ভূমিকা:
ভারত একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ সংস্থা হলো পার্লামেন্ট। ভারতের পার্লামেন্ট দেশের আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। ভারতের সংবিধানের ৭৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পার্লামেন্ট তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত—রাষ্ট্রপতি, লোকসভা এবং রাজ্যসভা। অর্থাৎ, পার্লামেন্টের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেন President of India, যদিও তিনি কোনও কক্ষের সদস্য নন।
লোকসভা হলো জনগণের প্রতিনিধি সভা, যার সদস্যরা সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। অন্যদিকে রাজ্যসভা হলো রাজ্যগুলির প্রতিনিধি সভা, যার সদস্যরা মূলত রাজ্য বিধানসভা দ্বারা নির্বাচিত হন। লোকসভার মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে তা আগেই ভেঙে দেওয়া যেতে পারে। রাজ্যসভা একটি স্থায়ী কক্ষ, যেখানে প্রতি দুই বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অবসর গ্রহণ করেন।
পার্লামেন্টের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা। এছাড়া এটি দেশের বাজেট অনুমোদন, সংবিধান সংশোধন এবং সরকারের কার্যকলাপ তদারকি করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পার্লামেন্ট জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন।
অতএব, পার্লামেন্টের গঠন ও কার্যাবলী বোঝা মানে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বোঝা।
রাজ্যসভার গঠন:
রাজ্যসভা হল ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ। সংবিধানে বলা হয়েছে যে সর্বাধিক ২৫০ জন সদস্য নিয়ে রাজ্যসভা গঠিত হবে। এর মধ্যে ১২ জন সদস্য সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজসেবা, চারুকলা প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হবে। আর অবশিষ্ট ২৩৮ জন সদস্য বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গুলি থেকে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হবে। বর্তমানে রাজ্যসভার মোট সদস্য সংখ্যা ২৪৫ জন। পদাধিকারী বলে উপরাষ্ট্রপতি রাজ্য সভায় সভাপতিত্ব করেন। সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ হল ৬ বছর। প্রতি ২ বছর অন্তর এক-তৃতীয়াংশ সদস্যদের অবসর গ্রহণ করতে হয়।
লোকসভার গঠন:
ভারতীয পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নাম হলো লোকসভা। সংবিধানে বলা হয়েছে যে সর্বাধিক ৫৫২ জন সদস্য নিয়ে লোকসভা গঠিত হবে। বর্তমানে লোকসভার সদস্য সংখ্যা ৫৪৫ জন। এর মধ্যে ২ জন ইঙ্গ ভারতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত করতে পারবে (তবে ১০৪তম সংশোধনী, ২০২০ অনুযায়ী এই ধারা বাতিল করা হয়েছে)। অবশিষ্টরা অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গুলির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ। অঙ্গরাজ্য সমূহের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা ৫৩০ জন এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সমূহের প্রতিনিধির সংখ্যা ২০ জন।
লোকসভার সদস্যরা লোকসভার প্রথম অধিবেশনে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে অধ্যক্ষ বা স্পিকার পদে নির্বাচিত করেন। এই স্পিকার লোকসভা পরিচালনা করেন। এছাড়াও একজন উপাধ্যক্ষ বা সহকারী স্পিকার থাকেন। তিনি স্পিকারের অবর্তমানে যাবতীয় কার্যসম্পাদন করেন। লোকসভার সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ হল ৫ বছর জরুরি অবস্থার সময় প্রয়োজন মনে করলে লোকসভার কার্যকালের মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি করা যায়। তবে এইসব মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই রাষ্ট্রপতি লোকসভায় ভেঙে দিতে পারেন।
ভারতের পার্লামেন্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী:
ভারতীয় পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যাবলী হল—
আইন প্রণয়নের ক্ষমতা:
সংবিধানে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে তিনটি তালিকা বিদ্যমান। যথা কেন্দ্রীয় তালিকা, রাজ্য তালিকা ও যুগ্ম তালিকা। তন্মধ্যে কেন্দ্ৰীয় তালিকাভুক্ত ১০০টি বিষয়ে পার্লামেন্ট এককভাবে আইন প্রণয়ন করতে পারে। আর যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত ৫২টি বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই আইন প্রণয়ন করতে পারে। তবে যুগ্মতালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো বিষয়ে রাজ্য আইন ও কেন্দ্রীয় আত্ম ইনের বিরোধ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় আইনসভা প্রনীত আইনই গ্রাহ্য হবে। তাছাড়া অবশিষ্ট বিষয়ে আইন প্রণয়নের অধিকারও পার্লামেন্টের রয়েছে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি থাকলে বা রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হলে রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়েও পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সন্ধি, চুক্তি ইত্যাদির শর্তাদি সাপেক্ষে, দুই বা ততোধিক রাজ্যের অনুরোধক্রমে পার্লামেন্ট রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে।
মন্ত্রীসভা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা:
প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ পার্লামেন্টের যে কোনো কক্ষের সদস্যদিগের মধ্য থেকে নিযুক্ত হতে পারেন। তবে মন্ত্রীসভার সদস্যদের অবশ্যই পার্লামেন্টের সদস্য হতে হয়। পার্লামেন্টের সদস্য নয় এমন ব্যক্তি মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁকে ছয় মাসের মধ্যে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। মন্ত্রীসভার ওপর পার্লামেন্টের সব চাইতে বড় নিয়ন্ত্রণ হল মন্ত্রীসভাকে সর্বদা নিম্নকক্ষ লোকসভার আস্থাভাজন থাকতে হয়। লোকসভার আস্থা হারালে সরকারের পতন হয়। অর্থবিল ছাড়া অন্যান্য সব বিল পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস না হলে আইনে পরিণত হয় না। তাই লোকসভায় গরিষ্ঠতা থাকলেও অনেক সময় রাজ্যসভায় সরকারের গরিষ্ঠতা না থাকলে আইন পাসের ক্ষেত্রে সরকারকে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এইভাবে মন্ত্রীসভা গঠন, নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট মন্ত্রীসভাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ:
পার্লামেন্টে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা, প্রস্তাব উত্থাপন, বিতর্ক, কোনো বিলের ওপর আলোচনা, নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ, অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন প্রভৃতির মাধ্যমে বিরোধী দল শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট ইত্যাদি পার্লামেন্টে আলোচনা, সমালোচনার মাধ্যমেও শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা:
অর্থবিল শুধুমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপন করা যায়। কোনো বিল অর্থবিল কিনা সে বিষয়ে লোকসভার স্পিকারের মতামতই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। অর্থবিলের ব্যাপারে রাজ্যসভার কোনো ভূমিকা নেই। প্রথা মাফিক অর্থবিল রাজ্যসভায় প্রেরিত হয় এবং ১৪ দিনের মধ্যে ফেরৎ না হলে উভয় কক্ষে তা গৃহীত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। নতুন কর ধার্য, পুরানো করের পুনর্বিন্যাস, কোনো করের বিলোপসাধন প্রভৃতি ব্যাপারে লোকসভা তথা পার্লামেন্টের অনুমোদন একান্ত আবশ্যিক। লোকসভার অনুমোদন ব্যতীত সরকার কোনরূপ অর্থব্যয় করতে পারে না।
নির্বাচন ও পদচ্যুত করার ক্ষমতা:
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের নির্বাচিত সদস্যরা ভোটদানের অধিকারী। উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচন শুধুমাত্র পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের সদস্যদের দ্বারাই অনুষ্ঠিত হয়। উপরাষ্ট্রপতির পদচ্যুতিও পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রপতিকে পদচ্যুত করার জন্য ‘মহাবিচার পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে পার্লামেন্ট। এছাড়া সুপ্রিমকোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিগণ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, CAG প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীগণকে পদচ্যুত করার প্রস্তাব পার্লামেন্টেই গৃহীত হয়।
বিচার বিষয়ক ক্ষমতা:
আইনসভার অবমাননা অথবা অধিকারভঙ্গের অভিযোগে পার্লামেন্ট সদস্য বা সদস্য নয় এমন যে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারে। কোনো নিম্ন আদালতকে হাইকোর্টে উন্নীত করা, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হাইকোর্ট স্থাপন করা বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের হাইকোর্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি কাজ ও পার্লামেন্টের এক্তিয়ারের অধীন।
সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা:
নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয় ছাড়া পার্লামেন্ট অবশিষ্ট সমস্ত বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করতে পারে। নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে রাজ্য বিধানসভাগুলিরও অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
জরুরী অবস্থার ঘোষণা:
তিন ধরনের জরুরি অবস্থা যথা জাতীয় জরুরি অবস্থা, রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থাজনিত জরুরি অবস্থা এবং আর্থিক জরুরি অবস্থার মধ্যে যে কোনো ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে তা পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে অনুমোদিত হতে হয়।
জনমত গঠন:
পার্লামেন্টে কোনো বিলের ওপর আলাপ আলোচনা, বিতর্ক প্রভৃতির মাধ্যমে জনগণ সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। বিভিন্ন মন্ত্রী ও সদস্যদের প্রশ্নোত্তর-এর মাধ্যমে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়।
অন্যান্য ক্ষমতা:
নতুন রাজ্যগঠন বা পুনর্গঠন, রাজ্য আইনসভার দ্বিতীয় কক্ষ গঠন বা বিলোপসাধন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারের অধীনে চাকুরীর শর্তাবলী নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
উপসংহার:
ভারতের পার্লামেন্ট দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা হিসেবে ব্যাপক ক্ষমতা ও দায়িত্ব বহন করে। আইন প্রণয়ন ছাড়াও এটি সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে প্রশ্নোত্তর পর্ব, আলোচনা, অনাস্থা প্রস্তাব ও বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে। বিশেষ করে লোকসভা সরকারের প্রতি প্রত্যক্ষভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
পার্লামেন্টের আর্থিক ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বার্ষিক বাজেট পাস করা, কর আরোপ এবং সরকারি ব্যয়ের অনুমোদন পার্লামেন্টের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। অর্থ বিল কেবল লোকসভায় উত্থাপিত হতে পারে, যা নিম্নকক্ষের বিশেষ গুরুত্ব নির্দেশ করে।
এছাড়া সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতাও পার্লামেন্টের হাতে ন্যস্ত। প্রয়োজন অনুসারে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা সংশোধন করে দেশের পরিবর্তিত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হয়। রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ও অপসারণ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন প্রক্রিয়া—এসব ক্ষেত্রেও পার্লামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের পার্লামেন্ট গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। এর গঠন জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এবং এর ক্ষমতা ও কার্যাবলী দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে সহায়তা করে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পার্লামেন্টই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে।