ভারতের নাগরিকত্ব আইন | অনুচ্ছেদ ৫–১১, নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ ও CAA ২০১৯ সম্পূর্ণ আলোচনা; Indian Citizenship Act.
PART-II: CITIZENSHIP (নাগরিকত্ব 5-11 নং ধারা):
1949 সালের 26শে নভেম্বর গণপরিষদে ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকত্ব সম্পর্কিত সংবিধানের 5-9 নং ধারা কার্যকরী হয়। ভারতের সকল অঞ্চলের নাগরিকদের সমমর্যাদা স্বীকৃত। এক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়গত বিচার-বিবেচনা কোনোরকম বৈষম্যের সৃষ্টি করতে পারে না।
তবে পার্লামেন্ট আইন করে কোনো অঙ্গ রাজ্যের বা আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের অধীনে চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করতে পারে 16(3) ধারা। এই বিষয়গুলি হল-
- রাজ্য সরকারের অধীনে চাকরি;
- রাজ্যে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ,
- রাজ্যের মধ্যে বসবাসের বন্দোবস্ত; এবং
- রাজ্য সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বৃত্তি ও অন্যান্য সাহায্য পাওয়ার অধিকার।
সংবিধানের 15 ধারায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ, জন্মস্থান ভেদে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘকালীন আবাসন বা বসবাসের বিষয়টিকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
নাগরিকতা সম্পর্কে সাংবিধানিক ব্যবস্থা (Constitutional Provisions Regarding Citizenship):
কোন্ কোন্ শর্তে কোনো ব্যক্তি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন সে বিষয়ে সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায় 5 থেকে 11 ধারার মধ্যে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
জন্ম বা বসবাসের সূত্রে নাগরিকতা অর্জন:
- সংবিধান চালু হওয়ার সময় অর্থাৎ 1950 সালের 26 জানুয়ারি তারিখে যারা ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা, তারা সকলে ভারতীয় নাগরিক হবেন, যদি তারা ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, বা তাদের পিতা-মাতার কেউ একজন ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন।
- সংবিধানের 5 ধারা অনুযায়ী সংবিধান প্রবর্তনের আগে অন্তত পাঁচ বছর ধরে ভারতে বসবাস করে আসছেন এমন নাগরিক যদি স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তবে তিনি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন।
পাকিস্তান থেকে আগত ব্যক্তিদের নাগরিকতা অর্জন:
- 1948 সালের 19 জুলাই তারিখের আগে যারা পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে বসবাস করছেন তারা ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন। তবে তারা বা তাদের পিতা-মাতার কেউ, বা পিতামহ-পিতামীর কেউ, মাতামহ-মাতামহীর কেউ একজন অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করে থাকলে এই নিয়ম প্রযুক্ত হবে সংবিধানের 6(খ) (1) ধারা।
- কিন্তু যারা 1948 সালের 19 জুলাই ও 1950 সালের 26 জানুয়ারির আগে যারা ভারতে এসে বসবাস করছেন, তিনি অন্তত ছয় মাস ভারতে বসবাস করলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে নাম নথিভুক্ত করলেতারাও ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন সংবিধানের 6 (খ) (2) ধারা।
- দেশ বিভাগের পর যারা ভারত থেকে পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন, তারাও উপরিউক্ত পদ্ধতি অনুসারেই ভারতীয় নাগরিক হতে পারবেন। তবে তাদের ভারতে স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের এবং বসবাসের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্রসহ ভারতে আসতে হবে সংবিধানের 7 ধারা।
- 1985 সালের নাগরিকতা সংশোধন আইন 1955 সালের নাগরিকত্ব আইন সঙ্গে 6 (ক) নামের নতুন একটি ধারা সংযুক্ত হয়। এই ধারা অনুসারে পূর্ব পাকিস্তান 1966 বাংলাদেশ থেকে যে সকল বিদেশী 1946 সালের 1 জানুয়ারি বা তারপরে কিন্তু 1971 সালের 25 মার্চের আগে অসমে এসেছেন তারা 1946 সালে বিদেশী আইন এবং 1946 সালের বিদেশী ট্রাইবুনাল নির্দেশ অনুসারে নাম নিবন্ধভুক্ত করে নাগরিক হতে পারবেন।
অবিভক্ত ভারতে ভৌগোলিক সীমার বাইরে বসবাসকারী ভারতীয়দের নাগরিকতা অর্জন:
- সংবিধানের ৪ নং ধারা- বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়রাও ভারতীয় নাগরিক গণ্য হবেন যদি তারা নিজে, বা তাদের পিতা-মাতা বা পিতামহ-পিতামহী, বা মাতামহ- মাতামহীর কেউ অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু তারা যে দেশে বসবাস করেছেন, সেই দেশস্থ ভারতীয় কূটনৈতিক দূতাবাসে আবেদন করে নাম নথিভুক্ত করতে হবে।
- সংবিধানের ৭ নং ধারা- যারা স্বেচ্ছায় বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, সংবিধানের 9 নং ধারা অনুসারে ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন না।
- সংবিধানের 10 নং ধারা-সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুসারে যারা ভারতের নাগরিক হিসাবে গণ্য হবেন পার্লামেন্ট প্রণীত আইন সাপেক্ষে তারা ভবিষ্যতেও সেই অধিকার ভোগ করতে থাকবেন।
সংবিধানের 11 নং ধারা: নাগরিকতার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সকল ক্ষমতা পার্লামেন্টকে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় নাগরিকতার অবলুপ্তি (Termination of Citizenship):
1955 সালের ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নাগরিকতার অবলুপ্তি তিনভাবে হতে পারে:
- পরিত্যাগ (renunciation),
- অবসান (termination)
- বঞ্চিতকরণ (deprivation)।
পরিত্যাগ (Renunciation):
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও সক্ষম ভারতীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় তার নাগরিকতা পরিত্যাগ করতে পারেন। যুদ্ধের সময় ব্যতিরেকে অন্য সময় যে-কোনো নাগরিক একটি ঘোষণার দ্বারা তার নাগরিকতা পরিহার করতে পারেন। ঘোষণাটি নিবন্ধীকৃত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকতা অবসান ঘটে।
অবসান (Termination):
কোনো ভারতীয় নাগরিক অন্য কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকতা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলে তার ভারতীয় নাগরিকতার অবসান ঘটবে স্বাভাবিকভাবেই। তবে ভারতের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এভাবে ভারতীয় নাগরিকতা অবসান ঘটে না।
বঞ্চিতকরণ (Deprivation):
দেশীয় করণ, রেজিস্ট্রিকরণ প্রভৃতি পদ্ধতিতে যারা ভারতীয় নাগরিকতা অর্জন করেছেন, ভারত সরকার কতকগুলি কারণে তাদের ভারতীয় নাগরিকতার অবসান ঘটাতে পারেন (আইনের 10 ধারা)। এই কারণগুলি হল-
- অসদুপায়ে ভারতীয় নাগরিকতা অর্জন,
- ভারতীয় সংবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা বা আনুগত্যের অভাব,
- ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত শত্রুদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা সেই দেশকে সাহায্য,
- দু’বছর বা তার অধিককাল বিদেশে কারাদণ্ড ভোগ এবং
- উপযুক্ত কারণ ছাড়া একাদিক্রমে সাত বছর দেশে অনুপস্থিত থাকা।
Dual-Citizenship: দ্বি-নাগরিকতা:
ভারতে Dual Citizenship চালু নেই। ভারতে রয়েছে Overseas Citizenship of India (OCI)। সংবিধানের Citizenship Act, 1955, Section 5(1)(g) অনুযায়ী 2005 সালের ২রা ডিসেম্বর চালু হয়েছে। তবে,
- ভোটাধিকার থাকবে না,
- ভারতে কোনো সাংবিধানিক পদ অলংকৃত করতে পারবেন না।
- ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়া যাবে না।
- ভারতে কোনো সরকারী চাকুরী পাওয়া যায় না।
বিবিধ:
1986 সালের নাগরিকতা সংশোধন আইন অনুসারে বর্তমানে অন্ততঃ পাঁচ বছর ভারতে নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার পর ভারতের নাগরিকতার জন্য আবেদন করতে পারা যায়।
- Citizenship Amendment Act, 1992 অনুযায়ী ভারতীয় নারীর সন্তান বিদেশে জন্মালে, সেই শিশু ভারতীয় নাগরিক হতে পারবে, পূর্বে এটি শুধুমাত্র ভারতীয় পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
- নাগরিকত্বের ধারণাটি এসেছে-ইংল্যান্ড থেকে।
- একনাগরিকত্ব-ভারতীয় সংবিধানে। (Single Citizenship, no state citizenship). অনুসরণ করা হয়েছে।
- দ্বি-নাগরিকত্ব-USAতে, USA-এর সংবিধান সবচেয়ে ছোট এবং দুষ্টবিবর্তনীয় (Rigid)। ভারতীয় সংবিধান সবচেয়ে বড়।
- নাগরিকত্ব আইন পাশ হয় 1955 সালে।
ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন, 1955 (The Citizenship Act, 1955):
জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জন (Citizenship by Birth or Jus Soli):
- 1950 সালের 26 জানুয়ারির পর, কিন্তু 1987 সালের 1 জুলাই তারিখের আগে ভারতে জন্মগ্রহণকারী সকল ব্যক্তি তাদের মাতা-পিতার জাতীয়তা যাই হোক না কেন, তিনি ভারতীয় নাগরিক।
- 1987 সালের। জুলাই তারিখে বা তারপরে ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন যদি জন্ম গ্রহণের সময় তার মাতা-পিতার কোনো একজন ভারতীয় নাগরিক থাকেন।
- 2004 সালের 3 ডিসেম্বরের পরে ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গভারতের নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হবেন যদি তাদের মাতা-পিতার উভয়ই ভারতের নাগরিক হোন অথবা তাদের মাতা-পিতার একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অন্যজন তাদের জন্ম গ্রহণের সময় অবৈধ অভিবাসী (illeal migrant) না হন [The Citizenship (Amendment) Act, 2003]|
- নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), 2019-এর পরিপ্রেক্ষিতে 1955 সালের আইনে 6(খ) ধারা নামে একটি নতুন ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী 2014 সালের 31 ডিসেম্বরের পূর্বে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীগণ অবৈধ অভিবাসী (illegal migrant) বলে পরিগণিত হবেন না। এই সকল মানুষেরা সংবিধানের 6(খ) ধারা অনুসারে দেশীয় করণের মাধ্যমে (Citizenship by Naturalisation) বা রেজিস্ট্রিকরণের মাধ্যমে (Citizenship by Registration) নাগরিকতা অর্জনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
- সংবিধানের ১ নং ধারায় বর্ণিত নাগরিকতা অর্জনের শর্তাবলী কিংবা সংবিধানের 6 নং তালিকায় উল্লেখিত দেশীয়করণের মাধ্যমে (Citizenship by Naturalsation) নাগরিকতা অর্জনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
রক্তের সম্পর্কে নাগরিকতা অর্জন (Citizenship by Descent or Jus Sanguinis):
- 1950 সালের 26 জানুয়ারি বা তারপরে কিন্তু 1992 সালের 10 ডিসেম্বরের আগে ভারতের বাইরে জন্মগ্রহণকারী রক্তের সম্পর্ক সূত্রে ভারতের নাগরিক হবেন যদি তার জন্ম গ্রহণের সময় তার পিতা ভারতের নাগরিক থাকেন।
- 1992 সালের 10 ডিসেম্বর তারিখের পরে কিন্তু 3 ডিসেম্বর, 2004 আগে ভারতের বাইরে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হবেন যদি তার জন্ম গ্রহণের সময় তার মাতা-পিতার অন্তত কোনো একজন ভারতীয় নাগরিক থাকেন।
- তবে 3 ডিসেম্বর, 2004-এর পরে ভারতের বাইরে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হবেন না যদি সেই দেশে ভারতীয় কনস্যুলেটে তার জন্ম গ্রহণের । (এক) বছরের মধ্যে জন্ম নথিভুক্তকরণ না হয়ে থাকে।
নিবন্ধীকরণের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন (Citizenship by Registration):
ভারত সরকার আবেদনপত্রের বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে অবৈধ অভিবাসী (illegal migrant) ব্যতিরেকে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে নিবন্ধীকরণ করতে পারেন। এইভাবে যারা ভারতীয় নাগরিক হতে পারবেন তারা হলেন:
- ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো ব্যক্তি যিনি নিবন্ধীকরণের জন্য আবেদন করার আগে সাধারণভাবে সাতবছর যাবৎ ভারতের অধিবাসী;
- ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো ব্যক্তি যিনি সাধারণভাবে অবিভক্ত ভারতের বাইরে যে-কোনো জায়গার অধিবাসী;
- নিবন্ধীকরণের জন্য আবেদন করার আগে সাধারণভাবে সাতবছর ভারতে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি যিনি কোনো ভারতীয় নাগরিককে বিবাহ করেছেন;
- ভারতীয় নাগরিকের নাবালক সন্তান;
- প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্য যুক্ত ব্যক্তি যার মাতা-পিতা ভারতীয় নাগরিক হিসাবে নিবন্ধীকৃত;
- প্রাপ্তবয়স্ক ও কোনো ব্যক্তি যার মাতা-পিতার কেউ আগে স্বাধীন ভারতের নাগরিক ছিলেন এবং নিবন্ধীকরণের জন্য আবেদন করার আগে সাধারণভাবে 12 মাস যাবৎ ভারতের অধিবাসী;
- প্রাপ্তবয়স্ক এবং সামর্থ্য যুক্ত ব্যক্তি পাঁচ বছর যাবৎ সমুদ্রপাড়ের ভারতীয় নাগরিকের কার্ডধারী হিসেবে নিবন্ধিত এবং যিনি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার আগে 12 মাস যাবৎ সাধারণভাবে ভারতের অধিবাসী।
1986 সালের নাগরিকতা সংশোধন আইন অনুসারে বর্তমানে অন্তত পাঁচ বছর ভারতে নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস করার পর রেজিস্ট্রিকরণের জন্য আবেদন করা যাবে। সংশোধিত আইন অনুসারে বিবাহসূত্রে নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারবে।
দেশীয় করণের মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন (Citizenship by Naturalisation):
সংবিধানের ৪নং ধারা অনুযায়ী আবেদনপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অভিবাসী (illegal migrant) ব্যতিরেকে, যে-কোনো ব্যক্তিকে ভারত সরকার দেশীয়করণের শংসাপত্র প্রদান করতে পারে যদি-
- আবেদনকারী ব্যক্তি এমন কোনো দেশের নাগরিক বা প্রজা নয়, যে দেশে ভারতীয় নাগরিকদের দেশীয় কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে সেই দেশের নাগরিক বা প্রজা করা হয় না;
- আবেদনকারী যদি অন্য একটি দেশের নাগরিক হয় এবং এই মর্মে অঙ্গীকার করে যে, ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন গৃহীত হলে, তিনি তার আগের দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করবেন;
- আবেদন করার পূর্বে বারো (12) বছর যাবৎ আবেদনকারী ব্যক্তি যদি ভারতে বসবাসকারী হন, বা ভারতে কোন সরকারের অধীনে চাকরি করেন, অথবা প্রথম এবং দ্বিতীয় শর্তের প্রতিটি আংশিকভাবে পূরণ করেন;
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আবেদন করার পূর্বে একটানা 12 মাস এবং পূর্ববর্তী 14 বছরের মধ্যে আবেদনকারী ব্যক্তি যদি 11 বছর যাবৎ ভারতে বসবাসকারী হন বা ভারতে কোন সরকারের অধীনে চাকরি করেন অথবা এই দুটি শর্তের প্রতিটি আংশিকভাবে পূরণ করে;
- আবেদনকারী একজন সৎ চরিত্রের মানুষ;
- সংবিধানের অষ্টম তফসিলে উল্লিখিত ভাষাসমূহের একটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্যক জ্ঞান আছে।
তবে সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা, ললিতকলা, বিশ্বশান্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গের দেশীয় করণের ক্ষেত্রে ভারত সরকার উপরি উল্লিখিত সকল বা যে-কোনো শর্ত শিথিল বা তুলে দিতে পারেন। দেশীয় কোনো প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত সকল ভারতীয় নাগরিককে ভারতীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে হয়।
তবে নাগরকিত্ব সংশোধনী আইন (CAA), 2019 অনুযায়ী 2014 সালের 31 ডিসেম্বরের পূর্বে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীগণ অবৈধ অভিবাসী (illegal migrant) বলে পরিগণিত হবেন না এবং তাদের ক্ষেত্রে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সময়সীমা ।। বছরের পরিবর্তে 5 বছর করা হয়েছে।
ভারতভুক্তির মাধ্যমে নাগরিকতা অর্জন (Citizenship by Incorporation of Territory):
কোনো ভূখণ্ড নতুনভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে সরকার ঐ অঞ্চলের নাগরিকদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে। যেমন-গোয়া, সিকিম, পুদুচেরী এইভাবে ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
অসম সহমত (Assam Accord)-এর ভিত্তিতে ব্যক্তিবর্গের নাগরিকতার বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা (Special Provisions to Citizenship of Persons Covered by the Assam Accord):
1986 সালের নাগরিকতা সংশোধন আইন [The Citizenship (Amendment) Act, 1986]-এর পরিপ্রেক্ষিতে 1955 সালের আইন 6(ক) ধারা নামে একটি নতুন ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে যে, 1966 সালের 1 জানুয়ারি থেকে 1971 সালের 25 মার্চের মধ্যে অবিভক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত যে সমস্ত মানুষ বাংলাদেশ থেকে অসম এসেছেন, 1967 সালের বিদেশী বাছাই ট্রাইবুন্যালের আদেশ অনুসারে তাদের নাম নথিভুক্ত করতে হবে। পরবর্তী 10 বছর যাবৎ ভোটাধিকার ছাড়া ভারতীয় নাগরিকের অধিকার ভোগ করবেন। কিন্তু যারা 1966 সালের আগেই এসেছেন তারা ভারতের পূর্ণনাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন।
2015 সালের নাগরিকতা সংশোধনী আইনে [The Citizenship (Amendment) Act, 2015] সমুদ্রপারে নাগরিকতা (OCI) সম্পর্কিত বিধি ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। এই সংশোধনী আইনে নাগরিকতা সম্পর্কিত এই নতুন একটি ব্যবস্থা সংযুক্ত হয়েছে। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলির নাগরিকরা ভারতের কমনওয়েলথ নাগরিকের মর্যাদা ভোগ করেন। যেমন-ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশের নাগরিকরা এই সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯: (CAA).
সম্প্রতি ভারতের সংসদ নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল, ২০১৯ পাস করে, যা রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর আইনে পরিণত হয়। এই আইনটি নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে।
নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী নাগরিকত্ব অর্জনের বিভিন্ন উপায় রয়েছে—
- জন্মসূত্রে।
- বংশসূত্রে।
- নিবন্ধনের মাধ্যমে।
- স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে।
- ভারতের ভূখণ্ডে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে।
এছাড়া এই আইন ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (OCI) কার্ডধারীদের নিবন্ধন ও অধিকার নিয়ন্ত্রণ করে। OCI কার্ডধারীরা ভারতে আজীবন বহুবার প্রবেশের সুবিধাসহ কিছু বিশেষ অধিকার ভোগ করেন।
অবৈধ অভিবাসী (Illegal Migrant) বলতে সেই বিদেশিকে বোঝায়—
- যিনি বৈধ ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে প্রবেশ করেছেন
- বৈধভাবে প্রবেশ করলেও অনুমোদিত সময়সীমার বেশি অবস্থান করেছেন।
অবৈধ অভিবাসীরা ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করতে পারে না এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, দেশ থেকে বহিষ্কার বা কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০১৬ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্র সরকার কিছু নির্দিষ্ট অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার থেকে অব্যাহতি দেয়। এই অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন—
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত (৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-এর আগে আগত) হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা।
সংশোধনী আইনের প্রধান বিধানসমূহ:
অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য না করা:
এই আইন অনুযায়ী আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা (যাঁরা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-এর আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন) অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য হবেন না।
বিদেশি আইন ও পাসপোর্ট আইনে অব্যাহতি:
এই সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই—
- বিদেশি আইন, ১৯৪৬ এবং
- পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন, ১৯২০ থেকে কেন্দ্র সরকারের দ্বারা অব্যাহতি প্রাপ্ত হতে হবে।
নিবন্ধন ও স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব:
নাগরিকত্ব আইনে নিবন্ধন বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভারতে প্রবেশের তারিখ থেকেই ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য করা হবে।
- অবৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত সকল মামলা বন্ধ হয়ে যাবে।
নাগরিকত্ব লাভের পর ফলাফল:
- সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভারতে প্রবেশের তারিখ থেকেই ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য করা হবে।
- অবৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত সকল মামলা বন্ধ হয়ে যাবে।
সংশোধনী আইনের প্রয়োগ ক্ষেত্র যেসব আইন প্রযোজ্য হবে না—
- সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত অঞ্চলসমূহে (আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরার আদিবাসী এলাকা)
- ইনার লাইন পারমিট (ILP) অঞ্চলে
বর্তমানে ILP ব্যবস্থা প্রযোজ্য— অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে।
OCI নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত বিধান:
কেন্দ্র সরকার নিম্নলিখিত কারণে OCI নিবন্ধন বাতিল করতে পারে—
- জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন
- নিবন্ধনের পাঁচ বছরের মধ্যে দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হলে
- ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে
নতুন সংশোধনীতে আরও একটি কারণ যুক্ত হয়েছে—
- যদি OCI কার্ডধারী এই আইন বা কেন্দ্র সরকার দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনও আইন লঙ্ঘন করেন
তবে নিবন্ধন বাতিলের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিসমূহ:
উত্তর-পূর্ব ভারতের সমস্যা:
- এটি আসাম চুক্তি (১৯৮৫)–এর পরিপন্থী, যেখানে বলা হয়েছে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর পর আগত সকল অবৈধ অভিবাসীকে (ধর্ম নির্বিশেষে) বহিষ্কার করতে হবে।
- NRC আপডেট প্রক্রিয়া কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে বলে সমালোচকরা মনে করেন।
- আসামে প্রায় ২ কোটি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করেছে।
সাংবিধানিক আপত্তি:
- এটি সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সমতার অধিকার) এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করে।
- শ্রীলঙ্কার তামিল বা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা হিন্দুরা এই আইনের আওতায় পড়েননি।
- নিপীড়িত ও অবৈধ অভিবাসীদের আলাদা করা কঠিন।
- OCI বাতিলের ক্ষেত্রে সরকারের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের অবস্থান:
- পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র; সেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু নয়।
- এই আইন কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে না, বরং দিচ্ছে।
- অন্য সম্প্রদায়ের আবেদন কেস বাই কেস বিবেচিত হবে।
- দেশভাগ ও নেহরু–লিয়াকত চুক্তির ব্যর্থতাই এই আইনের মূল ভিত্তি।
- আসাম চুক্তির ধারা ৬ কার্যকর করার জন্য উচ্চস্তরের কমিটি গঠিত হয়েছে।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনসমূহ:
নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫–এ একাধিকবার সংশোধন আনা হয়েছে—
| সংশোধনী বছর | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| ১৯৮৬ | জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের শর্ত কঠোর |
| ১৯৯২ | মাতৃসূত্রে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি |
| ২০০৩ | অবৈধ অভিবাসীর ধারণা সংযোজন |
| ২০০৫ | OCI (Overseas Citizen of India) ব্যবস্থা প্রবর্তন |
| ২০১৫ | PIO ও OCI একত্রিত |
| ২০১৯ | CAA—ধর্মভিত্তিক ছাড় ও নাগরিকত্ব সহজীকরণ |
উপসংহার:
ভারতীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থা সংবিধান ও সংসদপ্রণীত আইনের মাধ্যমে একটি সুসংহত ও গতিশীল কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ৫–১১) নাগরিকত্বের মৌলিক নীতিসমূহ নির্ধারিত হয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১১-এর মাধ্যমে সংসদকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এর ফলস্বরূপ নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ এবং তার বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে সময়ের পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিকত্ব ব্যবস্থাকে ক্রমাগত পরিমার্জিত করা হয়েছে।
একদিকে যেমন জন্ম, বংশ, নিবন্ধন, স্বাভাবিকীকরণ ও ভূখণ্ড সংযোজনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনের স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়েছে, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসন রোধ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিকত্বের অবসান সংক্রান্ত বিধান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার সংখ্যালঘুদের আশ্রয় ও নাগরিকত্ব প্রদানের একটি বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর সাংবিধানিক বৈধতা, সমতার নীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও বিচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
পরিশেষে বলা যায়, নাগরিকত্ব কেবল একটি আইনগত মর্যাদা নয়, বরং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে অধিকার ও কর্তব্যের এক গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন। তাই ভারতের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিকতা, সংবিধানের মৌলিক আদর্শ, জাতীয় ঐক্য এবং আঞ্চলিক সংবেদনশীলতার মধ্যে সুসমন্বয় বজায় রাখাই হওয়া উচিত চূড়ান্ত লক্ষ্য।



Post Comment