ভূমিকা:
ভারতের সংবিধানে মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের যেমন বিভিন্ন মৌলিক অধিকার রয়েছে, তেমনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের কিছু কর্তব্যও পালন করা অত্যন্ত জরুরি। অধিকার ও কর্তব্য একে অপরের পরিপূরক। নাগরিকরা যদি শুধু অধিকার ভোগ করে কিন্তু কর্তব্য পালন না করে, তাহলে রাষ্ট্রের সুশাসন ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কারণে ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের জন্য কিছু মৌলিক কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে 42nd Amendment of the Constitution of India এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সংবিধানে ১০টি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়। এই সংশোধনের সুপারিশ করেছিল Swaran Singh Committee। পরে ২০০২ সালে 86th Amendment of the Constitution of India এর মাধ্যমে আরও একটি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়। ফলে বর্তমানে ভারতের সংবিধানে মোট ১১টি মৌলিক কর্তব্য রয়েছে।
এই মৌলিক কর্তব্যগুলি সংবিধানের চতুর্থ অংশ (ক) বা Part IVA-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এগুলি ৫১(ক)-এ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় ঐক্যের চেতনা গড়ে তোলা।

মৌলিক কর্তব্যের পটভূমি:
ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় মূলত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় যে নাগরিকদের মধ্যে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের সময়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিল, যা ইতিহাসে The Emergency in India (1975–1977) নামে পরিচিত। সেই সময়ে দেশের শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। তখন সরকার একটি কমিটি গঠন করে যার নাম ছিল স্বরণ সিং কমিটি।
এই কমিটি সুপারিশ করে যে সংবিধানে নাগরিকদের কিছু মৌলিক কর্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২তম সংশোধনের মাধ্যমে মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়।
ভারতের সংবিধানে ১১টি মৌলিক কর্তব্য:
১. সংবিধান ও জাতীয় প্রতীককে সম্মান করা:
- প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের প্রথম কর্তব্য হলো দেশের সংবিধানকে মান্য করা এবং তার আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে সম্মান করা।
- সংবিধান হলো দেশের সর্বোচ্চ আইন। তাই নাগরিকদের উচিত সংবিধানের নিয়ম মেনে চলা। এছাড়া জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত দেশের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। তাই এগুলির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
২. স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান আদর্শ অনুসরণ করা:
- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল দীর্ঘ এবং ত্যাগে ভরা একটি সংগ্রাম। অসংখ্য নেতা ও সাধারণ মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন।
- এই মৌলিক কর্তব্য অনুযায়ী নাগরিকদের উচিত সেই মহান আদর্শ যেমন স্বাধীনতা, ন্যায়, সাম্য এবং দেশপ্রেমকে নিজের জীবনে অনুসরণ করা।
৩. দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করা:
- ভারত একটি বিশাল ও বহুবৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষ বসবাস করে।
- এই কারণে দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হলো দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং বিভেদমূলক কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকা।
৪. দেশ রক্ষা ও জাতীয় সেবায় অংশগ্রহণ করা:
- দেশের প্রয়োজনের সময় নাগরিকদের উচিত দেশের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সেবায় অংশগ্রহণ করা।
- এর অর্থ হলো দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত থাকা।
৫. জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা:
- সরকারি সম্পত্তি যেমন রাস্তা, সেতু, বিদ্যালয়, রেলপথ, সরকারি ভবন ইত্যাদি দেশের সম্পদ।
- এই সম্পত্তিগুলি জনগণের অর্থ দিয়ে তৈরি হয়। তাই এগুলিকে রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। পাশাপাশি হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. বৈজ্ঞানিক মনোভাব গড়ে তোলা:
- সমাজকে উন্নত ও প্রগতিশীল করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।
- এই মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের কুসংস্কার ত্যাগ করে যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে।
৭. দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা:
- ভারত বহু প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির দেশ। এখানে নানা ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং ঐতিহ্য রয়েছে।
- এই ঐতিহ্যগুলি দেশের গৌরব। তাই নাগরিকদের উচিত এগুলিকে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৮. পরিবেশ রক্ষা করা:
- প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন বন, নদী, হ্রদ এবং বন্যপ্রাণী মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- পরিবেশ নষ্ট হলে মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাই নাগরিকদের উচিত পরিবেশ রক্ষা করা এবং জীবজন্তুর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা।
৯. উৎকর্ষ সাধনের জন্য সচেষ্ট হওয়া:
- প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নিজের কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ অর্জনের জন্য চেষ্টা করা।
- যখন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে উৎকর্ষ অর্জিত হয়, তখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হয়।
১০. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা:
- ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুভাষিক দেশে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- এই মৌলিক কর্তব্য অনুযায়ী নাগরিকদের ধর্ম, ভাষা বা অঞ্চলের বিভেদ ভুলে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারীদের মর্যাদা হানিকর প্রথা পরিহার করতে হবে।
১১. শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা:
- ২০০২ সালে সংবিধানের ৮৬তম সংশোধনের মাধ্যমে এই মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়।
- এর মাধ্যমে বলা হয়েছে যে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের দায়িত্ব হলো ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।
- শিক্ষা একটি দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তাই এই কর্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলিক কর্তব্যের গুরুত্ব:
- ভারতের সংবিধানে মৌলিক কর্তব্য নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। এগুলি দেশের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বাড়ায়।
- এছাড়া মৌলিক কর্তব্য সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে, পরিবেশ রক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে।
উপসংহার:
সবশেষে বলা যায়, ভারতের সংবিধানে মৌলিক কর্তব্য নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এগুলি নাগরিকদের মনে করিয়ে দেয় যে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য শুধু অধিকার ভোগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং দেশের প্রতি নিজের দায়িত্বও পালন করতে হবে।
মৌলিক কর্তব্যগুলির মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ, পরিবেশ সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। যদি প্রত্যেক নাগরিক আন্তরিকভাবে এই কর্তব্যগুলি পালন করে, তবে ভারত একটি আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।