ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্য (Indian Classical Dance).
ভূমিকা:
ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় নৃত্যকলা ভারতের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নৃত্যশৈলীর ভিত্তি গড়ে উঠেছে প্রাচীন শাস্ত্র ও ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে। বিশেষত Natya Shastra-এ বর্ণিত নৃত্য, সঙ্গীত ও অভিনয়ের নিয়মাবলি শাস্ত্রীয় নৃত্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ভরত মুনির রচিত এই গ্রন্থে রস, ভাব, মুদ্রা, অঙ্গসঞ্চালন প্রভৃতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন নৃত্যধারার বিকাশে দিশা দিয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাধিক শাস্ত্রীয় নৃত্যশৈলীর উদ্ভব হয়েছে। যেমন— Bharatanatyam, Kathak, Odissi, Kathakali, Manipuri, Kuchipudi, Mohiniyattam এবং Sattriya। প্রতিটি নৃত্যশৈলীর নিজস্ব ভঙ্গিমা, পোশাক, সঙ্গীত ও আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তবে সকলের মূল লক্ষ্য হল ভক্তি, নান্দনিকতা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির প্রকাশ।
শাস্ত্রীয় নৃত্যে নৃত্য (নৃত্ত), অভিনয় (অভিনয়) ও নৃত্যনাট্য (নাট্য) – এই তিনটি দিকের সমন্বয় ঘটে। দেহভঙ্গি, হাতের মুদ্রা, চোখের অভিব্যক্তি ও মুখমণ্ডলের ভাবপ্রকাশের মাধ্যমে শিল্পী দর্শকদের কাছে একটি নির্দিষ্ট রস বা অনুভূতি পৌঁছে দেন। এইভাবে ধ্রুপদি নৃত্যকলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং তা আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ।
ভরতনাট্যম (Bharatanatyam):
উৎপত্তি ও ঐতিহ্য:
Bharatanatyam দক্ষিণ ভারতের এক প্রাচীন ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী। এর প্রাথমিক চর্চা গড়ে ওঠে মন্দিরের দেবদাসীদের মধ্যে। নিত্যপূজা বা বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দেবদাসীরা এই নৃত্যের মাধ্যমে দেবতার উদ্দেশ্যে নিজেদের নিবেদন করতেন। চোল, পান্ড্য, নায়ক ও বিজয়নগর রাজ্যের শাসকেরা এই নৃত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মন্দিরকেন্দ্রিক পরিবেশনার কারণে ভরতনাট্যমের অপর নাম ছিল ‘দাসী আট্টম’। কথিত আছে, ভগবান ব্রহ্মা ভরত মুনিকে এই নৃত্যরীতির তত্ত্ব জানান এবং পরবর্তীতে ভরত মুনি তাঁর Natyashastra গ্রন্থে এর কৌশল, মুদ্রা ও সংজ্ঞা সংস্কৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন।
গঠন ও বৈশিষ্ট্য:
ভরতনাট্যমে হাত, পা, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বিত নড়াচড়ার মাধ্যমে ৬৪টি বিশেষ ভঙ্গি প্রকাশ করা হয়। এই নৃত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল পা বাঁকা করে (অর্ধমণ্ডলী ভঙ্গি) তাল প্রদান। মুখের অভিব্যক্তি (অভিনয়), হস্তমুদ্রা এবং সূক্ষ্ম দেহভঙ্গি মিলিয়ে ভক্তি, প্রেম, করুণা বা বীরত্বের মতো নানা রস ফুটিয়ে তোলা হয়। পূর্ণাঙ্গ পরিবেশনায় সাধারণত প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে, কারণ এতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পর্ব উপস্থাপিত হয়।
পরিবেশনার বিভাগ:
ভরতনাট্যমের পরিবেশনা কয়েকটি নির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত—
- আলারিপু: সূচনাপর্ব; শুদ্ধ নৃত্যের মাধ্যমে দেহের প্রস্তুতি।
- জথি-স্মরণ: তাল ও লয়ের জটিল বিন্যাস।
- শব্দম: অভিনয় ও পদাবলীর সূচনা।
- বর্ণম: পরিবেশনার কেন্দ্রীয় ও দীর্ঘতম অংশ; নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়।
- জাভালি: লঘু ও আবেগময় উপস্থাপনা।
- থিলানা: সমাপ্তিপর্ব; দ্রুত লয়ের উচ্ছ্বাসপূর্ণ নৃত্য।
এই ধারাবাহিক বিন্যাস ভরতনাট্যমকে একটি পূর্ণাঙ্গ নৃত্যনাট্যে পরিণত করে।
সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র ও পোশাক:
ভরতনাট্যমের সংগীতধারা মূলত কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর ভিত্তি করে। সহযোগী বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মৃদঙ্গ, বেহালা, বাঁশি এবং একজোড়া করতাল ব্যবহৃত হয়। কখনও কখনও তম্বুরাও ব্যবহৃত হয় সুরধারণের জন্য। নৃত্যশিল্পীরা সাধারণত সুদৃশ্য সিল্কের শাড়ি, নানা অলংকার, কোমরবন্ধ, নূপুর প্রভৃতি জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে সজ্জিত থাকেন। এই ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা নৃত্যের সৌন্দর্য ও ভাবপ্রকাশকে আরও সমৃদ্ধ করে।
পুনরুজ্জীবন ও প্রখ্যাত শিল্পী:
ঔপনিবেশিক যুগে দেবদাসী প্রথার অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভরতনাট্যমেরও হৃতগৌরব ঘটে। এই ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন E. Krishna Iyer। পাশাপাশি Rukmini Devi Arundale ভরতনাট্যমকে মঞ্চনির্ভর শাস্ত্রীয় রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথিতযশা শিল্পীদের মধ্যে বালা সরস্বতী, শান্তা রাও, মৃণালিনী সারাভাই, যামিনী কৃষ্ণমূর্তি, কমলা, বৈজয়ন্তীমালা, সোনাল মান সিংহ ও সংযুক্তা পাণিগ্রাহী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কুচিপুড়ি নৃত্য (Kuchipudi):
পরিচয় ও স্বীকৃতি:
Kuchipudi ভারতের অন্যতম প্রধান ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী। এটি একপ্রকার নৃত্যনাট্য, যেখানে সংগীত, অভিনয় ও তালের সমন্বয়ে ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনি উপস্থাপন করা হয়। ভারতের জাতীয় সংগীত-নৃত্য-নাট্য শিক্ষায়তন Sangeet Natak Akademi (১৯৫৩) কুচিপুড়িকে স্বীকৃত ধ্রুপদি নৃত্যরূপ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।
উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য:
অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা জেলার কুচিপুডি গ্রাম থেকে এই নৃত্যের উৎপত্তি। প্রথমদিকে এটি ব্রাহ্মণ পুরুষ শিল্পীরা মন্দির ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিবেশন করতেন। কুচিপুড়ির সঙ্গে Bharatanatyam-এর সাদৃশ্য থাকলেও কুচিপুড়ির গতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও অধিক প্রাণবন্ত। মুখের অভিব্যক্তি, হস্তমুদ্রা ও ঘূর্ণনভঙ্গি এর প্রধান আকর্ষণ।
ঐতিহাসিক বিকাশ:
সপ্তদশ শতকে অদ্বৈত বেদান্ত সন্ন্যাসী সিদ্ধেন্দ্র যোগি কুচিপুড়ির আধুনিক রূপদান করেন এবং ‘ভামাকলাপম’ নামক বিখ্যাত নৃত্যনাট্য রচনা করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর কিছুটা অবনতি ঘটলেও লক্ষ্মীনারায়ণ শাস্ত্রী প্রমুখ শিল্পীদের প্রচেষ্টায় কুচিপুড়ি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং নারীদের অংশগ্রহণ শুরু হয়।
পরিবেশনা ও উপাদান:
কুচিপুড়ি পরিবেশনা সাধারণত পূজার্চনার মাধ্যমে শুরু হয়। রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনি এতে উপস্থাপিত হয়। ‘তারঙ্গম’ এই নৃত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেখানে শিল্পী পিতলের থালার উপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করেন। তম্বুরা, মৃদঙ্গম, বীণা, বাঁশি ও মন্দিরা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয় এবং সংগীতধারা কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতভিত্তিক।
গুরুত্ব:
কুচিপুড়ি কেবল একটি নৃত্যশৈলী নয়, এটি ভক্তি, নাট্য, সংগীত ও সৌন্দর্যের সমন্বয়ে গঠিত এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা ভারতের শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছে।

কথক (Kathak):
উৎপত্তি ও অর্থ:
Kathak উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী। ‘কথক’ শব্দটি এসেছে ‘কথা’ থেকে, যার অর্থ গল্প বা কাহিনি। প্রাচীনকালে কথকরা সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে রামায়ণ ও মহাভারতসহ বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করতেন। এই কাহিনিনির্ভর উপস্থাপনাই ক্রমে নৃত্যনাট্যের রূপ নেয় এবং সেখান থেকেই কথক নৃত্যের জন্ম।
বিস্তার ও ঘরানা:
কথকের প্রধান বিস্তার উত্তর ভারতের উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলে। এর মূল কেন্দ্র বা ঘরানা চারটি—
- লক্ষ্ণৌ।
- বেনারস।
- জয়পুর।
- দিল্লি।
লক্ষ্ণৌ ঘরানা কোমল অভিব্যক্তি ও সূক্ষ্ম অভিনয়ের জন্য প্রসিদ্ধ, জয়পুর ঘরানা তীব্র লয় ও জটিল তালপ্রধান নৃত্যের জন্য বিখ্যাত। দিল্লি ও বেনারস ঘরানাও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ।
বৈশিষ্ট্য:
কথকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল দ্রুত পায়ের তাল (তৎকার বা টটকর) এবং ঘূর্ণন। নৃত্যশিল্পী পায়ের নূপুরের ঝংকারে জটিল তালের বিন্যাস সৃষ্টি করেন। কথকে হাতের মুদ্রা অপেক্ষা পায়ের কাজ ও লয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে কাহিনি প্রকাশ করা হয়। মুঘল আমলে রাজসভায় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় কথকের ভঙ্গি ও পোশাকে কিছুটা দরবারি প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
পরিবেশনার বিভাগ:
কথক নৃত্যের পরিবেশনায় বিভিন্ন অংশ বা উপাদান থাকে—
- টটকর: পায়ের তালের মৌলিক অনুশীলন।
- পলতাস: বিভিন্ন তালের রূপান্তর ও পুনরাবৃত্তি।
- থোরাস (তুকড়া/তোড়া): সংক্ষিপ্ত নৃত্যাংশ।
- আমাদ: মঞ্চে প্রবেশের বিশেষ ধারা।
- পরাণ: পাখাওয়াজ-প্রধান তালের জটিল অংশ।
এই বিভাগগুলির সমন্বয়ে কথক একটি পূর্ণাঙ্গ নৃত্যরূপ ধারণ করে।
সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র:
কথকের সংগীতধারা মূলত হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর নির্ভরশীল। সহযোগী বাদ্যযন্ত্র হিসেবে একজোড়া তবলা ও সারেঙ্গী বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। কখনও কখনও হারমোনিয়াম ও পাখাওয়াজও ব্যবহৃত হয়। তবলার তালে নৃত্যশিল্পী পায়ের মাধ্যমে জটিল ছন্দের প্রকাশ ঘটান।
পোশাক:
নারী নৃত্যশিল্পীরা সাধারণত ঘাগরা, চূর্ণী ও সালোয়ার পরিধান করেন। পোশাক সাধারণত রঙিন ও আড়ম্বরপূর্ণ হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে কুর্তা ও চুড়িদার পায়জামা প্রচলিত, চূর্ণী ব্যবহার করা হয় না। নূপুর কথক নৃত্যের একটি অপরিহার্য অংশ।
প্রখ্যাত শিল্পী:
কথক নৃত্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বহু প্রথিতযশা শিল্পী। তাঁদের মধ্যে Sitara Devi, Birju Maharaj, গোপীকৃষ্ণণ, বিন্দাদিন মহারাজ, কালকাদিন মহারাজ, আচন মহারাজ এবং উমা শর্মা প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষত বিরজু মহারাজ কথক নৃত্যের আধুনিক রূপায়ণে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

মোহিনীআট্টম (Mohiniyattam):
উৎপত্তি ও পরিচয়:
Mohiniyattam কেরালার এক বিশিষ্ট ধ্রুপদি একক নৃত্যশৈলী। ‘মোহিনী’ শব্দের অর্থ মায়াবী নারী—যিনি সৌন্দর্য ও ভঙ্গিমায় সকলকে আকর্ষণ করতে পারেন। এই নৃত্যের নামকরণ হয়েছে ভগবান বিষ্ণুর সম্মোহনী অবতার Mohini-এর নামানুসারে। মোহিনীআট্টম মূলত নারীনির্ভর একক নৃত্য, যেখানে কোমলতা, লাবণ্য ও নমনীয় ভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে মহামঙ্গলম নারায়ণন নাম্বুদিরি রচিত ‘ব্যবহার মালা’ গ্রন্থে প্রথম মোহিনীআট্টমের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এই নৃত্যের প্রাচীনত্বের প্রমাণ বহন করে।
বৈশিষ্ট্য ও গঠন:
মোহিনীআট্টমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর লাস্যধর্মী (কোমল ও সুকুমার) ভঙ্গি। এটি তাণ্ডবধর্মী নৃত্যের বিপরীতে মৃদু, স্নিগ্ধ ও ধীরলয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। শরীরের মসৃণ দোলন, কোমরের নমনীয় নড়াচড়া এবং সূক্ষ্ম মুখাভিনয় এই নৃত্যের মূল আকর্ষণ। মোহিনীআট্টমে মোট ৪০টি মৌলিক অভঙ্গি বা ভঙ্গি রয়েছে, যা নৃত্যের কাঠামোকে সমৃদ্ধ করে। এর পদক্ষেপ সাধারণত বৃত্তাকার এবং প্রবাহমান, যা বাতাসের গতির মতো কোমল অনুভূতি সৃষ্টি করে।
উপাদান ও ভাবধারা:
মোহিনীআট্টমের মূল উপাদান হিসেবে ‘বায়ু’ বা বাতাসকে ধরা হয়। নৃত্যের দোলায়মান ভঙ্গি ও মসৃণ গতি যেন বাতাসের স্নিগ্ধ প্রবাহকে প্রকাশ করে। এই নৃত্যশৈলী মূলত ভক্তিমূলক ও আবেগপ্রধান। বিষ্ণু ও কৃষ্ণভক্তি সম্পর্কিত কাহিনি, পৌরাণিক আখ্যান এবং নায়িকা-নায়কের ভাবপ্রকাশ এতে স্থান পায়। মুখের অভিব্যক্তি ও হস্তমুদ্রার মাধ্যমে শিল্পী বিভিন্ন রস—বিশেষত শৃঙ্গার ও ভক্তিরস—উপস্থাপন করেন।
ভারতনাট্যমের সঙ্গে সাদৃশ্য:
মোহিনীআট্টমের সঙ্গে Bharatanatyam-এর অনেক মিল রয়েছে। উভয় নৃত্যেই শাস্ত্রসম্মত মুদ্রা ও ভঙ্গির প্রয়োগ দেখা যায়। তবে ভরতনাট্যম যেখানে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় ও শক্তিশালী ভঙ্গির উপর নির্ভরশীল, সেখানে মোহিনীআট্টম অধিক কোমল, স্নিগ্ধ ও লাস্যময়।
পোশাক ও সঙ্গীত:
মোহিনীআট্টমে নৃত্যশিল্পী সাধারণত সাদা বা অফ-হোয়াইট কেরালার ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, যার কিনারায় সোনালি পাড় থাকে, তা পরিধান করেন। অলংকার ও চুলের খোঁপায় জুঁইফুলের সাজ এই নৃত্যের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। সংগীতধারা মূলত কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতভিত্তিক এবং মৃদঙ্গম, বীণা ও বাঁশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

কথাকলি (Kathakali):
উৎপত্তি ও পরিচয়:
Kathakali কেরালার অত্যন্ত জনপ্রিয় ধ্রুপদি নৃত্যনাট্য। এটি একক নৃত্য নয়; বরং বহু শিল্পীর সমন্বয়ে গঠিত এক পূর্ণাঙ্গ নাট্যরূপ। গান, কবিতা, মুকাভিনয়, নৃত্য ও নাটক—সব মিলিয়ে কথাকলি এক অনন্য শিল্পধারা। সাধারণত সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে প্রায় সারারাত ধরে এর পরিবেশনা চলে। রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন প্রাচীন পুরাণকাহিনি থেকে কথাকলির বিষয় নির্বাচন করা হয়। প্রাচ্যের মহাকাব্যিক রূপ হিসেবে একে অনেক সময় “Saga of the East” বলা হয়।
ঐতিহাসিক বিকাশ:
কথাকলির পূর্বসূরি হিসেবে কেরালায় Krishnanattam (প্রতিষ্ঠাতা মানবেদ রাজা) প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে Ramanattam (প্রতিষ্ঠাতা কেরল বর্মা) নৃত্যের উদ্ভব হয়, যার মূল বিষয়বস্তু ছিল রামায়ণ, শিবপুরাণ ও ভাগবত। ক্রমে রামানাট্টমেরই বিকশিত রূপ কথাকলি নামে পরিচিতি লাভ করে। এই ধারায় নৃত্য, সংগীত ও নাট্যশৈলীর সুসমন্বয় ঘটেছে।
বৈশিষ্ট্য ও গঠন:
কথাকলির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশদ মেক-আপ ও মুখোশসদৃশ রূপসজ্জা। এতে মোট ৬৪ প্রকার হস্তভঙ্গি (মুদ্রা) প্রচলিত। চরিত্র অনুযায়ী বিশেষ রঙের মেক-আপ ব্যবহৃত হয়—
- পাচ্চা (সবুজ): দেবত্ব বা মহৎ চরিত্র।
- কাট্টি (ছুরি চিহ্নিত): অহংকারী বা দুষ্ট নায়ক।
- কারি (কালো): অসুর বা দানব চরিত্র।
- মিনুক্কু: কোমল ও শান্ত চরিত্র।
- তাপ্পু/চুভন্না তাডি: উগ্র স্বভাবের চরিত্র।
- পাযুপ্পু (হলুদাভ): বিশেষ ধরনের পৌরাণিক চরিত্র।
এই মেক-আপ ও বর্ণবৈচিত্র্য চরিত্রের স্বভাব ও মানসিকতা প্রকাশ করে। নৃত্যশিল্পীরা ভারী পোশাক, মুকুট ও অলংকারে সজ্জিত থাকেন, যা মঞ্চে এক নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
সংগীত ও শিল্পীর ধরন:
কথাকলিতে গানের সঙ্গে ঘণ্টা, করতাল ও ড্রামের ব্যবহার হয়। প্রধান বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে চেন্ডা (ড্রাম), মাদ্দালম, করতাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। পরিবেশনায় সাধারণত তিন ধরনের শিল্পী অংশ নেন—
- নৃত্যশিল্পী।
- বাচিক ও সংগীতশিল্পী।
- যন্ত্রশিল্পী।
কণ্ঠশিল্পীরা মঞ্চের পাশে বসে গান পরিবেশন করেন এবং নৃত্যশিল্পীরা মুদ্রা ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে কাহিনি প্রকাশ করেন।
প্রখ্যাত শিল্পী:
কথাকলি নৃত্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করেছেন বহু গুণী শিল্পী। তাঁদের মধ্যে Guru Krishna Kutty, Kanak Rele, রাঘবন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া V. N. Menon কথাকলির বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে পরিচিত।

ওডিশি নৃত্য(Odissi Dance):
উৎপত্তি:
Odissi ভারতের অন্যতম প্রাচীন ধ্রুপদী নৃত্যশৈলী। এর উৎপত্তিস্থল পূর্ব ভারতের Odisha রাজ্য। মন্দিরভিত্তিক এই নৃত্য মূলত দেবদেবীর আরাধনার উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হত। বিশেষ করে Jagannath Temple-কে কেন্দ্র করে এই নৃত্যের বিকাশ ঘটে। প্রাচীন শিলালিপি ও মন্দির ভাস্কর্যে ওডিশি নৃত্যের ভঙ্গিমার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতের ধ্রুপদী নৃত্যগুলির মধ্যে এটি এক অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্যরূপ।
নামকরণ ও মূল নীতি:
‘ওডিশি’ শব্দটি ‘ওড়িশা’ থেকে উদ্ভূত। এই নৃত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল দেহের বিভিন্ন বিভঙ্গ বা বিক্ষেপের ব্যবহার। ত্রিভঙ্গী (মাথা, বক্ষ ও নিতম্বের তিন ভিন্ন ভঙ্গি) এবং চৌকা (চতুষ্কোণ ভঙ্গি) এই নৃত্যের প্রধান নান্দনিক উপাদান, যা অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্য থেকে একে পৃথক করেছে।
মূল উপাদান:
ওডিশি নৃত্যের প্রধান উপাদান হল ‘জল’। এর চলনভঙ্গি তরঙ্গায়িত ও নমনীয়, যা জলের প্রবাহের মতো মসৃণ ও কোমল।
পোশাক:
ওডিশি নৃত্যশিল্পীর পোশাক সাধারণত উজ্জ্বল রঙের শাড়ি ও আঁটোসাঁটো ব্লাউজ। শাড়িতে ঐতিহ্যবাহী বোমকাই বা সংবালপুরী নকশা দেখা যায়। মাথায় রূপার অলংকার ও ‘মুকুট’ আকৃতির ফুলের সাজ বিশেষ বৈশিষ্ট্য। গহনার মধ্যে রূপার হার, কানের দুল ও কোমরবন্ধ ব্যবহৃত হয়।
সহযোগী বাদ্যযন্ত্র:
এই নৃত্যের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হল মৃদঙ্গ বা মাদল। এছাড়া করতাল, বাঁশি এবং একটি তারযন্ত্র (যেমন বীণা বা সিতার) ব্যবহৃত হয়। সঙ্গীত সাধারণত ওড়িয়া ভাষার পদাবলী বা সংস্কৃত শ্লোকভিত্তিক।
বিভাগ:
ওডিশি নৃত্যের পরিবেশনা কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্বে বিভক্ত—
- ভূমি প্রণাম (মঞ্চ ও পৃথিবীকে প্রণাম)।
- বটু নৃত্য।
- পল্লবী (রাগভিত্তিক নৃত্য)।
- অভিনয় বা অষ্টপদী (কাব্যভিত্তিক ভাবপ্রকাশ)।
- মোক্ষ (সমাপ্তি পর্ব)।
৭. ঘরানা :
ওডিশি নৃত্যশৈলীতে প্রধানত তিনটি ঘরানার উপস্থিতি রয়েছে—
| ঘরানা | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| মহারি | (i) প্রাচীনকালে ওড়িশার Jagannath Temple-এর দেবদাসীরা ‘মহারি’ (মহা + নারী) নামে পরিচিত ছিলেন। (ii) এই ঘরানা মূলত মন্ত্র ও শ্লোকের মাধ্যমে নৃত্যনাট্যরূপে মন্দিরে পরিবেশিত হত। |
| নর্তকী | (i) প্রাক-ব্রিটিশ যুগে এই ঘরানার উদ্ভব হয়। (ii) ওড়িশার রাজপ্রাসাদে এই ঘরানার নৃত্য উপস্থাপন করা হত; এটি ছিল দরবারি পরিবেশনা। |
| গোতিপুয়া | (i) ষোড়শ শতাব্দীতে এই ঘরানার উদ্ভব। (ii) বৈষ্ণব ধর্মে নারীনৃত্যের প্রচলন না থাকায় ছোট ছেলেদের মেয়ে সাজিয়ে নৃত্য পরিবেশন করানো হত। (iii) এরা মন্দিরের বাইরে প্রকাশ্য স্থানে নৃত্য উপস্থাপন করত। |
বৈশিষ্ট্য:
ওড়িশার ধ্রুপদি নৃত্যধারার (ওডিশি) নৃত্যশৈলীর বিভিন্ন অংশ উপস্থাপন করা হলো—
| নৃত্যশৈলী | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| মঙ্গলাচরণ | মঙ্গলাচরণে ভূমিপ্রণাম করা হয়। এছাড়া ‘ত্রিখণ্ডী প্রণাম’-এর মাধ্যমে মস্তকে ঈশ্বর, মুখাগ্রে গুরুদেব এবং বক্ষাগ্রে দর্শকদের প্রণাম জানানো হয়। |
| বাটটু নৃত্য | এতে নটরাজ রূপে Shiva-এর বটুকভৈরব সত্তাকে স্মরণ করে শুদ্ধ নৃত্য পরিবেশন করা হয়। |
| পল্লবী | নির্দিষ্ট রাগকে চক্ষু সঞ্চালন, দেহভঙ্গিমা ও জটিল পদচালনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিকশিত করা হয়; লয়ের ক্রমবৃদ্ধি এর বৈশিষ্ট্য। |
| অভিনয় | কবিতা বা পদাবলীর কাহিনি নৃত্যশিল্পী মুদ্রা, মুখের অভিব্যক্তি ও দেহসঞ্চালনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। |
| দশাবতার | ভগবান Vishnu-র দশ অবতারকে নৃত্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। |
| মোক্ষ | সমাপ্তিপর্ব; মোক্ষপ্রাপ্তির প্রতীকী নৃত্য। মাদল ও পাখোয়াজের তালে পরিবেশিত হয়ে আত্মার মুক্তির ভাব প্রকাশ করে। |

মণিপুরী (Manipuri):
উৎপত্তি ও ধর্মীয় ভিত্তি:
Manipuri উত্তর–পূর্ব ভারতের ছোট্ট রাজ্য Manipur-এর এক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আন্তর্জাতিক মানের ধ্রুপদি নৃত্যশৈলী। এর মূল ভিত্তি ঈশ্বর আরাধনা। প্রাচীনকালে এই নৃত্যে প্রধান চরিত্র ছিলেন শিব ও দুর্গা; পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষ্ণ ও রাধা আধুনিক মণিপুরী নৃত্যের মুখ্য চরিত্রে পরিণত হন। ভক্তিমূলক ভাব, কোমল গতি ও আধ্যাত্মিক আবহ এই নৃত্যের মূল বৈশিষ্ট্য।
লাই হারাওবা উৎসব ও ঐতিহ্য:
‘হারাওবা’ নামক প্রাচীন উৎসব থেকে, যার অর্থ ‘আনন্দনৃত্য’। এই উৎসবের মাধ্যমে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নৃত্য পরিবেশন করা হতো। লাই হারাওবার দুটি ভাবধারা রয়েছে—মৈরাঙ লাই হারাওবা ও উমাং লাই হারাওবা। প্রথমটিতে শৈব ভাবধারা এবং দ্বিতীয়টিতে রাসনৃত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই উৎসবই পরবর্তীকালে মণিপুরী নৃত্যের শাস্ত্রসম্মত রূপ গঠনে সহায়ক হয়।
বৈশিষ্ট্য:
মণিপুরী নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হাত, মাথা ও পায়ের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার। শরীরের চলন অত্যন্ত কোমল ও বৃত্তাকার, যা অন্যান্য ধ্রুপদি নৃত্যের তুলনায় ভিন্ন। এতে মুখাভিনয় সংযত ও সূক্ষ্ম। এই নৃত্যে সাধারণত নারী ও পুরুষ উভয় চরিত্র অংশ নেন। বিশেষত কৃষ্ণ–রাধা ও গোপীদের কাহিনি এতে প্রধানভাবে উপস্থাপিত হয়। এটি মূলত দলগত নৃত্যশৈলী, যদিও একক পরিবেশনাও দেখা যায়।
রাসলীলা:
মণিপুরী নৃত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল রাসলীলা। রাসলীলা সাধারণত তিন প্রকারে বিভক্ত—
- তাল রাসক: হাতে তালি দিয়ে সমলয়ে নৃত্য।
- দণ্ড রাসক: দুটি লাঠি সমন্বিত ছন্দে সঞ্চালিত হয়।
- মণ্ডল রাসক: কৃষ্ণকে কেন্দ্রে রেখে গোপীরা বৃত্তাকারে নৃত্য পরিবেশন করেন।
এই রাসনৃত্যে ভক্তিরস ও শৃঙ্গাররসের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
বাদ্যযন্ত্র ও সঙ্গীত:
মণিপুরী নৃত্যে খোল, মন্দিরা ও বাঁশি প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য কিছু বাদ্যযন্ত্রও যুক্ত হয়েছে। সংগীত সাধারণত বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্তনধর্মী। তালের ব্যবহার সূক্ষ্ম ও সুষম, যা নৃত্যের কোমল ভঙ্গিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
পোশাক:
মণিপুরী নৃত্যশিল্পীরা বিশেষ ধরনের অলংকৃত পোশাক পরেন, যাতে ছোট ছোট আয়না বসানো থাকে। এই পোশাক ‘কামিল’ নামে পরিচিত। Raja Bhagyachandra-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এই পোশাকের প্রচলন হয়। নারীরা গোলাকার ফোলা স্কার্টসদৃশ পোশাক পরেন এবং পুরুষরা সাধারণত ধুতি ও পাগড়ি ব্যবহার করেন।
প্রখ্যাত শিল্পী:
কে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বহু গুণী শিল্পী। তাঁদের মধ্যে Guru Bipin Singh এবং টি. নদীয়া সিংহ প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রচেষ্টায় মণিপুরী নৃত্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

সাত্রীয়া (Sattriya):
উৎপত্তি ও ধর্মীয় পটভূমি:
Sattriya অসমের এক গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুপদি নৃত্যনাট্যধারা। এর উৎসস্থল অসমের কৃষ্ণপ্রধান বৈষ্ণব আশ্রম বা ‘সত্র’। ‘সাত্রীয়া’ শব্দটি ‘সত্র’ থেকেই উদ্ভূত। সত্রসমূহে ধর্মীয় উপাসনা ও ভক্তিমূলক শিক্ষার অংশ হিসেবে এই নৃত্য পরিবেশন করা হতো। পঞ্চদশ শতকে ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবশালী সাধক Srimanta Sankardev এই নৃত্যধারার প্রচলন করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভক্তি ও নৈতিক শিক্ষাকে নাট্য ও নৃত্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ঐতিহাসিক বিকাশ:
সাত্রীয়া মূলত সত্রের ভিক্ষুদের দ্বারা পরিবেশিত হতো এবং দীর্ঘদিন এটি মন্দির ও আশ্রমকেন্দ্রিক ছিল। পরে ধীরে ধীরে এটি সাধারণ মঞ্চে স্থান পায় এবং শাস্ত্রসম্মত ধ্রুপদি নৃত্যরূপ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সাত্রীয়ার বিকাশে শ্রীমন্ত শংকরদেবের পাশাপাশি তাঁর শিষ্য মাধবদেবেরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁদের রচিত ভক্তিমূলক সাহিত্য ও সংগীত সাত্রীয়ার মূল ভিত্তি গড়ে তোলে।
অঙ্কীয়া নাট ও নৃত্যরীতি:
সাত্রীয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ একাঙ্ক নৃত্যনাট্য হলো ‘অঙ্কীয়া নাট’। এই নাট্যরীতির মাধ্যমে ধর্মীয় কাহিনি ও নৈতিক শিক্ষা উপস্থাপন করা হয়। অঙ্কীয়া নাটে সংলাপ, গান, অভিনয় ও নৃত্যের সমন্বয় ঘটে। এর মাধ্যমে ভগবান কৃষ্ণের লীলা ও বৈষ্ণব দর্শনের বিভিন্ন দিক প্রকাশিত হয়। নান্দনিকতা ও ধর্মীয় ভাবধারার মেলবন্ধন সাত্রীয়াকে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
বৈশিষ্ট্য:
সাত্রীয়া নৃত্যে শুদ্ধ নৃত্য (নৃত্ত), ভাবপ্রকাশ (অভিনয়) ও নাট্য উপাদানের সমন্বয় দেখা যায়। হাত, পা ও শরীরের সুষম ব্যবহার এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পদচারণা দৃঢ় হলেও ভঙ্গিমা সুশৃঙ্খল ও মার্জিত। এতে ভক্তিরস প্রধান হলেও অন্যান্য রসও প্রকাশিত হয়। নৃত্যের মাধ্যমে ভক্তি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার বাণী প্রচার করা হয়।
বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত:
সাত্রীয়া নৃত্যের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো খোল, যা অসমীয় বৈষ্ণব সংগীতের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এর সঙ্গে তাল, মঞ্জিরা ও অন্যান্য স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। সংগীতধারা মূলত বৈষ্ণব পদাবলী ও কীর্তনভিত্তিক। খোলের ছন্দে নৃত্যের গতি ও তাল নির্ধারিত হয়।
পোশাক:
এই নৃত্যকলায় দুই ধরনের পোশাক ব্যবহৃত হয়। পুরুষেরা সাধারণত ধুতি, চাদর ও পাগড়ি পরিধান করেন। নারীরা ঘুরি, চাদর ও কঞ্চি (কোমর কাপড়) ব্যবহার করেন। পোশাক সাধারণত মুগা রেশমের তৈরি হয়, যা অসমের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের প্রতীক। সাজসজ্জা সরল হলেও মার্জিত, যা নৃত্যের আধ্যাত্মিক ভাবকে ফুটিয়ে তোলে।

উপসংহার:
ধ্রুপদি বা শাস্ত্রীয় নৃত্যকলা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ, যা হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। প্রাচীন শাস্ত্র, মন্দিরসংস্কৃতি ও রাজসভা—এই তিন ক্ষেত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শাস্ত্রীয় নৃত্যের বিকাশ ও প্রসার ঘটেছে। Natya Shastra-এর তত্ত্ব ও নিয়মাবলি আজও এই নৃত্যধারাগুলির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আধুনিক যুগে এই নৃত্যকলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন। প্রতিটি নৃত্যশৈলী তার নিজস্ব আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও এক বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। যেমন— Bharatanatyam-এর গম্ভীর ভঙ্গি, Kathak-এর দ্রুত পদচারণা, অথবা Odissi-এর ত্রিভঙ্গী দেহভঙ্গি—সব মিলিয়ে ভারতের নৃত্যঐতিহ্য বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ।
শাস্ত্রীয় নৃত্য শুধু শিল্পচর্চা নয়, এটি শৃঙ্খলা, সাধনা ও আত্মনিবেদনের প্রতীক। দীর্ঘ অনুশীলন, গুরুশিষ্য পরম্পরা ও আধ্যাত্মিক একাগ্রতার মাধ্যমে একজন শিল্পী এই কলায় সিদ্ধহস্ত হন। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রভাবে সমাজে পরিবর্তন এলেও শাস্ত্রীয় নৃত্যের ঐতিহ্য এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জনপ্রিয়।
অতএব, ধ্রুপদি বা শাস্ত্রীয় নৃত্যকলা কেবল অতীতের স্মারক নয়, এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক।