ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য: Features of the Indian Constitution.

ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য

ভারতের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য: Features of the Indian Constitution.

Table of Contents

ভূমিকা:

ভারতীয় সংবিধান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সুসংগঠিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, দেশীয় বাস্তবতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধান থেকে গৃহীত আদর্শের সমন্বয়ে ভারতীয় সংবিধান রচিত হয়েছে। এটি কেবল একটি শাসনতান্ত্রিক দলিল নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের পথনির্দেশক। ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি কার্যকর হওয়া এই সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে এবং নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের সুষম সমন্বয় ঘটিয়েছে। এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান: 

ভারতীয় সংবিধান বিস্তারিতভাবে লিখিত। অন্যান্য দেশের লিখিত সংবিধানের তুলনায় এই সংবিধান আয়তনে বড় এবং বিষয়বহুল। মোট 395টি ধারা (Articles), বহু উপধারা (Clauses), এবং ৪টি তালিকা (Schedule) নিয়ে ভারতীয় সংবিধানের সৃষ্টি। 

সংবিধানের প্রাধান্য:

ভারতে সংবিধানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের সংবিধান হল দেশের মৌলিক ও সর্বোচ্চ আইন। সরকারের যাবতীয় ক্ষমতার একমাত্র উৎস হল এই সংবিধান। 

সংবিধানে একটি প্রস্তাবনা আছে:

প্রস্তাবনা হল ভারতীয় সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মার্কিন সংবিধানের প্রস্তাবনার অনুকরণে এর সৃষ্টি। প্রস্তাবনাকে সংবিধানের মুখবন্ধ বা ভূমিকা বলা হয়। 

সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র: 

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারত রাষ্ট্রকে একটি ‘সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ (Sovereign Socialist Secular Democratic Republic) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা: 

ভারতের শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রীয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এখানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যসরকারগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত হয়েছে। 

পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থা: 

গ্রেট ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার অনুকরণে ভারতেও পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। 

মৌলিক অধিকার: 

সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে 12 থেকে 35নং ধারার মধ্যে ছয় শ্রেণির মৌলিক অধিকার নাগরিকদের দেওয়া হয়েছে। 

নির্দেশমূলক নীতি: 

মৌলিক অধিকার ছাড়াও ভারতীয় সংবিধানে আরও কতকগুলি অধিকার অন্তর্ভুক্ত আছে। এগুলিকে রাষ্ট্র-পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy) বলে। 

ভারতের সুপ্রীম কোর্ট: 

সংবিধান অনুসারে ভারতেও একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত আছে। এর নাম সুপ্রীম কোর্ট। 

বিচার-বিভাগের স্বাধীনতা:

ভারতের বিচার-বিভাগ যাতে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে নিজের দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে, তার জন্য সংবিধানে বিচার-বিভাগীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও বিচার-বিভাগীয় প্রাধান্যের মধ্যে সামঞ্জস্য: 

ভারতে মোটামুটিভাবে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয়েছে। ভারতের সংবিধান হল দেশের মৌলিক ও সর্বোচ্চ আইন। পার্লামেন্ট এই সংবিধান সংশোধন করতে পারে। 

ভারতীয় সংবিধান অংশতঃ সুপরিবর্তনীয় এবং অংশতঃ দুষ্পরিবর্তনীয়:

যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয় হয়। 

অনুন্নত শ্রেণির স্বার্থে বৈষম্যমূলক সংরক্ষণ:

ভারতে সাম্যের আদর্শগ্রহণ করা হয়েছে। এই আদর্শকে কার্যকর করার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করার কথা বলা হয়েছে। তবে ভারতের অনুন্নত শ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সংবিধানে বিশেষ ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। 

একনাগরিকত্ব: 

ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকদের একনাগরিকত্ব স্বীকার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রীয়-ব্যবস্থার রীতিমাফিক দ্বি-নাগরিকত্ব এখানে স্বীকৃত হয়নি। 

মৌলিক কর্তব্য: 

ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকদের কতকগুলি মৌলিক কর্তব্যের উল্লেখ আছে (১১টি)। 

কতকগুলি রাজ্যের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা:

সংবিধানের 370 ধারায় কাশ্মীরের জন্য (2019 সালে বাতিল হয়েছে) এবং 371 ধারায় আসাম, মণিপুর, সিকিম, নাগাল্যান্ড প্রভৃতি রাজ্যের স্বার্থে কিছু বিশেষ ব্যবস্থার উল্লেখ আছে। 

সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার:

ভারতীয় সংবিধানের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের স্বীকৃতি। 

বিশ্বশান্তি আদর্শ:

ভারতের সংবিধানে সৌভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বশান্তির আদর্শ ঘোষণা করা হয়েছে। 

ভাষা সম্পর্কিত ব্যবস্থা: 

সংবিধানের সপ্তদশ অধ্যায়ে 343 থেকে 351নং ধারার মধ্যে ভাষা সংক্রান্ত সাংবিধানিক নির্দেশের উল্লেখ আছে। 

দলত্যাগ-বিরোধী ব্যবস্থা: 

1985 সালে 52তম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে দলত্যাগ বিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ক্রমবৈশিষ্ট্যসংক্ষিপ্ত বিবরণ
বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধানবিস্তারিত ও আয়তনে বৃহৎ লিখিত সংবিধান
সংবিধানের প্রাধান্যসংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন
প্রস্তাবনাসংবিধানের মুখবন্ধ বা ভূমিকা
সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয়
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন
পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থাব্রিটিশ মডেলে গঠিত
মৌলিক অধিকারধারা ১২–৩৫, ৬ প্রকার
নির্দেশমূলক নীতিরাষ্ট্র পরিচালনার দিশানির্দেশ
সুপ্রিম কোর্টসর্বোচ্চ বিচারালয়
১০বিচার-বিভাগের স্বাধীনতাবিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত
১১সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক প্রাধান্যভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা
১২অংশত সুপরিবর্তনীয় সংবিধাননমনীয় ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্য
১৩সংরক্ষণ ব্যবস্থাঅনুন্নত শ্রেণির স্বার্থরক্ষা
১৪একনাগরিকত্বদ্বৈত নাগরিকত্ব নেই
১৫মৌলিক কর্তব্যমোট ১১টি কর্তব্য
১৬বিশেষ রাজ্যগত ব্যবস্থাধারা ৩৭০ ও ৩৭১
১৭সর্বজনীন ভোটাধিকার১৮ বছর ঊর্ধ্ব সকল নাগরিক
১৮বিশ্বশান্তির আদর্শআন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব
১৯ভাষা সংক্রান্ত ব্যবস্থাধারা ৩৪৩–৩৫১
২০দলত্যাগ বিরোধী আইন৫২তম সংশোধনী, ১৯৮৫

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় সংবিধানের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ভারত রাষ্ট্রের ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সংবিধানের প্রাধান্য, মৌলিক অধিকার, নির্দেশমূলক নীতি, বিচার-বিভাগের স্বাধীনতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সমন্বয়—সব মিলিয়ে এটি একটি বাস্তববাদী ও গতিশীল সংবিধান। পরিবর্তনশীল সমাজ ও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য সংবিধানকে অংশত সুপরিবর্তনীয় করা হয়েছে, যা এর অন্যতম শক্তি। তাই বলা যায়, ভারতীয় সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আইনগত দলিল নয়, বরং এটি ভারতের গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক জীবন্ত দলিল।

 

Protijogita.in শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে এম.এ করেছি এবং শিক্ষকতা করি। এই ওয়েবসাইটে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রশ্নোত্তর, মক টেস্ট, এবং দরকারি অধ্যয়ন সামগ্রী প্রদান করা হয়।

Post Comment

error: Content is protected !!