ভূমিকা:
ভারতের অর্থ কমিশন বা Finance Commission of India একটি সংবিধানিক সংস্থা যা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগি এবং আর্থিক সম্পর্ক সমন্বয় করার জন্য প্রতিষ্ঠিত। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী (ধারা ২৯৯ ও ২৮০), অর্থ কমিশন প্রতি পাঁচ বছরে গঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে কর রাজস্ব, ভর্তুকি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পদের ন্যায্য বিতরণ নির্ধারণ করা।
অর্থ কমিশন রাজস্ব বিভাজন, ভর্তুকি প্রণয়ন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সমতা নিশ্চিত করে। এটি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, রাজ্যগুলোর আর্থিক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সুসংহত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কমিটির কাজ হলো রাজ্যগুলোর আয়-ব্যয় পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ন্যায্য হারে কেন্দ্র থেকে রাজ্যগুলোর জন্য তহবিল বরাদ্দ করা। এছাড়া, দুর্যোগ, বিশেষ প্রকল্প বা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের সুপারিশও কমিশন করে।
অর্থ কমিশনের গঠন:
- একজন সভাপতি ও চারজন সদস্য নিয়ে এই কমিশন গঠিত হয়।
- রাষ্ট্রপতি এদের নিযুক্ত করেন।
- কমিশনের সদস্যদের যোগ্যতা ও নিয়োগ সম্পর্কিত পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে 280(2) ধারা।
অর্থ কমিশনের সদস্যদের যোগ্যতা:
- হাইকোর্টের বিচারপতি বা বিচারপতি পদের যোগ্যতা।
- অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারি বিষয় ও হিসাব-নিকাশের জ্ঞান।
- প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
- অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ।
রাজামান্নার কমিটি (Rajamannar Committee)-ও সুপারিশ করেছিল যে পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্যকে অর্থ কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা দরকার।
অর্থ কমিশনের কার্যাবলী:
সংবিধানের 280(3) ধারায় অর্থ কমিশনের কার্যাবলী সম্পর্কে উল্লেখ আছে। কমিশনকে নিম্নলিখিত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পেশ করতে হয়-
- কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বণ্টিত হয় বা বণ্টনযোগ্য রাজস্ব কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যগুলির প্রাপ্য অংশ।
- ভারতের সঞ্চিত তহবিল থেকে রাজ্যগুলিকে অনুদান প্রদানের নীতি।
- অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করতে রাষ্ট্রপতি যে সকল বিষয়ে কমিশনের কাছে পেশ করবেন।
অর্থ কমিশন সংবিধান অনুসারে মূলত দুটো দায়িত্ব সম্পাদন করে-
- কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বণ্টিত হয় বা বণ্টনযোগ্য কেন্দ্র-রাজ্যগুলির অংশ বা ভাগ নির্ধারণ করা। অঙ্গরাজ্যগুলির অংশ এবং রাজ্যগুলির মধ্যে তার ভাগ বাঁটোয়ারার ব্যাপারে অর্থ কমিশন যে সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণভাবে তা গ্রহণ করে।
- অঙ্গরাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় অনুদানের নীতি নির্ধারণ।
- অর্থ কমিশন রাষ্ট্রপতির কাছে তার সুপারিশ পেশ করে। রাষ্ট্রপতি এইসমস্ত সুপারিশ তার নিজের ব্যাখ্যাসহ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পার্লামেন্টের কাছে পেশ করেন 281 ধারা।
- বস্তুত সুপারিশ করার মধ্যেই কমিশনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। এই সমস্ত সুপারিশ কার্যকরী করতে বাধ্য করা যায় না।
- প্রথম অর্থ কমিশন (গঠন ১৯৫১) সভাপতি কে.সি. নিয়োগী। কার্যকাল (১৯৫২-১৯৫৭)।
- ষোড়শ অর্থ কমিশনের সভাপতি অরবিন্দ পানাগড়িয়া। কার্যকাল (১ এপ্রিল ২০২১-৩১ মার্চ ২০২৬)।
উপসংহার:
ভারতের অর্থ কমিশন দেশের আর্থিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের সুসংহতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সমতা রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সংবিধানিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা বজায় রেখে রাজ্যগুলোর আর্থিক চাহিদা ও সক্ষমতা বিচার করে ন্যায্য তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করে। কমিশনের সুপারিশের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার অর্থনৈতিক নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়।
অর্থ কমিশন শুধু রাজস্ব বিতরণের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সমতা এবং বাজেট কার্যকর করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার। এটি দেশের অর্থনীতিকে সুসংহত রাখে, নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং রাজ্যগুলোর বিকাশ ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করে। সংবিধান অনুযায়ী অর্থ কমিশনের নিয়মিত পুনঃগঠন ও সুপারিশ দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, যা ভারতের আর্থিক শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়সংগত উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।