সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার: ৩২ ও ২২৬ নং ধারা: (Right to Constitutional Remedies).

সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার

সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার: ৩২ ও ২২৬ নং ধারা: (Right to Constitutional Remedies).

ভূমিকা:

ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার প্রদান করেই দায়িত্ব শেষ করেনি; বরং সেই অধিকারগুলি কার্যকর ও সুরক্ষিত রাখার জন্য বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত মৌলিক অধিকারগুলি যদি লঙ্ঘিত হয়, তবে নাগরিক যেন প্রতিকার পেতে পারে—এই উদ্দেশ্যেই সংবিধানে সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ড. বি. আর. আম্বেদকর এই অধিকারকে সংবিধানের হৃদয় ও আত্মা (Heart and Soul of the Constitution) বলে অভিহিত করেছেন।

ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে ৩২ নং ধারা এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে ২২৬ নং ধারা-এর মাধ্যমে এই অধিকার লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই দুই ধারার মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য লেখ, নির্দেশ ও আদেশ জারি করতে পারে।

সংবিধানের ৩২ নং ধারা ও তার গুরুত্ব:

সংবিধানের ৩২ নং ধারা অনুযায়ী—

মৌলিক অধিকারগুলি বলবৎ ও কার্যকর করার জন্য নাগরিকরা সরাসরি সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারে।

এই ধারার মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টকে মৌলিক অধিকার রক্ষার সর্বোচ্চ অভিভাবকের ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। কোনো নাগরিক যদি মনে করেন যে তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তবে তিনি সরাসরি সুপ্রিমকোর্টে আবেদন জানাতে পারেন। এই অধিকার নিজেই একটি মৌলিক অধিকার।

সংবিধানের ২২৬ নং ধারা:

সংবিধানের ২২৬(১) নং ধারা অনুযায়ী—

রাজ্যস্তরে হাইকোর্টগুলিও মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার কার্যকর করার জন্য লেখ, নির্দেশ বা আদেশ জারি করতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষণীয়—

  • ৩২ নং ধারা কেবল মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ
  • ২২৬ নং ধারা মৌলিক অধিকার ছাড়াও অন্যান্য আইনগত অধিকার রক্ষায় প্রযোজ্য

এই কারণে হাইকোর্টের ক্ষমতার ক্ষেত্র সুপ্রিমকোর্টের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত।

লেখ, নির্দেশ ও আদেশের ধারণা:

সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্ট মোট পাঁচ প্রকার লেখ, নির্দেশ বা আদেশ জারি করতে পারে। এগুলি ইংরেজ আইন ব্যবস্থা থেকে গৃহীত হলেও ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এগুলিকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

বন্দী প্রত্যক্ষীকরণ (Habeas Corpus):

‘হেবিয়াস করপাস’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল— “স্বশরীরে হাজির করা”

যদি কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক করে রাখা হয়, তবে সেই ব্যক্তি বা তার পক্ষ থেকে কেউ আদালতের কাছে আবেদন করতে পারে। আদালত আটককারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় বন্দিকে সশরীরে আদালতে হাজির করতে।

আদালত যদি মনে করে—

  • আটক অবৈধ, তবে সে সঙ্গে সঙ্গে বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

এই লেখ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

পরমাদেশ (Mandamus):

পরমাদেশ শব্দের অর্থ— “আমরা আদেশ করছি”

এই লেখ জারি করে সুপ্রিমকোর্ট বা হাইকোর্ট—

  • কোনো অধস্তন আদালত।
  • সরকারি কর্মকর্তা।
  • সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে।

আইনসম্মত ও জনস্বার্থমূলক কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে পারে।

তবে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের বিরুদ্ধে পরমাদেশ জারি করা যায় না।

প্রতিষেধ (Prohibition):

প্রতিষেধ শব্দের অর্থ— “নিষেধ করা”

এই লেখের মাধ্যমে—

  • কোনো অধস্তন আদালত যদি তার এক্তিয়ার বহির্ভূত বিষয়ে বিচার কার্য চালায়,
    তবে সুপ্রিমকোর্ট বা হাইকোর্ট তাকে সেই বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে নিষেধ করতে পারে।

এটি মূলত ভবিষ্যৎ ভুল রোধের জন্য জারি করা হয়।

অধিকার পৃচ্ছা (Quo Warranto):

অধিকার পৃচ্ছা কথাটির অর্থ— “কোন অধিকারে?”

এই লেখের মাধ্যমে আদালত বিচার করে দেখে—

  • কোনো ব্যক্তি যে সরকারি পদে অধিষ্ঠিত আছে,
  • সেই পদের জন্য তার দাবি আইনসম্মত কি না।

যদি আদালত দেখে যে—

  • ওই ব্যক্তি বেআইনিভাবে পদ দখল করে আছে,
    তবে তাকে পদচ্যুত করার নির্দেশ দিতে পারে।

এটি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন বজায় রাখতে সাহায্য করে।

উৎপ্রেষণ (Certiorari):

উৎপ্রেষণ শব্দের অর্থ— “বিশেষভাবে জ্ঞাত হওয়া”

এই লেখের মাধ্যমে—

  • কোনো অধস্তন আদালত বা আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা থেকে।
  • মামলা ঊর্ধ্বতন আদালতে স্থানান্তরিত করা হয়।

এটি তখনই প্রয়োগ হয়, যখন—

  • বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকে।
  • অথবা ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারের উপর বিধিনিষেধ:

ভারতীয় সংবিধানে উল্লিখিত অন্যান্য মৌলিক অধিকারের মতো শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকারও সম্পূর্ণ অবাধ নয়।

জরুরি অবস্থায় বিধিনিষেধ:

জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে রাষ্ট্রপতি—

  • সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকারের উপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করতে পারেন।
  • এর ফলে ১৯ নং ধারার স্বাধীনতার অধিকারগুলি অকার্যকর হয়ে যায়
  • তবে ২০ ও ২১ নং ধারার অধিকার (দণ্ডবিধি ও জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) স্থগিত করা যায় না।

সংসদের আইন দ্বারা সীমাবদ্ধতা:

কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। যেমন—

  • সশস্ত্র বাহিনী ও জনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কতখানি মৌলিক অধিকার ভোগ করবেন, তা সংসদ নির্ধারণ করতে পারে।
  • ভারতের কোনো অঞ্চলে সামরিক শাসন জারি থাকলে, শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে কোনো সরকারি কর্মচারীর অবৈধ কাজকে সংসদ আইনের মাধ্যমে বৈধ ঘোষণা করতে পারে।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, সাংবিধানিক প্রতিবিধানের অধিকার ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অপরিহার্য স্তম্ভ। ধারা ৩২ ও ২২৬-এর মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বাস্তবে কার্যকর হয়। যদিও এই অধিকারের উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে বিচার করলে এটি নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক হাতিয়ার। আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের সুরক্ষায় এই অধিকার আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

Protijogita.in শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে এম.এ করেছি এবং শিক্ষকতা করি। এই ওয়েবসাইটে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রশ্নোত্তর, মক টেস্ট, এবং দরকারি অধ্যয়ন সামগ্রী প্রদান করা হয়।

Post Comment

error: Content is protected !!