিকা রয়েছে। বাঙালি নারীদের শাড়ি পরার যে বিভিন্ন রূপ দেখা যায়, তার মধ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য শৈলী হলো ‘ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি’ বা ব্রাহ্মসমাজ প্রভাবিত শাড়ি পরার ধরন। এটি মূলত আধুনিকতার প্রভাবে জন্ম নেওয়া এক বিশেষ শাড়ি-দ্রাপিং পদ্ধতি, যেখানে শাড়ির কুচি বা প্লিট, আঁচল, বাঁধন—সর্বত্রই একটি সুচারু, মার্জিত ও শিক্ষিত নারীর পরিচয়ের ছাপ লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীদের আবির্ভাব এই শৈলীর উদ্ভবের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সমাজে ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে মেয়েদের শিক্ষা, সামাজিক স্বাধীনতা এবং নারীর আত্মসম্মান রক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে সময় নারীরা মূলত অথর বা ঐতিহ্যগত আটপৌরে পদ্ধতিতে শাড়ি পরতেন, যেখানে বাম দিক থেকে আঁচল আসত পিছনের দিকে ঘুরে সামনে। তবে শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের চলাফেরা সহজ করতে একটি আরও সুশৃঙ্খল, আরামদায়ক ও রক্ষণশীল শাড়ি পরার রীতি প্রয়োজন ছিল। এখান থেকেই ব্রাহ্মিকা পদ্ধতির জন্ম।
এই পদ্ধতি অনুপ্রাণিত হয়েছিল অবাঙালি নারীদের ‘কুচি পদ্ধতি’ বা pleated draping style থেকে, যেখানে শাড়ির প্লিট সামনে সাজিয়ে কোমরে গুঁজে দেওয়া হয়। বাঙালি নারীরা সেই রীতিকে নিজেদের প্রয়োজন ও সৌন্দর্যবোধ অনুযায়ী মানিয়ে নেয়। ফলে তৈরি হয় এক নতুন শৈলী—যাকে আজ ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি হিসেবে চিনি।
ব্রাহ্মিকা পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য:
বড় ও পরিপাটি কুচি বা প্লিট:
এই পদ্ধতিতে শাড়ির সামনের কুচিগুলি বেশ বড় এবং সমানভাবে সাজানো হয়। প্লিটগুলি কোমর, বুক ও পিঠে চমৎকারভাবে ধরে থাকে, ফলে পরিপাটি ও মার্জিত দেখায়।
দীর্ঘ ও নিয়ন্ত্রিত আঁচল:
অথর পদ্ধতির মতো আঁচল পিছন দিয়ে আসলেও ব্রাহ্মিকা পদ্ধতিতে আঁচলটি আরও লম্বা, পরিপাটি এবং প্রায়শই বুক ঢেকে রাখার মতো করে ব্যবহৃত হয়। ফলে বাইরে বেরোনো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া—সব ক্ষেত্রেই এটি ছিল সুবিধাজনক।
চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য:
এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীদের দৈনন্দিন চলাফেরা সহজ করা। ব্রাহ্মিক নারীরা স্কুল-কলেজ, সভা-সমিতি, সামাজিক আন্দোলন বা পেশাদার কাজে অংশ নিতেন। তাই শাড়ি পরার ধরনটি ছিল হালকা, সুশৃঙ্খল এবং সক্রিয় জীবনের উপযোগী।
সৌন্দর্য ও রুচির প্রকাশ:
ব্রাহ্মিকা পদ্ধতিতে শাড়ি পরা একই সঙ্গে রুচিশীল, ভদ্র এবং আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল। বড় প্লিট, পরিপাটি আঁচল ও মার্জিত ভঙ্গিমায় এই শৈলী বাঙালি আধুনিক নারীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ে স্বাতন্ত্র্য এনে দেয়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব:
ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি শুধুমাত্র একটি শাড়ি পরার পদ্ধতি ছিল না—এটি ছিল নারীর সামাজিক অগ্রগতির এক প্রতীক। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বাঙালি নারীরা পুরনো পর্দাপ্রথা ভেঙে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সমাজসংস্কারে অংশ নেন। ব্রাহ্মিক নারী—যেমন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, হেমলতা দেবী, প্রভৃতি—এই পদ্ধতির মাধ্যমে সভা-সমিতিতে উপস্থিত হতেন এবং নবজাগরণের মুখ হয়ে উঠতেন।
এটি নারীর মর্যাদা, সংস্কার, আধুনিকতা এবং আত্মসম্মানের এক নতুন পরিচয় গড়ে তোলে। কেননা, এই শৈলী ছিল একই সঙ্গে শালীন ও প্রাকটিকাল।
অন্য শাড়ি-পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা:
| পদ্ধতি | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| আটপৌরে | আঁচল বাম দিক থেকে পিছনে আসে; প্লিট কম; বেশি ঐতিহ্যশালী। |
| নবীন বা কুচি পদ্ধতি | সামনে প্লিট বেশি; পশ্চিমা প্রভাব; দৌলতদিয়া ও অবাঙালি অঞ্চলে প্রচলিত। |
| ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি | বড়, পরিপাটি কুচি; নিয়ন্ত্রিত আঁচল; আধুনিক, শিক্ষিত নারীর প্রতীক। |
বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা:
আজও বাংলা সমাজে এই শৈলী জনপ্রিয়। বিশেষত স্কুল-কলেজ, অফিস, বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন সাজে অনেকেই ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। শাড়ি পরার আধুনিক পদ্ধতিগুলির মধ্যেও এই শৈলী তার সৌন্দর্য, সরলতা ও প্রাকটিকাল ব্যবহারের জন্য আলাদা ভাবে সমাদৃত।
উপসংহার:
ব্রাহ্মিকা পদ্ধতি কেবল একটি শাড়ি পরার কৌশল নয়—এটি উনিশ শতকের বাংলা সমাজে নারীর মুক্তি, শিক্ষালাভ এবং আধুনিকতার প্রতীক। এটি ছিল নারী-সমাজের উন্নতি ও পরিচ্ছন্ন রুচির প্রকাশ। সুসংগঠিত প্লিট, লম্বা আঁচল এবং মার্জিত শৈলী ব্রাহ্মিকা পদ্ধতিকে বাঙালি নারীর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরে। আজও এই শৈলী তার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে সমান আকর্ষণীয়।