ভূমিকা:
ভারতের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজ্যে জমির সমতা ও কৃষক অধিকার নিশ্চিত করতে ভূমি সংস্কার নীতিমালা প্রবর্তিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইন, যা মূলত ১৯৫৫ সালের West Bengal Land Reforms Act, 1955-এর মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়, ভারতের কৃষি ও সামাজিক পুনর্গঠনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। এই আইন মূলত জমির মালিকানা, বসতি ও চাষী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত। এর মূল লক্ষ্য ছিল জমির জমাট ব্যবসায়ীদের হাত থেকে চাষীদের সুরক্ষা প্রদান করা এবং জমির ন্যায্য বিতরণ নিশ্চিত করা।
পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইন নিম্নলিখিত দিকগুলিতে গুরুত্ব বহন করে: প্রথমত, চাষী শ্রমিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জমি অধিকার প্রদান; দ্বিতীয়ত, জমি আধিকারিক ও মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের অত্যাচার ও শোষণ রোধ; তৃতীয়ত, জমির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে জমি সঠিকভাবে বিতরণ। এই আইনের মাধ্যমে Operation Barga কর্মসূচি শুরু হয়, যার মাধ্যমে জমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকরা নিরাপদভাবে চাষ করতে পারেন। এর ফলে চাষী সমাজে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়।
আইনটি শুধু কৃষক সুরক্ষার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে জমির সঠিক ব্যবহার, চাষী ও ভূমিপ্রাপ্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সুসংহতি নিশ্চিত হয়।
ভূমি সংস্কার পশ্চিমবঙ্গ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৫৬-র পশ্চিমবঙ্গ ভূমি-সংস্কার আইন পাশ ও কার্যকরী হয়। ১৯৪৯-র পশ্চিমবঙ্গ অ-কৃষি জমি প্রজা আইন অনুযায়ী অ-কৃষি জমিতে প্রজাদের ও উপ-প্রজাদের সমস্ত অধিকার ও স্বার্থ, ভূমি-সংস্করণের অঙ্গ হিসাবে রাজ্যকে ন্যস্ত করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ ভূমি-সংস্করণ আইন ১৯৫৫ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ২৪.৭ একরের অধিক জমি নিজের কাছে রাখার অনুমতি নেই।
- The Bengal Tenancy Act, ১৮৮৫: কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি ঠিকা প্রদান, সফল হয়নি।
- The West Bengal Bargadar Act, ১৯৫০: বর্গাদার বা ভাগ চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় এই আইন গৃহীত হয়।
- পশ্চিমবঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলোপ সাধনের জন্য ‘পশ্চিমবঙ্গ ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৫৩’ (The West Bengal Estates Acquisition Act, ১৯৫৩) পাশ হয়। এই আইনের ফলে ১৯৫৮ সালের ১৫ এপ্রিল, লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অবসান ঘটে।
‘পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার’ আইন, ১৯৫৬
১৯৫৬ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার‘ আইন পাশ হয়। উদ্দেশ্য ছিল—
- জমির পুনর্বণ্টন।
- জমির মালিকানার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ।
- রায়তদের খাজনা হ্রাস।
অপারেশন বর্গা কি?
পশ্চিমবঙ্গে ‘অপারেশন বর্গা‘ চালু হয় ১৯৭৮ সালে। বর্গাদার বা ভাগ চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় এই আইন গৃহীত হয়। এই আইনে বলা হয় বর্গাদার যদি চাষের ব্যয়ভার পুরোটা বহন করে তাহলে ৭৫:২৫ অনুপাতে ফসল ভাগাভাগি হবে। কিন্তু চাষির দারিদ্রই এখানে বাধ সাধল। চাষের বিপুল ব্যয়ভার বহন করা ক্ষুদ্র চাষিদের দুরূহ হয়ে উঠল।
ভারতের ভূমি সংস্কারের পথে বাধা গুলি কি কি?
- রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
- প্রশাসনিক দুর্বলতা।
- দেশের গরিব জোটবদ্ধ হওয়ার ব্যর্থতা।
পশ্চিমবঙ্গে সেচযোগ্য জমির ক্ষেত্রে জোতের ঊর্ধ্বসীমা হল ৩৭ বিঘা (২৫ হেক্টর)।
পশ্চিমবঙ্গে সেচ অযোগ্য জমির ক্ষেত্রে জোতের ঊর্ধ্বসীমা হল ৫৭ বিঘা (২৫ স্ট্যান্ডার্ড হেক্টর)।
পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার আইন সংশোধন:
১৯৫৫-র পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার ২০১৪-তে সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয় যে,
বৃহৎ আবাসন প্রকল্পের উন্নয়নের অনুমতি আছে। অনুচ্ছেদ ১৪Y অনুসারে শিল্পপতিদের তিন বছরের পরিবর্তে সর্বাধিক পাঁচ বছরের জন্য ২৪ একর অব্যবহৃত বন্টিত জমি রাখার অনুমতি আছে।বিভিন্ন প্রকারের শিল্পদ্যোগ যেমন পরিবহণ বা টার্মিনাল, রসদ কেন্দ্র, আর্থিক ও রসদ কেন্দ্র, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, তেল ও গ্যাস পণ্য পরিবহন, খনন এবং এর সাথে জড়িত ক্রিয়াকলাপগুলির জন্য চিহ্নিত জমি গুলির সর্বোচ্চ সীমাতে অব্যাহতি করা হয়েছে।
উপসংহার:
পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইন রাজ্য ও দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এটি চাষী সমাজকে জমি অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান করে কৃষিজ উৎপাদন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। Operation Barga-এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত কৃষকরা তাদের জমি চাষে নিশ্চিন্ত হয়েছেন, যার ফলে গ্রামীণ সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে।
আইনের মাধ্যমে শুধু জমির পুনর্বণ্টনই নয়, সামাজিক ন্যায়, শোষণ প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই নীতির ফলে রাজ্যে চাষী সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জমি ও উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল হয়েছে। এছাড়াও, আইনটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক চেতনার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল, যেমন জমির হিসাব-নিকাশ, মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা। তবুও এর ইতিবাচক প্রভাব চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সবশেষে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার আইন কেবল কৃষক সুরক্ষার আইন নয়; এটি রাজ্য ও দেশের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোতে সমতা ও স্থায়ী উন্নয়নের প্রতীক। এটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে আধুনিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংস্কারের এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।