ভূমিকা:
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলতে সাধারণত পণ্য ও পরিষেবার মূল্যস্তরের ধারাবাহিক ও সামগ্রিক বৃদ্ধিকে বোঝায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে এবং সেই বৃদ্ধির ফলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে তাকে মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি এক বছর আগে ১০০ টাকায় যে পরিমাণ দ্রব্য কেনা যেত, পরবর্তীতে সেই একই দ্রব্য কিনতে ১২০ টাকা লাগে, তবে বোঝা যায় মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে।
মুদ্রাস্ফীতির ধারণা আধুনিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Irving Fisher মুদ্রাস্ফীতিকে মুদ্রার পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। আবার John Maynard Keynes তাঁর তত্ত্বে চাহিদা বৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ভারতের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক। তারা সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, নগদ সংরক্ষণ অনুপাত পরিবর্তন এবং উন্মুক্ত বাজার ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
অতএব, মুদ্রাস্ফীতি কেবল দাম বৃদ্ধির ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মুদ্রাস্ফীতি বলতে কী বোঝায়?
মুদ্রাস্ফীতির সংজ্ঞা:
আক্ষরিক অর্থে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলতে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধিকে বোঝায়। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অধিকাংশ দ্রব্য ও পরিষেবার মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়, ফলে টাকার মূল্য কমে যায়।
মুদ্রাস্ফীতির ধরন (Types of Inflation):
চাহিদা জনিত মুদ্রাস্ফীতি (Demand Pull Inflation)
যখন অর্থনীতিতে পূর্ণ কর্মসংস্থান বিরাজমান অবস্থায় চাহিদা জোগানের চেয়ে বেশি হয়, তখন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।
যদি এই দাম ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে, তবে একে চাহিদা জনিত মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়।
ব্যয় বৃদ্ধি জনিত মুদ্রাস্ফীতি (Cost Push Inflation)
যখন উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় কিন্তু চাহিদা অপরিবর্তিত থাকে, তখন যে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয় তাকে ব্যয় বৃদ্ধি জনিত মুদ্রাস্ফীতি বলে।
উদাহরণ — শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি।
মৃদু মুদ্রাস্ফীতি (Mild Inflation)
যখন দামস্তরের বৃদ্ধি ধীর গতিতে ঘটে, যেমন ৪–৫% হারে, তখন একে মৃদু মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়।
অতিমুদ্রাস্ফীতি (Hyper Inflation)
যখন দাম অতি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায় এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়, তখন তাকে অতিমুদ্রাস্ফীতি বলা হয়। সাধারণত যুদ্ধকালীন অবস্থায় এটি দেখা যায়।
স্ট্যাগফ্লেশন (Stagflation)
একটি জটিল অবস্থা, যখন মুদ্রাস্ফীতি বেশি কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কম এবং বেকারত্ব বেশি থাকে।
মুক্ত মুদ্রাস্ফীতি (Open Inflation)
যখন সরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না, তখন একে মুক্ত মুদ্রাস্ফীতি বলা হয়।
ডিফ্লেশন (Deflation)
এটি মুদ্রাস্ফীতির বিপরীত অবস্থা। এক্ষেত্রে দ্রব্য ও পরিষেবার মূল্য ক্রমাগত হ্রাস পায়।
রিইনফ্লেশন (Reinflation)
যখন ডিফ্লেশনের পর অর্থনীতিতে পুনরায় মুদ্রাস্ফীতি শুরু হয়, তাকে রিইনফ্লেশন বলা হয়।
মুদ্রাস্ফীতির পরিমাপ (Measurement of Inflation):
পাইকারি দাম সূচক (Wholesale Price Index – WPI)
WPI দ্বারা পাইকারি বাজারে দ্রব্যের দাম পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়। এটি মিনিস্ট্রি অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
ভোক্তা দাম সূচক (Consumer Price Index – CPI)
CPI দ্বারা ভোক্তারা যে দ্রব্য ক্রয় করেন, তার খুচরা দামের পরিবর্তন নির্ধারিত হয়।
এর তিনটি রূপ রয়েছে—
- CPI (Industrial Workers)
- CPI (Agricultural Labourers)
- CPI (Rural/Urban/Mixed)
প্রথম দুটি Labour Bureau এবং তৃতীয়টি Central Statistics Office (CSO) প্রকাশ করে।
জিডিপি ডিফ্লেটর (GDP Deflator)
এর সূত্র —
Nominal GDP × 100 / Real GDP
মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব (Effects of Inflation)
ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা
মুদ্রাস্ফীতির ফলে ঋণগ্রহীতা লাভবান হয় এবং ঋণদাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ টাকার প্রকৃত মূল্য কমে যায়।
বেতনভোগী ব্যক্তি
টাকার মূল্য হ্রাস পেলেও বেতন সাধারণত সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায় না, ফলে এরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
শ্রমিক
শ্রমিকরা তখনই লাভবান হন যখন তাদের মজুরি বৃদ্ধি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষতির সম্মুখীন হন।
স্থায়ী আয় বিশিষ্ট ব্যক্তি
পেনশন, ভাতা, সুদ, বাড়িভাড়া প্রভৃতি নির্দিষ্ট আয়ের ব্যক্তিরা টাকার মূল্যহ্রাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বিনিয়োগকারী
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও বন্ড ও ডিবেঞ্চারধারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ব্যবসায়ী
দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা সাধারণত লাভবান হন, কারণ স্টকের দাম বাড়ে।
কৃষিজীবী
জমিদার ক্ষতিগ্রস্ত, স্বত্বাধিকারী কৃষক লাভবান, আর জমিহীন কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
সরকার
সরকার সাধারণত লাভবান হয় কারণ ঋণগ্রহীতা হিসেবে মুদ্রার মূল্যহ্রাসে তার দায় কমে যায়।
মুদ্রাস্ফীতির অর্থনৈতিক প্রভাব
উৎপাদনের উপর প্রভাব
মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, তবে পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে ব্যাহত করে।
কর্মসংস্থানের উপর প্রভাব
ফিলিপস কার্ভ (Phillips Curve) অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের মধ্যে বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে — মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে বেকারত্ব কমে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উপর প্রভাব
মূল্যবৃদ্ধির ফলে সঞ্চয় কমে যায়, বিনিয়োগের ইচ্ছাও হ্রাস পায়।
ব্ল্যাকমার্কেট ও দুর্নীতি
মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম ঘাটতির ফলে কালোবাজার ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটে।
বৈদেশিক বাণিজ্য
দেশে দ্রব্যের দাম বেড়ে গেলে রপ্তানি হ্রাস ও আমদানি বৃদ্ধি পায়, ফলে ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উপায় (Control of Inflation)
মুদ্রানীতি (Monetary Measures)
কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুদের হার বৃদ্ধি, ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ও অর্থ সরবরাহ সীমিত করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে।
রাজস্ব নীতি (Fiscal Measures)
সরকার ব্যক্তিগত ও সরকারি ব্যয় হ্রাস করে এবং কর বৃদ্ধি করে অর্থ সরবরাহ কমায়।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ (Price Control)
দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। এটি অল্পমেয়াদি ব্যবস্থা — একে বলা হয় Suppressed Inflation।
ইনফ্লেশন টার্গেটিং (Inflation Targeting)
২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি RBI ও ভারত সরকার Monetary Policy Framework Agreement স্বাক্ষর করে।
এর মূল উদ্দেশ্য— মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
২০১৪ সাল থেকে RBI CPI কে মুদ্রাস্ফীতির প্রধান নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করছে।
Phillips Curve তত্ত্ব:
- ১৯৫৮ সালে উইলিয়াম ফিলিপস প্রকাশ করেন যে বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি পরস্পর বিপরীতভাবে সম্পর্কিত।
- মুদ্রাস্ফীতি যত বেশি, বেকারত্ব তত কম।
- তবে এই তত্ত্বটি কেবল স্বল্পমেয়াদি পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
উপসংহার:
মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। খুব বেশি মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। আবার অত্যন্ত কম বা ঋণাত্মক মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হতে পারে।
একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল মুদ্রাস্ফীতি। এই ক্ষেত্রে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক-এর মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্থিতি বজায় রাখা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি অপরিহার্য উপাদান হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতন নীতির মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।