ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার: (Right to Freedom of Religion).
ভূমিকা:
ভারত একটি বহুধর্ম, বহুভাষা ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করাই ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় সংবিধান-প্রণেতারা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। যদিও মূল সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমদিকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি যুক্ত ছিল না, তবুও সংবিধানের বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে কার্যত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রস্তাবনায় ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংযোজিত হয়।
ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে ধারা ২৫ থেকে ২৮ পর্যন্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারগুলি লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই ধারাগুলি ভারতীয় রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সাংবিধানিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা:
ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বোঝায়—রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করবে না এবং সকল ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবে। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতার অনুকরণ নয়; বরং এটি ‘সমধর্মসম্মান’ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়, কিন্তু কোনো ধর্মের পক্ষপাতও করে না।
ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার: ধারা ২৫(১)
ধারা ২৫(১)-এর অর্থ ও তাৎপর্য:
ভারতীয় সংবিধানের ২৫(১) নং ধারা অনুযায়ী—
“সকল ব্যক্তি সমানভাবে বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মমত গ্রহণ, পালন ও প্রচারের অধিকার ভোগ করবে।”
এই ধারার মাধ্যমে চারটি মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে—
- বিবেকের স্বাধীনতা।
- ধর্ম গ্রহণের স্বাধীনতা।
- ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা।
- ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা।
এই অধিকার কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়; ভারতে বসবাসরত বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাষ্ট্র ব্যক্তি ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে হস্তক্ষেপ করবে না—এটাই এই ধারার মূল বক্তব্য।
ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: ধারা ২৫(২)-ক
ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্পূর্ণ অবাধ নয়। সংবিধানের ২৫(২)-ক নং ধারায় বলা হয়েছে যে—
রাষ্ট্র জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ, রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ—
- ধর্মের নামে কুসংস্কার বা মানবাধিকারের পরিপন্থী আচরণ নিষিদ্ধ করা।
- ধর্মীয় আচার যদি সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত করে, তবে রাষ্ট্র তার উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার: ধারা ২৫(২)-খ
ধারা ২৫(২)-খ নং ধারায় সামাজিক সংস্কারমূলক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী—
রাষ্ট্র সামাজিক কল্যাণ ও সংস্কারের উদ্দেশ্যে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে সকল শ্রেণির হিন্দুদের প্রবেশাধিকারের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে।
এখানে ‘হিন্দু’ শব্দের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুযায়ী—
- শিখ।
- বৌদ্ধ।
- জৈন।
এই তিন ধর্মকেও হিন্দু ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অস্পৃশ্যতা ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠানের অধিকার: ধারা ২৬
ভারতীয় সংবিধানের ২৬ নং ধারা ধর্মীয় সম্প্রদায় ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে কিছু স্বতন্ত্র অধিকার প্রদান করেছে। এগুলি হল—
- ধর্ম বা দানের উদ্দেশ্যে সংস্থা স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার।
- নিজ নিজ ধর্মীয় বিষয় নিজেরাই পরিচালনা করার অধিকার।
- স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার।
- নির্দিষ্ট আইন অনুসারে সেই সম্পত্তি পরিচালনার অধিকার।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
👉 কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তিকে বহিষ্কার বা একঘরে করতে পারবে না।
এছাড়াও এই অধিকারগুলিও সম্পূর্ণ অবাধ নয়। জননিরাপত্তা, জনস্বার্থ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা ও অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্র এই অধিকারগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
ধর্মীয় কর আরোপ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা: ধারা ২৭
ধারা ২৭ অনুযায়ী—
কোনো নাগরিককে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উন্নতি, প্রচার বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর প্রদানে বাধ্য করা যাবে না।
এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো—
- ধর্মীয় করের মাধ্যমে নাগরিকদের উপর জোরজবরদস্তি রোধ করা।
- রাষ্ট্রকে ধর্মীয় নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখা।
ফলে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো ধর্মের প্রভাবমুক্ত থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ম ও শিক্ষা: ধারা ২৮
ধারা ২৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মশিক্ষা সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধি আরোপ করেছে—
- সম্পূর্ণ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো ধর্মশিক্ষা দেওয়া যাবে না।
- সরকার স্বীকৃত বা সরকারি অনুদানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ধর্মশিক্ষা দেওয়া গেলেও—
- শিক্ষার্থীকে বাধ্য করা যাবে না
- প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর সম্মতি বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে অভিভাবকের সম্মতি আবশ্যক
- সম্পূর্ণ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মশিক্ষা নিষিদ্ধ নয়
- কোনো দাতা বা অছি কর্তৃক ধর্মশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও সেখানে ধর্মশিক্ষা দেওয়া যেতে পারে
এই ধারার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষতার বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
যদিও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে, বাস্তব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যেমন—
- মুম্বাই দাঙ্গা।
- গোধরা কাণ্ড।
- গুজরাট হত্যাকাণ্ড।
- বাবরি মসজিদ ধ্বংস।
এই ঘটনাগুলি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিককালে উগ্র মৌলবাদী চিন্তাধারার উত্থানও উদ্বেগের কারণ।
ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিবাচক দিক:
তবে সবকিছু সত্ত্বেও বলা যায়—ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েনি। তার অন্যতম প্রমাণ—
- ড. জাকির হোসেন।
- ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ।
- ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম।
- জ্ঞানী জৈল সিং।
- দ্রৌপদী মুর্মু।
এঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েও ভারতের রাষ্ট্রপতি পদ অলংকৃত করেছেন। এটি ভারতীয় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় সহাবস্থান এখনো বহুলাংশে বজায় রয়েছে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় সংবিধানের ধারা ২৫ থেকে ২৮ ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার প্রদান করে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করেছে। যদিও বাস্তবে কিছু বিচ্যুতি ও সংকট দেখা যায়, তবুও সাংবিধানিক কাঠামো ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আজও বহুলাংশে অটুট রয়েছে। এই চরিত্র রক্ষা করা কেবল রাষ্ট্রের নয়, প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।



Post Comment