ভারত একটি বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকা ও বহুজাতি, বহুভাষিক, বহুধর্মীয় দেশ। এই বহুবিধ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রক্ষার জন্য একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা অপরিহার্য। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া ভারতীয় সংবিধান একটি সংঘীয় শাসনব্যবস্থা (Federal System) প্রতিষ্ঠা করলেও এর প্রকৃত রূপ প্রচলিত যুক্তরাষ্ট্রগুলির মতো নয়। সংবিধান প্রণেতারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা সাধারণ অবস্থায় ফেডারেল, কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে একক (Unitary) রূপ ধারণ করতে পারে। এজন্য সংবিধানবিদ কে.সি. হুইয়ার একে বলেছেন— “Quasi-federal with a strong unitary bias”।
দ্বিস্তরীয় সরকার ব্যবস্থা:
ভারতে দুটি শাসনস্তর বিদ্যমান—
- কেন্দ্রীয় সরকার: সমগ্র দেশের জন্য আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ করে।
- রাজ্য সরকার: নিজ নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনা করে।
সংবিধানের সপ্তম তফসিলে বিষয়ভিত্তিক ক্ষমতার বিভাজন করা হয়েছে—
- কেন্দ্রীয় তালিকা (Union List) – প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, মুদ্রা ইত্যাদি বিষয়ে কেন্দ্রের একক ক্ষমতা।
- রাজ্য তালিকা (State List) – পুলিশ, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে রাজ্যের একক ক্ষমতা।
- সমবায় তালিকা (Concurrent List) – শিক্ষা, ফৌজদারি আইন ইত্যাদি বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের ক্ষমতা; সংঘর্ষে কেন্দ্রের আইন প্রাধান্য পায়।
লিখিত ও আংশিক কঠোর সংবিধান:
ভারতের সংবিধান বিশ্বের দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান। কিছু অংশ সহজে পরিবর্তনযোগ্য হলেও ফেডারেল কাঠামো সম্পর্কিত ধারাগুলি (যেমন—ক্ষমতার বিভাজন) পরিবর্তন কঠিন, যা ফেডারেল প্রকৃতির লক্ষণ।
একক নাগরিকত্ব ও একক সংবিধান:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বৈত নাগরিকত্ব নয়, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে সবার জন্য একক নাগরিকত্ব। অধিকাংশ রাজ্যের জন্য একই সংবিধান প্রযোজ্য (জম্মু ও কাশ্মীর পূর্বে ব্যতিক্রম ছিল, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্ত হওয়ার আগে)।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা:
সুপ্রিম কোর্ট সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃপক্ষ, যা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে অথবা রাজ্যগুলির পারস্পরিক বিরোধের নিষ্পত্তি করে। এটি ফেডারেল কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।
কেন্দ্রাভিমুখী প্রবণতা:
- ভারতীয় ফেডারেল ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি।
- অবশিষ্ট ক্ষমতা কেন্দ্রে ন্যস্ত।
- জরুরি অবস্থায় (অনুচ্ছেদ ৩৫২, ৩৫৬, ৩৬০) কেন্দ্র রাজ্যের আইন ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
- রাজ্যপাল নিয়োগ কেন্দ্রের হাতে এবং প্রয়োজনে কেন্দ্র রাজ্য প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত স্বরূপ:
- সাধারণ অবস্থায় ফেডারেল কাঠামো—ক্ষমতার বিভাজন, দ্বিস্তরীয় সরকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা।
- বিশেষ অবস্থায় একক শাসনব্যবস্থা—জরুরি পরিস্থিতি বা সাংবিধানিক সংকটে কেন্দ্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব।
- এই মিশ্র রূপই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রকে অনন্য করেছে।
উপসংহার:
ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতি একদিকে ফেডারেল, অন্যদিকে কেন্দ্রাভিমুখী। এর ফলে একদিকে রাজ্যগুলির স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা বজায় থাকে। বহুজাতি ও বহুভাষিক রাষ্ট্রে এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে। সুতরাং, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র এক অনন্য রাজনৈতিক কাঠামো যা ফেডারেল ও একক উভয় বৈশিষ্ট্যের সফল সমন্বয়।