ভূমিকা:
ভারতে মুসলিম রাজনীতির বিবর্তন ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সংগঠন, দাবি-দাওয়া এবং নেতৃত্ব ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ শাসনামলে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজের মধ্যেও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে এবং তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য সংগঠিত হতে শুরু করে।
১৯১২ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে ভারতের মুসলিম রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই সময়কাল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির যুগ। আল্লামা ইকবাল ও মুহম্মদ আলি জিন্নাহ প্রমুখ নেতা মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে সংরক্ষিত অধিকার এবং ধর্মীয় ও সামাজিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগঠন ও দল গঠন শুরু করে।
১৯১২ সালের পর মুসলিম লিগ (All India Muslim League) রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয় এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা, সংবিধানিক রূপায়ণ এবং ভোট ও প্রতিনিধি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই সময়ে মুসলিম রাজনীতি সাধারণত ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতা ও সংলাপ, মুসলিম সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত রাজনীতিক অধিকার এবং মুসলিম শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়।
প্রথম পর্ব: 1757-1857
- 1757 সালের 23 জুন-পলাশীর যুদ্ধ।
- ফরাজী আন্দোলনের নেতা-হাজী শরিয়াতুল্লা। ফরাজী শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের সেনানায়ক’।
- শরিয়াতুল্লার পর নেতৃত্ব দেন মহম্মদ মহসীন (দুদু মিঞা)। ফরাজী আন্দোলন পূর্ব বঙ্গে হয়েছিল।
- দুদু মিঞা ‘ফারাজী খিলাফৎতন্ত্র’ গঠন করেন যার প্রধানকে বলা হত ওস্তাদ।
- ভারতের দিল্লিতে ওয়াহাবী আন্দোলন শুরু করেন শাহওয়ালি উল্লাহ ও তাঁর পুত্র হাজিজ। ওয়াহাবী শব্দের অর্থ নবজাগরণ।
- ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলনের যথার্থ প্রতিষ্ঠাতা রায়বেরিলীর- সৈয়দ আহমেদ।
- বালাকোটার যুদ্ধে তিনি শিখদের কাছে পরাস্ত হন (1831)।
- বাংলাদেশের বারাসতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন-তিতুমীর (মীর নাসের আলি বারাসত বিদ্রোহের নেতা)।
- নারকেলবেড়িয়া বাঁশের কেল্লা তিনিই নির্মাণ করেন।
দ্বিতীয় পর্ব: 1858-1905
- আলিগড় আন্দোলনের প্রধান ছিলেন-স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা।
- তিনি 1875 সালে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ স্থাপন করেন। যেটি 1927 সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
- আলিগড় কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ থিয়োডর বেক।
- 1865 সালে ‘Scientific Society’ সৈয়দ আহমেদ প্রতিষ্ঠা করেন জ্ঞানবিজ্ঞানকে উর্দুতে অনুবাদের জন্য।
- তাহজিব আল-আখলাখ (উর্দু) ও পাইওনিয়ার (ইংরেজি) পত্রিকা সৈয়দ আহমেদের।
- “Committee for Advancement of learning among Mohamudans of India”-সৈয়দ আহমেদ
- Educational Congress এবং Mohanudan Anglo Oriental Defence Association (1893) – সৈয়দ আহমেদ।
- United India Patriotic Association (1888)-থিওডোর বেক।
তৃতীয় পর্ব: 1905-1911
- ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহ ও আগা খাঁর নেতৃত্বে মুসলিম লিগ (1906) স্থাপিত হল ঢাকাতে।
- আগা খাঁ ছিলেন মুসলিম লিগের আজীবন সভাপতি।
চতুর্থ পর্ব: 1912-34
- কংগ্রেস নেত্রী অ্যানি বেসান্তের চেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে লক্ষ্ণৌ চুক্তি (1916) স্বাক্ষরিত হয়।
- মন্টেণ্ড ঘোষণা (1917)। মন্টেণ্ড-চেমসফোর্ড সংস্কার (1919) বা 1919সালের ভারত শাসন আইন বা মন্টফোর্ড (1919) আইনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইন সভার কথা বলা হয়। কেন্দ্রে দ্বি-কক্ষ-
- Central Legislative Assembly.
- Council of States.
- জাতীয়তাবাদী মুসলিম দল-1928 সাল। নেতা ছিলেন হাকিম আজমল খান, আব্দুল কালাম আজাদ ইত্যাদি।
- 1933 সাল চৌধুরী রহমত আলি পাকিস্তান জাতীয় আন্দোলন শুরু করেন। 1934 সালে ভারতীয় মুসলিম লিগ-এর সাথে ভারতীয় মুসলিম সম্মেলন যুক্ত হয়ে পড়ে।
খিলাফৎ আন্দোলন:
- খিলাফৎ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় 1919 সালে।
- খিলাফৎ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মৌলানা সওকৎ আলি ও মৌলানা মহম্মদ আলি (আলি ভ্রাতৃদ্বয়)।
- অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নেতৃবর্গ হলেন-মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খাঁ এবং মৌলানা হজরৎ মোহানি।
- 1919 সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় All India Khilafat Conference বা নিখিল ভারত খিলাফৎ সম্মেলন। ওই সম্মেলনের সভাপতি হলেন মহাত্মা গান্ধী।
- খিলাফৎ আন্দোলনের মুখ্য উপদেষ্টাও তিনি ছিলেন।
- খিলাফৎ আন্দোলনের সমর্থনে গান্ধীজী ইংরেজদের দেওয়া কাইজার-ই-হিন্দ পদকটি ফিরিয়ে দেন।
- মুস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে 1922 সালে তুরস্কের খলিফা ক্ষমতাচ্যুত হন।
- তুরস্কে প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয় 1924 সালে এবং খলিফা পদটিকে অবলুপ্ত করা হয়।
মোপলা বিদ্রোহ:
- 1921 সালে কেরালায় মোপলা বিদ্রোহ দেখা যায়। এটি হল ভারতে প্রথম Ethnic (জাতিগত) বিদ্রোহ।
- মালাবার অঞ্চলের মুসলিমরা হিন্দুদের উপর অত্যাচার শুরু করে যা মোপলা বিদ্রোহ (1921) নামে পরিচিত।
- মোপলা বিদ্রোহ ছিল খিলাফৎ আন্দোলনের ফলপ্রসূ।
- গোড়া মুসলমানরা তাজিম ও তবলিম আন্দোলন শুরু করে।
আরও কিছু তথ্য জেনে রাখুন:
- 1924 সালে স্বরাজ্যদলের সাথে মুসলিম লিগের বাংলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 1925 সালে চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে ‘কর্মী‘ নামে পরিচিত হিন্দুগোষ্ঠীর চাপে এই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়।
- 1929 সালের মার্চ মাসে মুসলিম লিগ ‘চৌদ্দ দফা‘ দাবি জানায় (দিরি অধিবেশনে)।
- আলি ভ্রাতৃদ্বয় (সওকৎ ও মহম্মদ) 1929 সালে কানপুরে ‘জামিয়াৎ-ই-উলমা-ই-হিন্দ‘ প্রতিষ্ঠা করেন।
1929 সালে স্থাপিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম সম্মেলন। - স্যর মহম্মদ ইকবাল (উর্দুকবি) লেখেন- “সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা…”।
- ইকবাল 1930 সালের মুসলিম লিগের এলাহাবাদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এবং আলাদা রাষ্ট্রগঠনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। প্রথম পাকিস্তান গঠনের কথা বলেন।
- 1933 সালে লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য সম্মেলন।
- মৌলানা আজাদের সভাপতিত্বে গঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল।
- খুদাই খিদ্যুৎগার (ঈশ্বরের সেবক)-এর নেতা ছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের খান আব্দুল গফ্ফর খান (সীমান্ত গান্ধী /Frontier Gandhi) |
- এই দলের সদস্যরা লাল রংয়ের পোশাক পরতেন বলে এরা লালকুর্তা (Red Shirt) বাহিনী নামে পরিচিত হন। এরা গান্ধীজীর অহিংস নীতি অনুসরণ করতেন।
সারবাদী হলেন খান আব্দুল গফ্ফর খান। - 1932 সালে র্যামসে ম্যান্ডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (Comunal Award)-র নীতি ঘোষণা করেন। তৎকালীন ভাইসরয় ছিলেন উইলিংডন (1931-36)।
- পাকিস্তান শব্দের উৎপত্তি পাক স্থান শব্দ থেকে।
- শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন চৌধুরী রহমৎ আলি (কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন)।
- 1933 সালে রহমত আলি ‘Now or Never‘ নামক এক পুস্তিকা প্রচার করেন।
- পাঞ্জাব, আফগানিস্তান (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ), কাশ্মীর, সিন্ধুপ্রদেশ ও বেলুচিস্তান এই পাঁচটি প্রদেশের মধ্যে প্রথম চারটির ইংরাজি বানানের প্রথম অক্ষরের (P, A, K, S) সঙ্গে বেলুচিস্তানের শেষাংশ ‘tan’ যোগ করে পাকিস্তান PAKSTAN নামটির সৃষ্টি।
- ‘পাকিস্তান‘ শব্দের অর্থ ‘পবিত্রভূমি‘।