ভূমিকা:
ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ মূলত ব্রিটিশ শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা, কিন্তু শাসনভার সুসংহত করার জন্য শিক্ষানীতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৮৩৫ সালে থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে-এর ‘ম্যাকলের মিনিট’ ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি পাশ্চাত্য জ্ঞান ও ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন, যারা ব্রিটিশ শাসনের সহায়ক হবে।
পরবর্তীতে ১৮৫৪ সালের উডস ডিসপ্যাচ শিক্ষাব্যবস্থার সংগঠিত রূপরেখা প্রদান করে, যা ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে ‘শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা’ নামে পরিচিত। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা আধুনিক উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে।
তবে এই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে মানবকল্যাণমূলক ছিল না; বরং প্রশাসনিক কাজের জন্য এক শ্রেণির কর্মচারী তৈরি করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তবুও এই নীতির ফলে ভারতে নবজাগরণ, জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে। ফলে ব্রিটিশ আমলের শিক্ষানীতি ভারতীয় সমাজে গভীর ও বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে।
চার্টার অ্যাক্ট,১৮১৩:
These discussions led to a divide in educational philosophy, with Orientalists advocating for the preservation of traditional Indian knowledge and Anglicists promoting Western education. This ideological battle set the tone for future educational initiatives in India.
- ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতে শিক্ষাখাতে প্রতিবছর ১ লক্ষ টাকা খরচ করার নির্দেশ দেয়।
- ১৮২৩ সাল পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় করা হয় না, তার প্রধান কারণ ছিল — শিক্ষানীতি নিয়ে ঐক্যমত ছিল না।
- ১৮২৩ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয় (General Committee on public instruction) – One group of members wanted to utilize the funds in the development of oriental education i.e. Sanskrit and Arabic/Persian. তাদেরকে বলা হত “Orientalist“.
- যেমন- H. T. Princep এবং H. H. Wilson. The other group known as 1970 ‘Anglicist’ was more in favour of English education.
চার্টার অ্যাক্ট,১৮৩৩:
ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে Charter Act 1833 একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত এই আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনে এবং ভারতের প্রশাসনকে অধিক কেন্দ্রীভূত করে তোলে। ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের পর এটি ছিল পরবর্তী বড় সাংবিধানিক পদক্ষেপ, যা ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে আরও স্পষ্ট করে।
চার্টার অ্যাক্ট, ১৮৩৩-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সম্পূর্ণ অবসান। এর ফলে কোম্পানি কেবল প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে রয়ে যায় এবং ভারতের শাসনভার পরিচালনা করে। এই আইনের মাধ্যমে বাংলার গভর্নর-জেনারেলকে “ভারতের গভর্নর-জেনারেল” উপাধি দেওয়া হয়। এই পদে প্রথম নিযুক্ত হন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। এর ফলে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আইন প্রণয়নের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলে একটি আইন সদস্য (Law Member) যুক্ত করা হয়, যিনি আইন প্রণয়নে সহায়তা করতেন। পরবর্তীকালে এই পদে থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে নিযুক্ত হন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়।
এছাড়া, এই আইনে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়—যদিও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। দাসপ্রথা বিলোপ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সবশেষে বলা যায়, চার্টার অ্যাক্ট, ১৮৩৩ ভারতের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী আইন। এটি ব্রিটিশ শাসনকে আরও কেন্দ্রীভূত ও সংগঠিত করে এবং ভবিষ্যতের সাংবিধানিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে। যদিও এই আইন ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত, তবুও এর মাধ্যমে ভারতের আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর সূচনা ঘটে।
মেকল মিনিট (মেকলের প্রতিবেদন):
ভারতের আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে ১৮৩৫ সালের Macaulay’s Minute on Education একটি যুগান্তকারী ও বিতর্কিত দলিল। এই প্রতিবেদন রচনা করেন ব্রিটিশ শাসক পরিষদের আইন সদস্য থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে। তখন ভারতের শিক্ষানীতি নিয়ে ‘প্রাচ্যপন্থী’ ও ‘পাশ্চাত্যপন্থী’—এই দুই মতবাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছিল। প্রাচ্যপন্থীরা সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় ঐতিহ্যগত শিক্ষার পক্ষে ছিলেন, আর পাশ্চাত্যপন্থীরা ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার প্রসার চান। ম্যাকলে দৃঢ়ভাবে পাশ্চাত্যপন্থী মতকে সমর্থন করেন।
মেকলের মিনিটে বলা হয়, সরকারী অর্থ ব্যয় করে প্রাচ্য ভাষা ও শাস্ত্রের পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য শিক্ষা দেওয়া উচিত। তিনি যুক্তি দেন যে ইউরোপীয় জ্ঞানভাণ্ডার ভারতীয় ঐতিহ্যগত জ্ঞানের তুলনায় অধিক উন্নত ও উপযোগী। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য ছিল—এমন একটি শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা “রক্তে ও বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচি ও বুদ্ধিতে ইংরেজ।” অর্থাৎ, ব্রিটিশ প্রশাসনের সহায়ক হিসেবে এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৮৩৫ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ইংরেজিকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর ফলেই ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা, যুক্তিবাদ ও নতুন রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিকাশেও এই শিক্ষানীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে মেকলের মিনিটের সমালোচনাও কম নয়। এটি প্রাচ্য জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করে এবং শিক্ষাকে শহরকেন্দ্রিক ও উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। তবুও অস্বীকার করা যায় না যে এই নীতির ফলেই ভারতীয় সমাজে নবজাগরণ ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে।
সবশেষে বলা যায়, মেকলের মিনিট ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থে প্রণীত এক শিক্ষানীতি, কিন্তু এর প্রভাব ভারতীয় সমাজে সুদূরপ্রসারী। এটি একদিকে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের হাতিয়ার, অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষার সূচনা—এই দ্বৈত চরিত্রের জন্যই ইতিহাসে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
উডের ডেসপ্যাচ,১৮৫৪:
১৮৫৪ সালের Wood’s Dispatch-কে প্রায়ই ভারতের শিক্ষার “ম্যাগনা কার্টা” বলা হয়। এই প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেন ব্রিটিশ বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড। এর মাধ্যমে ভারতে একটি সুসংগঠিত ও বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
উডস ডিসপ্যাচে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা প্রদান করা হয়। এতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালে বাস্তবায়িত হয়।
এই প্রতিবেদনে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি দেশীয় ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ওপরও জোর দেওয়া হয়। সরকারি তত্ত্বাবধানে শিক্ষা বিস্তার, নারীশিক্ষা উৎসাহিত করা এবং গ্রান্ট-ইন-এইড পদ্ধতির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সুতরাং, উডস ডিসপ্যাচ ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক নথি ছিল না; বরং ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা পরবর্তী সময়ে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম করে।
১৮৫৪ সালে ১৯ জুলাই, বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ‘উডের ডেসপ্যাচ’ প্রকাশ করেছিলেন।
যাতে বলা হয়—
- জনগণের শিক্ষার দায়িত্ব সরকারের এবং সেটি সুষ্ঠুভাবে রূপায়িত করতে হবে।
- প্রাথমিক ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় ও উচ্চ শিক্ষায় ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার সুপারিশ করা হয়।
- প্রত্যেক রাজ্যে আলাদা শিক্ষা দপ্তর তৈরি করতে বলা হয়।
- কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা হয়।
- শিক্ষকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়।
- এই আইনে নারী শিক্ষার কথা বলা হয়।
উডের ডেসপ্যাচকে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ম্যাগনা কার্টা বলা।
হান্টার কমিশন,১৮৮২:
প্রাথমিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে সুপারিশ করে।
ভারতীয় সদস্য: কে টি তিলং, স্যার সৈয়দ আহমেদ প্রমুখ।
হান্টার কমিশন স্যার উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে Woods Despatch (১৮৫৪) -এর কার্যকারিতা ও প্রয়োগ দেখার জন্য লর্ড রিপনের সময় গঠিত হয়।
র্যালে কমিশন (Releigh Commission):
র্যালে কমিশন ১৯০২ সালে গঠিত হয়।
ভারতীয় সদস্য: গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৈয়দ হুসেন বিলগ্রামী। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯০৪ (The Indian Universities Act, ১৯০৪) তৈরি হয়।
স্যাডলার ইউনিভার্সিটি কমিশন, ১৯১৭-১৯:
ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে স্যাডলার ইউনিভার্সিটি কমিশন (১৯১৭-১৯) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য গঠিত হলেও এর সুপারিশ সমগ্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য হয়। এই কমিশনের ভারতীয় সদস্য ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জী ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ। অপর নাম এটিকে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ বলা হয়।
১৯শ শতকে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে এগিয়েছিল। ১৮৫৪ সালের উডস ডিসপ্যাচ আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে, ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের সুপারিশ দেয়, এবং ১৯০২ সালের রেলি কমিশন উচ্চশিক্ষার কাঠামো উন্নত করে ১৯০৪ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের পথ সুগম করে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যে স্যাডলার কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কমিশন সুপারিশ করে যে বিদ্যালয়ে ১২ বছরের শিক্ষা প্রদত্ত হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে ২ বছরের ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং স্নাতক পর্যায়ে ৩ বছরের কোর্স থাকবে। এছাড়া শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য কঠোর পরীক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণার প্রসার এবং ফলিত বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও কমিশনের সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সুতরাং, স্যাডলার কমিশন ভারতের উচ্চশিক্ষার আধুনিক রূপ স্থাপনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। এটি শুধু শিক্ষার কাঠামো ও পরীক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন করেনি, বরং গবেষণা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আধুনিক ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় অধ্যায় এবং উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে স্থায়ী গুরুত্ব বহন করে।
হার্টগ কমিটি (Hartog Committee,১৯২৯):
চেয়ারম্যান — স্যার ফিলিপ হ্যারটগ। প্রাথমিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়।
ওয়ার্ধা পরিকল্পনা:
চেয়ারম্যান — ডঃ জাকির হুসেন। জাতীয় কংগ্রেস ১৯৩৭ সালে ওয়ার্ধায় শিক্ষার জন্য জাতীয় সম্মেলনের আহ্বান করে।
ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে Wardha Education Plan বা ওয়ার্ধা পরিকল্পনা এক যুগান্তকারী শিক্ষানীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৩৭ সালে মধ্যপ্রদেশের ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত একটি শিক্ষা সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এটি মূলত ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, চরিত্রগঠন, স্বনির্ভরতা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করার জন্য প্রবর্তিত হয়। গান্ধীজী মনে করতেন, শিক্ষা শুধু পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্য নয়; বরং এটি একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক ও সামাজিক চেতনা উন্নয়ন এবং গ্রামীণ জীবনে কার্যকর দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যম হওয়া উচিত।
ওয়ার্ধা পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নৈর্ব্যক্তিক শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি হস্তশিল্প, কৃষি, বস্ত্রকলা এবং অন্যান্য গ্রামীণ কারিগরি কাজে দক্ষতা অর্জন করবে। এটি শিক্ষার্থীর হাতে কাজের দক্ষতা এবং আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি করবে। এছাড়া পরিকল্পনায় নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সততা, ন্যায়বিচার, সামাজিক দায়িত্ব এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ শিখবে।
ওয়ার্ধা পরিকল্পনা স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার ওপর জোর দেয়, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং তা গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও, শিক্ষার্থীরা গ্রামের কাজ, কৃষি, হস্তশিল্প বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে, যা শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
সবশেষে বলা যায়, ওয়ার্ধা পরিকল্পনা ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি আধুনিক শিক্ষার কেবল তাত্ত্বিক দিক নয়, বরং শিক্ষার্থীর নৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক বিকাশেও গুরুত্বারোপ করেছে। গান্ধীজীর দর্শন অনুযায়ী, শিক্ষা হল একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জাতির উন্নয়নেও অবদান রাখে। আজও এই নীতি শিক্ষায় গ্রামীণ পুনর্জাগরণ ও নৈতিক শিক্ষার জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
উপসংহার:
ব্রিটিশ আমলে ভারতের শিক্ষানীতি দেশের শিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। ১৮৩৫ সালের ম্যাকলের মিনিট ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ও পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিল। ১৮৫৪ সালের উডস ডিসপ্যাচ ভারতীয় শিক্ষার কাঠামো প্রতিষ্ঠায় একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা প্রদান করে, যা প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীতে হান্টার কমিশন (১৮৮২) প্রাথমিক শিক্ষার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং পশ্চিমা শিক্ষার প্রসার ঘটায়। রেলি কমিশন (১৯০২) উচ্চশিক্ষার সংস্কার এবং ১৯০৪ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের পথ সুগম করে। এরপর ১৯১৭-১৯ সালের স্যাডলার কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য গবেষণা, ফলিত বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ব্রিটিশ শিক্ষানীতির মাধ্যমে ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন হয়। ইংরেজি ভাষার প্রসার ও পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চার কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের উন্মেষ ঘটায়। এভাবে ব্রিটিশ আমলের শিক্ষানীতি ভারতীয় সমাজে নতুন দিশা ও চিন্তাধারার সূচনা করে।
তবে এই শিক্ষানীতির সীমাবদ্ধতাও ছিল স্পষ্ট। প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, শিক্ষার সুযোগ নগরকেন্দ্রিক ও উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমিত ছিল, এবং স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি প্রায় অবহেলিত হয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক কাজে সহায়ক এক শ্রেণি তৈরি করা, যা ঔপনিবেশিক স্বার্থ পূরণের জন্য কার্যকর ছিল।
সবশেষে বলা যায়, ব্রিটিশ আমলের শিক্ষানীতি ভারতের শিক্ষার আধুনিক রূপের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এটি শিক্ষার কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। যদিও মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা, তবুও শিক্ষিত সমাজ ও আধুনিক চিন্তাধারার বিকাশে এর অবদান অস্বীকার করা যায় না। ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।