ভূমিকা:
ভারতের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই ভূখণ্ডের উত্তরের বরফাবৃত সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালা থেকে শুরু করে দক্ষিণে কন্যাকুমারীর সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত ভারতের ভূপ্রকৃতি গঠনের এক অপূর্ব রূপ দেখা যায়। শতকোটি বছরের ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তন, টেকটনিক পাতের সংস্থান এবং মহাদেশীয় সঞ্চারণের ফলে আজকের এই ভূখণ্ড গড়ে উঠেছে। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষে টেথিস সাগরের পলি সংকুচিত হয়ে জন্ম নেয় ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়। পরবর্তীতে হিমালয় ও দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন মালভূমি অঞ্চল থেকে নেমে আসা নদীবাহিত পলি জমে গঠিত হয় উত্তরের বিশাল উর্বর সমভূমি।
ভারতের এই বর্তমান ভৌগোলিক অবকাঠামো রাতারাতি গড়ে ওঠেনি; বরং এটি শতকোটি বছরের ভূ-তাত্ত্বিক আন্দোলন, পাত সংস্থান (Plate Tectonics) প্রক্রিয়া, গন্ডোয়ানা ভূখণ্ডের উত্তরমুখী চলন এবং কোটি কোটি বছরের ক্ষয়কার্যের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় টেকটনিক পাত ও ইউরেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষে টেথিস সাগরের পলিমাটি সংকুচিত হয়ে বিশ্বখ্যাত ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়ের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে হিমালয় ও দাক্ষিণাত্যের মালভূমি থেকে নেমে আসা নদীগুলির পলি সঞ্চয়ের ফলে গড়ে ওঠে উত্তরের বিশাল উর্বর সমভূমি।

আরো পড়ুন: ভারতের কৃষি:
ভারতের ভূপ্রকৃতি গঠনের ইতিহাস:
ভারতের বর্তমান ভারতের ভূপ্রকৃতি কোটি কোটি বছরের ভূ-তাত্ত্বিক আন্দোলন, পাত সংস্থান (Plate Tectonic) প্রক্রিয়া এবং ক্ষয়কার্যের ফল। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, আজ আমরা ভারতের যে রূপ দেখি, শতকোটি বছর আগে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
আদিম ভূখণ্ড ও গন্ডোয়ানা যুগের সূচনা (প্রাক-ক্যাম্ব্রিয়ান থেকে প্যালিওজোয়িক যুগ)
শতকোটি বছর আগে পৃথিবীর সমস্ত মহাদেশ একত্রিত হয়ে প্যানজিয়া (Pangea) নামক একটি অতি-মহাদেশ গঠন করেছিল।
- গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ: প্রায় ২০০-২৫০ মিলিয়ন বছর (২০-২৫ কোটি বছর) আগে প্যানজিয়া ভেঙে উত্তরে অ্যাঙ্গারালেণ্ড (বা ইউরেশিয়া) এবং দক্ষিণে গন্ডোয়ানাল্যান্ড (Gondwanaland) নামে দুটি বিশাল ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়।
- ভারতীয় পাতের অবস্থান: তৎকালীন সময় ভারতীয় উপদ্বীপীয় অংশটি গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অধীনে দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা, মাদাগাস্কার এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে যুক্ত ছিল।
- টেথিস সাগর: উত্তরে ইউরেশীয় পাত এবং দক্ষিণে ভারতীয় পাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করছিল একটি বিশাল অগভীর সমুদ্র, যাকে টেথিস সাগর (Tethys Sea) বলা হয়।
ভারতীয় পাতের উত্তরমুখী চলন (মেসোজোয়িক যুগ)
প্রায় ১৩০-১৪০ মিলিয়ন বছর আগে গন্ডোয়ানাল্যান্ড ভাঙতে শুরু করে এবং ভারতীয় পাতটি অ্যান্টার্কটিকা ও আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্রুত গতিতে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
- চলনের গতি: ভারতীয় টেকটনিক পাতটি প্রতি বছর প্রায় ৯ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর দিকে ভেসে চলছিল, যা ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত পাত সঞ্চালন।
- ডেকান ট্র্যাপ বা দাক্ষিণাত্যের ব্যাসাল্ট শিলার সৃষ্টি: উত্তরমুখী যাত্রাপথে (প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে) ভারতীয় পাতটি ভারত মহাসাগরের রেইউনিয়ন হটস্পট (Réunion Hotspot) নামক একটি আগ্নেয় স্থান অতিক্রম করে। এর ফলে প্রবল লাভা উদগীরণ ঘটে এবং ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে পুরু ব্যাসাল্ট শিলার আস্তরণ তৈরি হয়, যা আজ দাক্ষিণাত্যের মালভূমি (Deccan Traps) নামে পরিচিত।
ইউরেশীয় পাতের সাথে সংঘর্ষ ও হিমালয়ের সৃষ্টি (সিনোজোয়িক যুগ)
প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় পাতটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত বিশাল ইউরেশীয় পাতের (Eurasian Plate) সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
[ ইউরেশীয় পাত ] <--- (টেথিস সাগরের পলি) ---> [ ভারতীয় পাত (উত্তরমুখী চলন) ]
↓
(প্রবল চাপ ও ভাঁজ)
↓
[ হিমালয় পর্বতমালা ]
- টেথিস সাগরের অবলুপ্তি: দুই বিশাল ভূখণ্ডের চাপে মধ্যবর্তী টেথিস সাগরে জমা হওয়া পলিমাটি সংকুচিত হয়ে প্রবল ভাঁজের সৃষ্টি করে।
- হিমালয়ের উত্থান: এই পলিমাটি ও ভূখণ্ড উপরের দিকে উঠে সৃষ্টি হয় বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ও উচ্চতম হিমালয় পর্বতমালা। এই উত্থান একবারে হয়নি; এটি মূলত তিনটি প্রধান ধাপে (হিমাদ্রি, হিমাচল এবং শিবালিক) সম্পন্ন হয়েছে।
- চলমান প্রক্রিয়া: ভারতীয় পাতটি এখনও প্রতি বছর প্রায় ৪-৫ সেন্টিমিটার গতিতে ইউরেশীয় পাতের নিচে ঠেলে ঢুকছে, যার ফলে হিমালয়ের উচ্চতা আজও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই অঞ্চলে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়।
উত্তরের বিশাল সমভূমির গঠন (কোয়াটারনারি যুগ)
হিমালয় পর্বতমালা তৈরি হওয়ার পর এর দক্ষিণে একটি বিশাল অবনমিত নিচু খাঁদ বা গর্তের (Foreland Basin) সৃষ্টি হয়।
- পলি সঞ্চয়: উত্তর থেকে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীসমূহ (গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র) এবং দক্ষিণে প্রাচীন মালভূমি থেকে আসা নদীগুলি কোটি কোটি বছর ধরে বিপুল পরিমাণ পলি, বালি ও নুড়ি বহন করে এই নিচু খাঁদে জমা করতে থাকে।
- সমভূমি গঠন: ক্রমাগত পলি ভরাটের ফলে সৃষ্টি হয় বিশ্বের অন্যতম উর্বর উত্তরের বিশাল সমভূমি এবং পূর্বে বিশ্বের বৃহত্তম গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ।
আজকের ভারতের ভূপ্রকৃতি
এই দীর্ঘ ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের মাধ্যমেই ভারতের ভূপ্রকৃতি তার বর্তমান কাঠামো লাভ করেছে:
- দক্ষিণের উপদ্বীপীয় মালভূমি: ভারতের প্রাচীনতম শিলা দ্বারা গঠিত অংশ (গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অবশিষ্টাংশ)।
- উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল: নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা (টেথিস সাগরের পলি থেকে সৃষ্ট)।
- উত্তরের সমভূমি অঞ্চল: নদী দ্বারা বাহিত পলি জমে তৈরি সবচেয়ে নবীন অংশ।
গঠন, শিলার বয়স এবং ভূ-গাঠনিক প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র ভারতকে প্রধানত ৫টি ভারতের ভূপ্রকৃতি বিভাগে বিভক্ত করা যায়:
ভারতের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল:
ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্ত জুড়ে ধনুকাণাকারে বিস্তৃত সুবিশাল হিমালয় এবং উত্তর-পূর্বের পাহাড়ী অঞ্চল নিয়ে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল গঠিত। এটি বিশ্বের নবীনতম, উচ্চতম ও অত্যন্ত দুর্গম পর্বতমালা। পামির গ্রন্থি থেকে নির্গত হয়ে পশ্চিমে সিন্ধু নদের বাঁক (নঙ্গা পর্বত) থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁক (নামচা বারওয়া) পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে এটি বিস্তৃত।
প্রস্থ ও উচ্চতাভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ (উত্তরের সমান্তরাল পর্বতশ্রেণী)
দক্ষিণ থেকে উত্তরে উচ্চতা ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে হিমালয়কে প্রধানত ৪টি সমান্তরাল বিভাগে ভাগ করা হয়:
[ উত্তর ] ─── তিব্বতীয় হিমালয় (ট্যারাঙ্গ)
└─── হিমাদ্রি (উচ্চ হিমালয় - সর্বোচ্চ)
└─── হিমাচল (মধ্য হিমালয়)
└─── শিবালিক (বহিঃ হিমালয় - সর্বনিম্ন) ─── [ দক্ষিণ ]
- শিবালিক বা বহিঃ হিমালয় (Outer Himalayas):
- এটি হিমালয়ের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সবচেয়ে নবীনতম অংশ।
- উচ্চতা ও প্রস্থ: গড় উচ্চতা ৬০০ থেকে ১,৫০০ মিটার এবং প্রস্থ ১৫ থেকে ৫০ কিমি।
- বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত নদী দ্বারা বাহিত পলি, নুড়ি ও বালি জমে গঠিত। শিবালিক ও হিমাচলের মধ্যবর্তী অনুদৈর্ঘ্য উপত্যকাগুলোকে ‘দূন’ বলা হয় (যেমন: দেরাদুন)।
- হিমাচল বা মধ্য হিমালয় (Lesser Himalayas):
- শিবালিকের উত্তরে অবস্থিত।
- উচ্চতা ও প্রস্থ: গড় উচ্চতা ৩,৭০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬০ থেকে ৮০ কিমি।
- প্রধান পর্বতশ্রেণী: পিরপাঞ্জাল, ধৌলাধর, নাগটিব্বা ও মহাভারত।
- উপত্যকা ও পর্যটন কেন্দ্র: কাশ্মীর উপত্যকা, কুলু, কাংড়া এবং সিমলা, দার্জিলিং, মুসৌরী, নৈনিতালের মতো বিখ্যাত শৈলশহর এই অঞ্চলে অবস্থিত।
- হিমাদ্রি বা উচ্চ হিমালয় (Great Himalayas):
- এটি হিমালয়ের মূল এবং সর্বউচ্চ অংশ, যা সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে।
- উচ্চতা: গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটারের বেশি।
- প্রধান শৃঙ্গ: বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮.৮৬ মিটার – নেপালে অবস্থিত), ভারতের কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮,৫৯৮ মিটার – সিকিম), মাকালু, ধবলগিরি ও নঙ্গা পর্বত।
- টেথিস বা তিব্বতীয় হিমালয় (Tethys Himalayas):
- হিমাদ্রির উত্তরে তিব্বত মালভূমির সীমানায় অবস্থিত।
- বৈশিষ্ট্য: এটি পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত এবং এখানে প্রচুর সামুদ্রিক জীবাশ্ম পাওয়া যায়। জাস্কর ও লাদাখ পর্বতশ্রেণী এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
দৈর্ঘ্য বা আঞ্চলিক ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ
পশ্চিম থেকে পূর্বে নদী উপত্যকার ওপর ভিত্তি করে এই অঞ্চলকে ৩টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
| আঞ্চলিক বিভাগ | বিস্তার ও সীমানা | প্রধান পর্বত, শৃঙ্গ ও উপত্যকা |
| পশ্চিম হিমালয় | সিন্ধু নদ থেকে কালী নদী পর্যন্ত (কাশ্মীর, হিমাচল ও উত্তরাখণ্ড) | কারাকোরাম (ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ K2 বা গডউইন অস্টিন – ৮,৬১১ মিটার), কাশ্মীর উপত্যকা, জোজিলা ও কার্দুংলা গিরিপথ। |
| মধ্য হিমালয় | কালী নদী থেকে তিস্তা নদী পর্যন্ত (প্রধানত নেপাল ও সিকিম) | কাঞ্চনজঙ্ঘা, নাথুলা গিরিপথ এবং অনন্য সুন্দর সিকিম উপত্যকা। |
| পূর্ব হিমালয় | তিস্তা নদী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁক পর্যন্ত (অরুণাচল ও ভুটান) | নামচা বারওয়া, দাফা বুম এবং একাধিক গভীর ও সংকীর্ণ নদী খাত। |
পূর্বাচল বা উত্তর-পূর্বের পাহাড় (Purvanchal Hills)
হিমালয় পর্বতমালা ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে (মিয়ানমার সীমান্তে) পৌঁছে দক্ষিণ দিকে তীব্র বাঁক নিয়ে ছোট ছোট পাহাড় হিসেবে বিস্তৃত হয়েছে। এগুলোকে একত্রে পূর্বাচল বলা হয়।
- প্রধান পাহাড়সমূহ: অরুণাচল প্রদেশের প্যাটকই বুম, নাগাল্যান্ডের নাগা পাহাড়, মিজোরামের মিজো বা লুসাই পাহাড় এবং মণিপুর পাহাড়।
- মেঘালয় মালভূমির পাহাড়: মেঘালয়ে অবস্থিত গারো, খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া পাহাড় ভৌগোলিক বিচারে দাক্ষিণাত্যের উপদ্বীপীয় মালভূমির অংশ হলেও অবস্থানের কারণে উত্তর-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের সাথে আলোচিত হয়।
গুরুত্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব
- জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা এই পর্বতপ্রাচীর শীতকালে মধ্য এশিয়া থেকে আসা তীব্র শীতল বায়ুকে ভারতে প্রবেশ করতে বাধা দেয় এবং বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে আটকে সারা ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- নদীর উৎস: গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনার মতো ভারতের সমস্ত প্রধান চিরপ্রবাহী নদীর উৎস এই অঞ্চলের হিমবাহসমূহ (যেমন: গংগোত্রী, সিয়াচেন)।
- সুরক্ষা ও পর্যটন: ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী প্রাকৃতিক সীমান্ত প্রাচীর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ভারতের পর্যটন শিল্পের প্রধান ভিত্তি।
ভারতের উত্তরের বিশাল সমভূমি অঞ্চল:
উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এবং দক্ষিণের প্রাচীন উপদ্বীপীয় মালভূমির মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করছে ভারতের উত্তরের বিশাল সমভূমি। এটি মূলত সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদী ও তাদের অসংখ্য উপনদী-শাখানদী দ্বারা পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে গঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও উর্বর পলিগঠিত সমভূমি।
ভৌগোলিক বিস্তার ও গঠন বৈশিষ্ট্য
- বিস্তার: পশ্চিমে রাজস্থান ও পাঞ্জাব থেকে শুরু করে পূর্বে আসাম পর্যন্ত প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমভূমি অঞ্চল বিস্তৃত (ভারতে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২,৪০০ কিমি)।
- প্রস্থ ও গভীরতা: অঞ্চলটির প্রস্থ প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার। পলিমাটির গভীরতা স্থানভেদে ভিন্ন, তবে গড়ে ১,০০০ থেকে ২,০০০ মিটার পর্যন্ত গভীর পলিস্তর দেখা যায়।
- গঠন প্রক্রিয়া: হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টির পর দক্ষিণের নিচু উপত্যকায় (Foreland Basin) কোটি কোটি বছর ধরে নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা ও নুড়ি জমা হয়ে এই বিশাল সমতল ভূমি তৈরি হয়েছে।
মৃত্তিকা ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণীবিভাগ
উত্তরের সমভূমি অঞ্চলকে ভৌত বৈশিষ্ট্য এবং পলিমাটির ধরণের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত ৪টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়:
[ হিমালয়ের পাদদেশ ] ─── ভাবর (নুড়ি-পাথময়)
└─── তরাই (আর্দ্র ও জলাভূমি)
└─── ভাঙ্গর (প্রাচীন পলি)
└─── খাদার (নতুন উর্বর পলি) ─── [ নদী অববাহিকা ]
- ভাবর (Bhabar):
- শিবালিক পর্বতের পাদদেশে সিন্ধু থেকে তিস্তা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত নুড়ি, পাথর ও মোটা বালিযুক্ত সরু অঞ্চল (প্রস্থ ৮-১৬ কিমি)।
- এখানে ছিদ্রযুক্ত পাথরের নিচ দিয়ে ছোট ছোট নদী ও স্ট্রিমগুলো অদৃশ্য হয়ে প্রবাহিত হয়।
- তরাই (Terai):
- ভাবর অঞ্চলের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত আর্দ্র, ঘন বনাবৃত এবং জলাভূমিপূর্ণ অঞ্চল।
- ভাবর অঞ্চলে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নদীগুলো এখানে পুনরায় ভূ-পৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়।
- ভাঙ্গর (Bhangar):
- নদীর অববাহিকার উঁচুমূলের অঞ্চল, যা প্রাচীন পলিমাটি দিয়ে গঠিত।
- এখানে বন্যা সাধারণত পৌঁছায় না এবং মাটিতে কঙ্কর (চুনাপাথরের পিণ্ড) পাওয়া যায়।
- খাদার (Khadar):
- নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকা, যা প্রতি বছর বন্যায় নতুন উর্বর পলি দ্বারা সমৃদ্ধ হয়।
- এটি কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত ও উর্বর। পাঞ্জাবে একে ‘বেট’ (Bet) বলা হয়।
আঞ্চলিক বা নদী অববাহিকা ভিত্তিক বিভাগ
পশ্চিম থেকে পূর্বে নদীপ্রণালীর ওপর ভিত্তি করে এই সমভূমিকে ৪টি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়:
| বিভাগ | ভৌগোলিক বিস্তার | প্রধান নদী ও বৈশিষ্ট্য |
| ১. রাজস্থান সমভূমি | ভারতের পশ্চিম সীমান্তে রাজস্থানের থর মরুভূমি অঞ্চল। | লুনী (প্রধান অন্তর্দেশীয় নদী)। এখানে অনেক লবণাক্ত জলের হ্রদ রয়েছে (যেমন: সম্বর হ্রদ)। |
| ২. পাঞ্জাব-হরিয়ানা সমভূমি | পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লির অংশ। | শতদ্রু, বিপাশা ও ইরাবতী নদী। এটি মূলত দয়াব (Doab – দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি) অঞ্চল নিয়ে গঠিত। |
| ৩. গঙ্গা সমভূমি | উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত বিশাল অংশ। | গঙ্গা, যমুনা, ঘাঘরা, গণ্ডক, কোশী প্রভৃতি নদী। এটিকে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন গঙ্গা সমভূমিতে ভাগ করা হয়। |
| ৪. ব্রহ্মপুত্র সমভূমি | পূর্বে আসাম উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। | ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীসমূহ। নদীর বুকে গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম নদীদ্বীপ মাঝুলি এখানে অবস্থিত। |
অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
- ভারতের শস্যভাণ্ডার: উর্বর পলিমাটি এবং নদীনির্ভর সেচ ব্যবস্থার কারণে এটি ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিশিল্প অঞ্চল। গম, ধান, আখ ও পাট উৎপাদনে এই অঞ্চল শীর্ষে।
- জনঘনত্ব: সমতল ভূমি ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই সমভূমি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল (ভারতের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলেই বাস করে)।
- শিল্প ও নগরায়ন: দিল্লি, কানপুর, লখনউ, বারাণসী, পাটনা, কলকাতা এবং লুধিয়ানার মতো ভারতের প্রধান প্রধান শিল্প কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক শহরগুলো এই সমভূমি অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে।
ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল:
উত্তরের বিশাল সমভূমির দক্ষিণে ত্রিকোণাকারে অবস্থান করছে উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল। এটি প্রাচীন গন্ডোয়ানা ভূখণ্ডের অংশ এবং ভারতের সর্ববৃহৎ (প্রায় ১৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার) ও প্রাচীনতম ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ। আর্কিয়ান যুগের রূপান্তরিত ও অগ্নেয় শিলা (যেমন: গ্রানাইট ও নিস) দিয়ে এই ভূখণ্ড গঠিত।
মূল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
- আকৃতি ও সীমানা: অঞ্চলটির আকৃতি উল্টানো ত্রিভুজের মতো। উত্তরে আরাবল্লী, বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বত; পশ্চিমে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পূর্বে পূর্বঘাট পর্বতমালা এর সীমানা নির্ধারণ করেছে।
- গড় উচ্চতা: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০ থেকে ৯০০ মিটার।
- ভূ-তাত্ত্বিক গঠন: এটি অত্যন্ত স্থিতিশীল একটি ভূখণ্ড (Shield Area), যা বিভিন্ন সময়ে নদীর ক্ষয়কার্য ও লাভা উদগীরণের মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।
প্রধান প্রাকৃতিক ও ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ
নর্মদা ও শোণ নদী উপত্যকা সমগ্র উপদ্বীপীয় মালভূমিকে দুটি প্রধানভাগে বিভক্ত করেছে:
[ উত্তর-পশ্চিম ] ─── মধ্যভারতের উচ্চভূমি (মালব, বুন্দেলখণ্ড, ছোটনাগপুর)
│
(নর্মদা নদী উপত্যকা)
│
[ দক্ষিণ ] ───────── দাক্ষিণাত্যের মালভূমি (Decan Plateau)
মধ্যভারতের উচ্চভূমি (Central Highlands)
নর্মদা নদীর উত্তরে অবস্থিত অঞ্চলটি মধ্যভারতের উচ্চভূমি নামে পরিচিত।
- আরাবল্লী পর্বত: ভারতের প্রাচীনতম ক্ষয়জাত ভঙ্গিল পর্বত। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ গুরুশিখর (১,৭২২ মিটার)।
- মালব মালভূমি: বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরে অবস্থিত ব্যাসাল্ট শিলা ও কৃষ্ণমৃত্তিকা দ্বারা গঠিত এলাকা।
- বুন্দেলখণ্ড ও বাঘেলখণ্ড: মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত গ্রানাইট গঠিত উচ্চভূমি।
- ছোটনাগপুর মালভূমি: ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত। এটি খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ বলে একে “ভারতের রূঢ়” বলা হয়। এখানকার সর্বোচ্চ পাহাড় পরেশনাথ।
দাক্ষিণাত্যের মালভূমি (Deccan Plateau)
নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত বিশাল ত্রিভুজাকৃতি অঞ্চল হলো দাক্ষিণাত্যের মালভূমি।
- ডেকান ট্র্যাপ: মেসোজোয়িক যুগে রেইউনিয়ন হটস্পটের প্রভাবে হওয়া অনুদ্বেধী লাভা উদগীরণে গঠিত ব্যাসাল্ট শিলার স্তরযুক্ত অংশ (প্রধানত মহারাষ্ট্র ও গুজরাট)।
- মহীশূর বা কর্ণাটক মালভূমি: এটি দুটি অংশে বিভক্ত— পাহাড়ি অংশ ‘মালনাদ’ এবং সমতল অংশ ‘ময়দান’।
- তেলেঙ্গানা মালভূমি: অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত ব্যবচ্ছিন্ন মালভূমি।
সীমান্ত পর্বতমালা: পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট
উপদ্বীপীয় মালভূমির দুই প্রান্তে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বতমালা অবস্থান করছে:
| বৈশিষ্ট্য | পশ্চিমঘাট পর্বতমালা (সহ্যাদ্রি) | পূর্বঘাট পর্বতমালা (পূর্বাদ্রি) |
| অবস্থান | আরব সাগরের সমান্তরালে (পশ্চিম উপকূলে)। | বঙ্গোপসাগরের সমান্তরালে (পূর্ব উপকূলে)। |
| ধারাবাহিকতা | অবিচ্ছিন্ন পর্বতশ্রেণী (গিরিপথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়, যেমন: থালঘাট, ভোরঘাট)। | বিচ্ছিন্ন ও নদীর ক্ষয়কার্যে খণ্ড-বিখণ্ড। |
| সর্বোচ্চ শৃঙ্গ | আনাইমুদি (২,৬৯৫ মিটার) – এটি সমগ্র দক্ষিণ ভারতের উচ্চতম শৃঙ্গ। | জিন্দাগাদা / আরমাকোন্ডা (১,৬৯০ মিটার)। |
| মিলনস্থল | দক্ষিণে নীলগিরি পর্বতে পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালা একত্রিত হয়েছে। |
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার: ভারতের সিংহভাগ খনিজ সম্পদ (কয়লা, লৌহ আকরিক, ম্যাঙ্গানিজ, সোনা, তামা ও অভ্র) এই মালভূমি অঞ্চলেই সঞ্চিত।
- জলবিদ্যুৎ ও নদী: নর্মদা, তাপ্তি, মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর জলপ্রপাত (যেমন: যোগ জলপ্রপাত) থেকে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
- কৃষ্ণমৃত্তিকা ও কৃষি: লাভা গঠিত ব্যাসাল্ট শিলা থেকে তৈরি ‘রেগুর’ বা কালো মাটি তুলা এবং আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
ভারতের উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল:
দক্ষিণের উপদ্বীপীয় মালভূমির দুই পাশে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বিস্তৃত সংীর্ণ সমতল ভূখণ্ডকে উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল বলা হয়। পশ্চিমে গুজরাটের কচ্ছ উপদ্বীপ থেকে শুরু করে পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন পর্যন্ত প্রায় ৭,৫১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা জুড়ে এই অঞ্চলটি বিস্তৃত।
১. আঞ্চলিক শ্রেণীবিভাগ
ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্র সৈকত এবং গঠনের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে ভারতের উপকূলীয় সমভূমিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
[ উপদ্বীপীয় মালভূমি ]
│
┌───────────────────┴───────────────────┐
▼ ▼
[ পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি ] [ পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি ]
(সংকীর্ণ, খাড়া, কয়াল যুক্ত) (প্রশস্ত, সমতল, বদ্বীপ যুক্ত)
পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি (Western Coastal Plain)
আরব সাগর এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এটি অবস্থিত। এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং নিমজ্জিত (submerged) প্রকৃতির উপকূল।
- বিস্তার: গুজরাট থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত।
- প্রস্থ: গড়ে ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার (কচ্ছ ও কাঠিয়াবাড় অঞ্চলে কিছুটা চওড়া)।
- উপ-বিভাগ:
- গুজরাট উপকূল: কচ্ছ ও কাঠিয়াবাড় উপদ্বীপীয় অঞ্চল।
- কঙ্কণ উপকূল: মহারাষ্ট্র ও গোয়ার উপকূলীয় অংশ (অত্যন্ত ভগ্ন ও পাহাড়ি)।
- কন্নড় বা কর্ণাটক উপকূল: কর্ণাটক রাজ্য বরাবর বিস্তৃত অংশ।
- মালাবার উপকূল: কেরল রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত।
- কয়াল (Kayals): মালাবার উপকূলে অসংখ্য সমুদ্রের উপহ্রদ বা ব্যাকওয়াটার্স দেখা যায়, যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘কয়াল’ বলা হয় (যেমন: ভেম্বানাদ ও অষ্টমুদি কয়াল)।
পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি (Eastern Coastal Plain)
বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বঘাট পর্বতমালার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এটি একটি চওড়া ও উত্থানযুক্ত (emerged) সমভূমি।
- বিস্তার: পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা সীমান্ত (সুবর্ণরেখা নদী) থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত।
- প্রস্থ: গড়ে ১০০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার।
- উপ-বিভাগ:
- উত্তর সরকার উপকূল: ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় উপকূল। ওড়িশার অংশকে ‘উৎকল উপকূল’ বলা হয়।
- করমণ্ডল উপকূল: অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণাংশ ও তামিলনাড়ু উপকূল। এখানে বছরে দু’বার (বর্ষাকালে ও শীতকালে) বৃষ্টিপাত হয়।
- বদ্বীপ ও হ্রদ: মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও কাবেরী নদী বঙ্গোপসাগরে পতনের মুখে বিস্তৃত উর্বর বদ্বীপ গঠন করেছে। এখানে ভারতের বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ চিল্কা (ওড়িশা) এবং পুলিকট হ্রদ (অন্ধ্রপ্রদেশ) অবস্থিত।
পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় সমভূমির তুলনা
| বৈশিষ্ট্য | পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি | পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি |
| সীমানা | আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মাঝে। | বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতমালার মাঝে। |
| প্রস্থ | সংকীর্ণ (৫০–৮০ কিমি)। | বেশ চওড়া (১০০–১৩০ কিমি)। |
| বদ্বীপ গঠন | নদীগুলো দ্রুতগামী হওয়ায় বদ্বীপ গঠিত হয়নি (তৈরি হয়েছে খাঁড়ি বা Estuary)। | নদীগুলোর প্রবাহ ধীর হওয়ায় সুবিশাল ও উর্বর বদ্বীপ গঠিত হয়েছে। |
| বিশেষ রূপ | ব্যাকওয়াটার্স বা ‘কয়াল’ দেখা যায়। | প্রাকৃতির হ্রদ ও দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্র সৈকত (যেমন: মারিনা বিচ) দেখা যায়। |
| বন্দর | প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে ওঠার উপযোগী (যেমন: মুম্বাই, মার্মাগাঁও, কোচি)। | অধিকাংশ কৃত্রিম ও অগভীর বন্দর (যেমন: চেন্নাই, বিশাখাপত্তনম)। |
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- কৃষি ও নারকেল চাষ: পূর্ব উপকূলের নদী বদ্বীপগুলো চাল ও আখের উর্বর কৃষি ক্ষেত্র। মালাবার উপকূল নারকেল, সুপারি ও মশলা (এলাচ, গোলমরিচ) চাষের জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
- মৎস্য ও সামুদ্রিক বাণিজ্য: দীর্ঘ উপকূলরেখা ভারতের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবিকা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের মূল ভিত্তি।
- পর্যটন: গোয়া, কোভালাম, পুরী, গোপালপুর ও চেন্নাইয়ের সমুদ্র সৈকত ভারতের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করেছে।
- খনিজ সম্পদ: উপকূলীয় বালিতে প্রচুর পরিমাণে মোনাজাইট (পারমাণবিক খনিজ) ও খনিজ তেল/গ্যাস (যেমন: বোম্বে হাই, কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা) পাওয়া যায়।
ভারতের দ্বীপপুঞ্জ:
ভারতের মূল ভূখণ্ডের বাইরে দুটি প্রধান জলভাগে অবস্থিত ছোট-বড় বহু দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ গঠিত। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, গঠন প্রক্রিয়া এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে এদের প্রধানত দুটি বড় দলে ভাগ করা হয়: বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং আরব সাগরের লক্ষদ্বীপ।
মূল দুটি দ্বীপপুঞ্জের প্রধান বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ | লক্ষদ্বীপ |
| জলভাগ | বঙ্গোপসাগর | আরব সাগর |
| মোট দ্বীপ সংখ্যা | প্রায় ৫৭২টি (যার মধ্যে প্রায় ৩৮টিতে জনবসতি রয়েছে) | ৩৬টি (যার মধ্যে ১০টিতে জনবসতি রয়েছে) |
| গঠন প্রকৃতি | টেকটনিক ও আগ্নেয় উৎসের (নিমজ্জিত হিমালয়/আরাকান ইয়োমা পর্বতের চূড়া) | প্রবাল কিট (Coral Polyps) নির্মিত প্রবাল দ্বীপ |
| রাজধানী | পোর্ট ব্লেয়ার (Port Blair) | কাভারাত্তি (Kavaratti) |
| সর্বোচ্চ শৃঙ্গ | স্যাডল পিক (Saddle Peak – ৭৩৮ মিটার) | নামমাত্র উচ্চতা (সর্বোচ্চ প্রায় ১০-১৫ মিটার) |
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ
উত্তর-দক্ষিণে ধনুকের মতো বিস্তৃত এই দ্বীপপুঞ্জটিকে ১০ ডিগ্রি চ্যানেল (10° Channel) দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছে:
- উত্তরভাগ: আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ (উত্তর, মধ্য, দক্ষিণ ও ক্ষুদ্র আন্দামান)।
- দক্ষিণভাগ: নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (কার নিকোবর, গ্রেট নিকোবর)।
- অগ্নিগিরি: ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ব্যারেন দ্বীপ (Barren Island) এবং সুপ্ত আগ্নেয়গিরি নারকোন্ডাম (Narcondam) এই দ্বীপপুঞ্জেই অবস্থিত।
- ইন্দিরা পয়েন্ট (Indira Point): গ্রেট নিকোবর দ্বীপে অবস্থিত এটি ভারতের সর্বদক্ষিণ বিন্দু (২০০৪ সালের সুনামিতে এটি আংশিক জলমগ্ন হয়)।
- উদ্ভিদ ও আবহাওয়া: নিরক্ষীয় জলবায়ু হওয়ার কারণে এখানে চিরহরিৎ বা নিরক্ষীয় বৃষ্টি অরণ্যের প্রাচুর্য দেখা যায়।
লক্ষদ্বীপ
এটি ভারতের ক্ষুদ্রতম কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যা কেরল উপকূল থেকে প্রায় ২৮০–৪০০ কিমি পশ্চিমে আরব সাগরে অবস্থিত।
- প্রবাল দ্বীপ (Atolls): সামুদ্রিক কীট বা প্রবাল কীটের অশ্মীভূত কঙ্কাল সঞ্চিত হয়ে এই দ্বীপগুলো গড়ে উঠেছে।
- চ্যানেল বিভাজন:
- ৯ ডিগ্রি চ্যানেল (9° Channel): মিনিকয় দ্বীপকে মূল লক্ষদ্বীপ থেকে আলাদা করেছে।
- ৮ ডিগ্রি চ্যানেল (8° Channel): লক্ষদ্বীপের মিনিকয় দ্বীপকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মালদ্বীপ থেকে পৃথক করেছে।
- পিট্টি দ্বীপ (Pitti Island): এটি একটি নির্জন দ্বীপ যা পক্ষী অভয়ারণ্য (Bird Sanctuary) হিসেবে সংরক্ষিত।
স্ট্র্যাটেজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- সামরিক ও ভূ-রাজনীতি (Geopolitics): ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ (SLOC) পাহারা দিতে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের জন্য ‘প্রাকৃতিক বিমানবাহী রণতরী’ হিসেবে কাজ করে।
- পর্যটন ও নীল অর্থনীতি (Blue Economy): প্রবাল প্রাচীর, স্বচ্ছ নীল জলরাশি এবং ডাইভিংয়ের মতো ওয়াটার স্পোর্টসের জন্য লক্ষদ্বীপ ও আন্দামান ভারতের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।
- বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ): এই দ্বীপপুঞ্জগুলোর কারণে ভারত মহাসাগরে ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামুদ্রিক খনিজ ও মৎস্য সম্পদের অন্যতম উৎস।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের ভূপ্রকৃতি কেবল দেশের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সীমান্ত নির্ধারণ করেনি; বরং এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ু, নদীপ্রণালী, প্রাকৃতিক উদ্ভিদ, কৃষি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করছে। উত্তরের পর্বতমালা দেশকে মধ্য এশিয়ার তীব্র শীতল হাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে আটকে সারা ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। অন্যদিকে মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের মালভূমির খনিজ সম্পদ ভারতীয় শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
এছাড়া দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং রণনৈতিক অবস্থানযুক্ত দ্বীপপুঞ্জগুলো আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের পাশাপাশি ভারতের ভৌগোলিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। প্রাকৃতিক গঠন ও সম্পদের এই অনন্য সমন্বয়ই ভারতের ভূপ্রকৃতি-কে বিশ্বের দরবারে এক বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
আরো পড়ুন: জোয়ার ও ভাটা:
ভারতের ভূপ্রকৃতি ও ভৌগোলিক গঠন সম্পর্কিত শীর্ষ ২০টি প্রশ্ন ও উত্তর
১. ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম কী?
- উত্তর: ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো K2 বা গডউইন অস্টিন (৮,৬১১ মিটার)। তবে এটি পাক-অধ্যুষিত কাশ্মীরে অবস্থিত। ভারতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮,৫৯৮ মিটার)।
২. দক্ষিণ ভারতের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কোনটি?
- উত্তর: দক্ষিণ ভারত তথা উপদ্বীপীয় মালভূমির উচ্চতম শৃঙ্গ হলো আনাইমুদি (২,৬৯৫ মিটার), যা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অ্যানামলাই পাহাড়ে অবস্থিত।
৩. হিমালয় পর্বতমালা কীভাবে গঠিত হয়েছে?
- উত্তর: প্রায় ৪০-৫০ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় টেকটনিক পাত ও ইউরেশীয় টেকটনিক পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে টেথিস সাগরের পলিমাটি সংকুচিত ও ভাঁজপ্রাপ্ত হয়ে ভঙ্গিল পর্বত হিমালয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
৪. ‘গন্ডোয়ানাল্যান্ড’ কী?
- উত্তর: কোটি কোটি বছর আগে প্যানজিয়া ভেঙে দক্ষিণে যে বিশাল অতি-মহাদেশ গঠিত হয়েছিল, তাকে গন্ডোয়ানাল্যান্ড বলা হয়। ভারত, আফ্রিকা, অ্যান্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া একসময় এই ভূখণ্ডের অংশ ছিল।
৫. খাদার ও ভাঙ্গরের মধ্যে পার্থক্য কী?
- উত্তর: গঙ্গা সমভূমির নতুন ও উর্বর পলিমাটি দ্বারা গঠিত অঞ্চলকে ‘খাদার’ বলা হয়, যা কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অন্যদিকে প্রাচীন পলিমাটি দিয়ে গঠিত কিছুটা উঁচু অঞ্চলকে ‘ভাঙ্গর’ বলা হয়।
৬. ‘ডেকান ট্র্যাপ’ বলতে কী বোঝায়?
- উত্তর: মেসোজোয়িক যুগে অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে নির্গত লাভা জমে ব্যাসাল্ট শিলা দ্বারা সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে যে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি গঠিত হয়েছে, তাকে ‘ডেকান ট্র্যাপ’ বলা হয়। (‘ট্র্যাপ’ শব্দের অর্থ সিঁড়ি)।
৭. ‘কয়াল’ কী এবং এটি কোথায় দেখা যায়?
- উত্তর: ভারতের মালাবার উপকূলে (কেরল) অবস্থিত সামুদ্রিক উপহ্রদ বা ব্যাকওয়াটার্সগুলোকে স্থানীয় ভাষায় ‘কয়াল’ বলা হয় (যেমন: ভেম্বানাদ কয়াল)।
৮. আরাবল্লী পর্বতের বৈশিষ্ট্য কী?
- উত্তর: আরাবল্লী হলো ভারতের প্রাচীনতম ক্ষয়জাত ভঙ্গিল পর্বত। এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হলো গুরুশিখর (১,৭২২ মিটার)।
৯. ভারতে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি কোনটি?
- উত্তর: বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ‘ব্যারেন দ্বীপ’ (Barren Island) ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
১০. পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালা কোথায় মিলিত হয়েছে?
- উত্তর: দক্ষিণ ভারতে নীলগিরি পর্বতে পশ্চিমঘাট এবং পূর্বঘাট পর্বতমালা পরস্পর মিলিত হয়েছে।
১১. শিবালিক ও হিমাচলের মধ্যবর্তী উপত্যকাকে কী বলা হয়?
- উত্তর: শিবালিক ও হিমাচল পর্বতের মধ্যবর্তী অনুদৈর্ঘ্য সমতল উপত্যকাগুলোকে ‘দূন’ বলা হয় (যেমন: দেরাদুন)।
১২. থর মরুভূমির শুষ্ক ও বালিযুক্ত অঞ্চলকে কী বলা হয়?
- উত্তর: রাজস্থানের থর মরুভূমির অত্যন্ত শুষ্ক, উদ্ভিদহীন ও বালুকাময় অঞ্চলকে বলা হয় ‘মরুস্থলী’, যার অর্থ মৃতের দেশ।
১৩. ছোটনাগপুর মালভূমিকে “ভারতের রূঢ়” বলা হয় কেন?
- উত্তর: জার্মানির রূঢ় শিল্পাঞ্চলের মতো ছোটনাগপুর মালভূমিও কয়লা, লোহা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়ায় একে “ভারতের রূঢ়” বলা হয়।
১৪. ভারতের প্রবাল দ্বীপপুঞ্জ কোনটি?
- উত্তর: আরব সাগরে অবস্থিত লক্ষদ্বীপ একটি প্রবাল দ্বীপপুঞ্জ, যা প্রবাল কীটের (Coral Polyps) কঙ্কাল জমে তৈরি হয়েছে।
১৫. আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে কোন চ্যানেল আলাদা করেছে?
- উত্তর: ‘১০ ডিগ্রি চ্যানেল’ (10° Channel) আন্দামান দ্বীপপুঞ্জকে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে পৃথক করেছে।
১৬. ভারতের সর্বদক্ষিণ বিন্দুর নাম কী?
- উত্তর: ভারতের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ বিন্দু হলো ‘কন্যাকুমারী’। তবে সমগ্র ভারতের সর্বদক্ষিণ বিন্দু হলো গ্রেট নিকোবরে অবস্থিত ‘ইন্দিরা পয়েন্ট’।
১৭. ভাবর ও তরাই অঞ্চল কাকে বলে?
- উত্তর: শিবালিকের পাদদেশে নদী দ্বারা বাহিত নুড়ি-পাথর যুক্ত সরু অঞ্চলকে ‘ভাবর’ এবং ভাবরের দক্ষিণে অবস্থিত আর্দ্র ও জলাভূমিযুক্ত ঘন বনাবৃত অঞ্চলকে ‘তরাই’ বলা হয়।
১৮. পশ্চিম উপকূলের নদীগুলো বদ্বীপ গঠন করে না কেন?
- উত্তর: পশ্চিমঘাট পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীগুলো অত্যন্ত তীব্র গতিসম্পন্ন এবং সংক্ষিপ্ত হওয়ায় মোহনায় পলি জমা হতে পারে না, ফলে বদ্বীপের বদলে খাঁড়ি (Estuary) গঠিত হয়।
১৯. পূর্বাচল পাহাড়ি অঞ্চলের প্রধান পাহাড়গুলো কী কী?
- উত্তর: অরুণাচল প্রদেশের প্যাটকই বুম, নাগাল্যান্ডের নাগা পাহাড়, মিজোরামের মিজো (লুসাই) পাহাড় এবং মণিপুর পাহাড় একত্রে পূর্বাচল নামে পরিচিত।
২০. ভারতের বৃহত্তম নদীদ্বীপ কোনটি?
- উত্তর: আসামে ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে গড়ে ওঠা ‘মাঝুলি’ (Majuli) হলো ভারতের তথা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নদীদ্বীপ।