ভূমিকা (Introduction):
মানব সভ্যতার বিবর্তন, সামাজিক পরিবর্তন এবং প্রকৃতির অন্তর্নিহিত নিয়মাবলী উন্মোচনের ক্ষেত্রে দর্শনের ইতিহাসে যে কয়েকটি তত্ত্ব যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছে, তার মধ্যে সর্বাগ্রে আসে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। আপনি যদি সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা রাষ্ট্রনীতির গভীর দর্শন বুঝতে চান, তবে মার্কসীয় দর্শনের এই মূল ভিত্তিটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি।
অনেক সময় দর্শনের জটিল শব্দচয়ন ও কাঠখোট্টা ব্যাখ্যার কারণে সাধারণ পাঠকের কাছে এটি কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। তবে আমাদের দৈনন্দিন প্রকৃতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতার দিকে তাকালে এই তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ মূলত জার্মান দার্শনিক হেগেলের ‘দ্বন্দ্ববাদ’ এবং ফয়েরবাখের ‘বস্তুবাদ’-এর সমন্বয়ে গঠিত এক অনন্য দর্শন। হেগেলের ভাববাদকে বাতিল করে মার্কস দেখিয়েছেন যে, কোনো অলৌকিক শক্তি নয়—বরং দৃশ্যমান বস্তুজগৎ এবং এর ভেতরের অভ্যন্তরীণ বিরোধই সমস্ত পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। এই তত্ত্ব আমাদের শেখায় কীভাবে বস্তুজগতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো জমা হয়ে সমাজে বা প্রকৃতিতে বড় ধরনের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায়।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কী?
সহজ ভাষায়, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism) হলো প্রকৃতি, সমাজ এবং মানব চেতনার বিকাশ ও পরিবর্তনকে বস্তুবাদী এবং গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করার বৈজ্ঞানিক দর্শন।
এই তত্ত্বটি দুটি প্রধান দার্শনিক ধারণার সমন্বয়ে গঠিত:
- বস্তুবাদ (Materialism): বস্তুবাদ স্বীকার করে যে দৃশ্যমান জগত এবং পদার্থ বা ‘বস্তু’ (Matter) হলো প্রাথমিক। চিন্তা, মন বা চেতনা বস্তুরই উন্নত রূপ বা প্রতিক্রিয়া মাত্র।
- দ্বন্দ্ববাদ (Dialectics): দ্বন্দ্ববাদ মনে করে, এই বিশ্বের কোনো কিছুই স্থির বা চিরন্তন নয়। প্রতিটি বস্তুর ভেতরেই বিপরীতমুখী শক্তির লড়াই বা দ্বন্দ্ব রয়েছে, আর এই অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের ফলেই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটছে।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আমাদের শেখায় যে বিশ্বজগত কোনো ঈশ্বর বা অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা পরিচালিত নয়, বরং বস্তুর ভেতরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও গতির ফলেই জগত অবিরাম পরিবর্তিত হচ্ছে।
আরো পড়ুন: কৌটিল্যের দণ্ডনীতি:
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি:
কার্ল মার্কস (Karl Marx) ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৎকালীন ইউরোপের দুজন বিশিষ্ট দার্শনিকের চিন্তা থেকে মূল উপাদান গ্রহণ করে এই তত্ত্বটি দাঁড় করান।
জি. ডব্লিউ. এফ. হেগেল (ভাববাদী দ্বন্দ্ববাদ)
+
লুডভিগ ফয়েরবাখ (যান্ত্রিক বস্তুবাদ)
=
কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ
১. হেগেলের অবদান: জার্মান দার্শনিক হেগেল প্রবর্তন করেছিলেন ‘দ্বন্দ্ববাদ’। তিনি দেখিয়েছিলেন প্রতিটি ধারণার ভেতরে বিরোধ থাকে এবং সেই বিরোধের মাধ্যমে চিন্তার অগ্রগতি ঘটে। কিন্তু হেগেল ছিলেন ভাববাদী; তিনি মনে করতেন কোনো ‘পরম চেতনা’ বা অলৌকিক ঈশ্বর জগত পরিচালনা করছে।
২. ফয়েরবাখের অবদান: লুডভিগ ফয়েরবাখ হেগেলের এই অলৌকিক ভাববাদকে বাতিল করে ‘বস্তুবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেনি, মানুষই নিজের প্রয়োজনে ঈশ্বরের কল্পনা করেছে। কিন্তু ফয়েরবাখের বস্তুবাদ ছিল যান্ত্রিক ও গতিহীন।
মার্কসের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ: মার্কস ফয়েরবাখের বস্তুবাদকে গ্রহণ করলেন এবং তার সাথে হেগেলের গতির তত্ত্ব অর্থাৎ দ্বন্দ্ববাদকে যুক্ত করলেন। তবে হেগেলের দ্বন্দবাদ যেখানে ভাব বা ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, মার্কস তাকে পদার্থের ওপর প্রয়োগ করলেন। মার্কসের ভাষায়: “হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ মাথার ওপর ভর দিয়ে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি তাকে পায়ের ওপর সোজা করে খাড়া করেছি।”
মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ:
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলসের দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism) হলো মার্কসীয় দর্শনের মূল চালিকাশক্তি। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো: দৃশ্যমান বস্তুজগৎই প্রাথমিক এবং বস্তুগত অবস্থার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মাধ্যমেই প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার বিকাশ ঘটে।
মার্কস জার্মান দার্শনিক হেগেলের দ্বন্দবাদ (Dialectics) এবং ফয়েরবাখের বস্তুবাদ (Materialism)-এর বৈপ্লবিক সমন্বয় ঘটিয়ে এটি প্রবর্তন করেন। হেগেল বিশ্বাস করতেন চিন্তা বা পরম আত্মা বিশ্ব পরিচালনা করে, কিন্তু মার্কস হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ থেকে ভাববাদ বাতিল করে তা বস্তুর ওপর প্রয়োগ করেন। মার্কস বলেছিলেন: “হেগেলের দ্বন্দবাদ মাথার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি তাকে পায়ের ওপর খাড়া করেছি।”
হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদ বনাম মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ:
| বিষয় | হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ | মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ |
| মূল ভিত্তি | চেতনা, পরম আত্মা বা চিন্তা | বস্তুজগৎ, প্রকৃতি ও অর্থনৈতিক পরিবেশ |
| উৎপত্তি | চিন্তাভাবনা থেকে বস্তুগত বাস্তবতার জন্ম | বস্তুগত বাস্তবতা থেকে চিন্তার জন্ম |
| ইতিহাসের চালিকাশক্তি | পরম ভাব বা আদর্শের বিকাশ | শ্রেণী সংগ্রাম ও উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব |
সামাজিক তাৎপর্য:
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে সমাজ ও ইতিহাসের ওপর প্রয়োগ করলে তাকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলা হয়। এটি দেখায় যে সমাজস্থ অর্থনৈতিক কাঠামো ও শ্রেণীর দ্বন্দ্বই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় (যেমন: দাস সমাজ —- সামন্তবাদ —-পুঁজিবাদ —- সমাজতন্ত্র) পরিবর্তনের মূল কারণ।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ৩টি মূল সূত্র:
ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস তাঁর ‘ডায়ালেকটিকস অব নেচার’ এবং ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ গ্রন্থে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তিনটি প্রধান সূত্রের কথা উল্লেখ করেছেন।
বিপরীত বস্তুর ঐক্য ও সংগ্রাম (Law of Unity and Struggle of Opposites):
বিশ্বজগতের প্রতিটি বস্তু বা ব্যবস্থার ভেতরে দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তি অবস্থান করে। তারা একই সাথে অবস্থান করে (ঐক্য) এবং প্রতিনিয়ত পরস্পর লড়ে (সংগ্রাম)। এই সংগ্রামের ফলেই বস্তুর পরিবর্তন ঘটে।
- সামাজিক উদাহরণ: পুঁজিবাদী সমাজে ‘মালিক’ (বুর্জোয়া) ও ‘শ্রমিক’ (প্রোলেতারিয়েত) দুটি বিপরীত শ্রেণী। মালিক চায় কম মজুরিতে বেশি খাটাস, শ্রমিক চায় ন্যায্য মজুরি ও অধিকার। এই বিরোধই সামাজিক পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।
পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন (Law of Passage of Quantitative into Qualitative Changes):
বস্তুর মধ্যে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পরিমাণগত পরিবর্তন জমা হতে হতে একসময় হঠাৎ করেই বড় ধরনের গুণগত বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে।
- প্রাকৃতিক উদাহরণ: জলকে তাপ দিলে তার উত্তাপ ১°, ২°, ৩° করে বাড়তে থাকে (পরিমাণগত)। কিন্তু ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে তা আর জল থাকে না, বাষ্পে পরিণত হয় (গুণগত)।
নেতির নেতিকরণ (Law of Negation of the Negation):
নতুন ব্যবস্থা সবসময় পুরনো ব্যবস্থাকে বাতিল বা অস্বীকার (Negation) করে। কিন্তু এটি পুরনোকে ধ্বংস করে না, বরং পুরোনো ব্যবস্থার সেরা ও ইতিবাচক দিকগুলোকে সাথে নিয়ে আরও উন্নত রূপ ধারণ করে।
- বীজের উদাহরণ: একটি ধান বীজ মাটিতে পুঁতলে গাছ গজায় (গাছটি বীজকে নেতিকরণ করল)। আবার সেই গাছটি বড় হয়ে শত শত নতুন ধান জন্ম দিয়ে নিজে মরে যায় (নতুন ধানগুলো গাছকে নেতিকরণ করল)। এটিই নেতির নেতিকরণ।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ৭টি সেরা ও শক্তিশালী নীতি:
মার্কসবাদী দর্শন কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনে ও সমাজ বিশ্লেষণে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ৭টি অত্যন্ত শক্তিশালী নীতি কাজ করে:
- বস্তুর প্রাথমিকতা: মহাবিশ্বে বস্তুই প্রধান, চেতনা তার অনুগামী।
- সর্বজনীন গতি ও পরিবর্তন: স্থির বলে কিছু নেই, সবকিছু পরিবর্তনশীল।
- আকস্মিক রূপান্তর: ছোট পরিবর্তনগুলো জমতে জমতে বড় বিপ্লব ঘটায়।
- অভ্যন্তরীণ বিরোধই গতির মূল: বাইরের কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, ভেতরের বিরোধই পরিবর্তনের কারণ।
- সর্বজনীন পারস্পরিক নির্ভরতা: প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনা বা বস্তুর সাথে অন্য বস্তুর সম্পর্ক রয়েছে।
- ইতিহাসের সামাজিক প্রয়োগ: অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বন্দ্বই ইতিহাস সৃষ্টি করে।
- জ্ঞানার্জনের ভিত্তি হলো অনুশীলন: কেবল চিন্তা করে সত্য জানা যায় না, বাস্তব কাজের (Practice) মাধ্যমেই জ্ঞান সত্য প্রমাণিত হয়।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ:
যখন দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ-এর নিয়মগুলোকে মানব সমাজের ইতিহাস ও অর্থনীতির ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism) বলা হয়। মার্কস দেখিয়েছেন মানব সমাজ প্রধানত ৫টি পর্যায় অতিক্রম করেছে:
| সমাজ ব্যবস্থা | উৎপাদন সম্পর্ক ও মূল দ্বন্দ | পরিবর্তনের কারণ |
| ১. আদিম সাম্যবাদ (Primitive Communism) | ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা শ্রেণী ছিল না। শিকার ও ফলমূল সংগ্রহের উপকরণ ছিল যৌথ। | মেধা ও ব্যক্তিগত যন্ত্রপাতির বিকাশে উদ্বৃত্ত উৎপাদন শুরু হয়, যা ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম দেয়। |
| ২. দাস সমাজ (Slavery System) | মালিক বনাম দাস। দাসরা ছিল মালিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। | দাস বিদ্রোহ এবং দাসভিত্তিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় নতুন ব্যবস্থার জন্ম হয়। |
| ৩. সামন্তবাদ (Feudalism) | জমিদার/সামন্তপ্রভু বনাম ভূমিদাস। ভূমির ওপর সামন্তপ্রভুর পূর্ণ অধিকার। | শিল্প বিপ্লব, বাণিজ্যিক পুঁজির বিকাশ ও সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়াদের উত্থান। |
| ৪. পুঁজিবাদ (Capitalism) | পুঁজিপতি (বুর্জোয়া) বনাম মজুরিভিত্তিক শ্রমিক (প্রোলেতারিয়েত)। কারখানার মালিকানা পুঁজিপতির। | শ্রমিকদের চরম শোষণ, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এবং শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত বৈপ্লবিক সংগ্রাম। |
| ৫. সমাজতন্ত্র/সাম্যবাদ (Socialism/Communism) | উৎপাদনের উপায় জনগণের বা রাষ্ট্রের অধীনে। বৈষম্যহীন ও শ্রেণীহীন সমাজ। | দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের চূড়ান্ত পর্যায়; শোষণ ও শ্রেণী বৈষম্যের সম্পূর্ণ বিলোপ। |
মূল শিক্ষা:
মার্কসীয় দর্শন অনুসারে, এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে এই উত্তরণ কোনো হঠাৎ ঘটা ঘটনা নয়। প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থার ভেতরেই তার পতনের বীজ (বিপরীত শক্তির দ্বন্দ) লুকিয়ে থাকে। পরিমাণগত শোষণ ও বৈষম্য বাড়তে বাড়তে একসময় বৈপ্লবিক গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সমাজ ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
আধুনিক বিশ্বে কেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ প্রাসঙ্গিক?
অনেকে মনে করেন আধুনিক প্রযুক্তি বা পুঁজিবাদের যুগে এই তত্ত্ব পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন:
- পরিবেশ সংকট: জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মম অত্যাচার মূলত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই এক বিপরীত ফল।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য: ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বিশ্বজুড়ে যেভাবে বাড়ছে, তা মার্কসের শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্বকেই পুনরায় সত্য প্রমাণিত করে।
- প্রযুক্তির অগ্রগতি: অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কীভাবে সাধারণ শ্রমিকের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, তা পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত সংকট সৃষ্টির উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
উপসংহার (Conclusion):
পরিশেষে বলা যায়, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো শুকনো তত্ত্ব বা জমানো কাল্পনিক ধারণা নয়। এটি হলো প্রকৃতি, মানব সমাজ এবং অর্থনীতির গতিপথ ও বিবর্তন বোঝার জন্য এক অনন্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলসের এই মহান দর্শন আমাদের শেখায় যে সমাজে বিদ্যমান শোষণ, অন্যায় কিংবা অর্থনৈতিক বৈষম্য চিরস্থায়ী হতে পারে না।
বিশ্বের যেকোনো কাঠামোর ভেতরের দ্বান্দ্বিক বিরোধিতা ও সংঘর্ষই একসময় পুরনোকে বাতিল করে নতুন ও উন্নত ব্যবস্থার জন্ম দেয়। বর্তমান একুশ শতকের অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ বিশ্লেষণ করতেও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আপনি যদি আজকের জটিল আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে চান এবং বৈষম্যহীন এক নতুন সমাজ গঠনের পথ সন্ধান করতে চান, তবে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের চেয়ে ধারালো বিশ্লেষণাত্মক হাতিয়ার আর দ্বিতীয়টি নেই।
আরো পড়ুন: কৌটিল্যের রাষ্ট্রতত্ত্ব:
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর:
১. কার্ল মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism) কী?
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হলো কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলসের দর্শনের মূল ভিত্তি। এটি দেখায় যে দৃশ্যমান বস্তু বা পদার্থই প্রাথমিক, এবং বস্তুর ভেতরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিপরীতমুখী শক্তির সংঘাতের মাধ্যমেই প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার বিকাশ ঘটে।
২. দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল ৩টি নিয়ম বা সূত্র কী কী?
- বিপরীত বস্তুর ঐক্য ও সংগ্রাম: প্রতিটি বস্তুর ভেতরে দুটি বিপরীত শক্তি থাকে এবং তাদের সংঘাতই গতির সৃষ্টি করে।
- পরিমাণগত থেকে গুণগত পরিবর্তন: ছোট ছোট পরিবর্তন জমতে জমতে হঠাৎ বড় ধরনের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
- নেতির নেতিকরণ: নতুন ব্যবস্থা পুরনোকে বাতিল করে, কিন্তু তার ইতিবাচক অংশ গ্রহণ করে আরও উন্নত রূপ নেয়।
৩. হেগেলের দ্বন্দ্ববাদের সাথে মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের পার্থক্য কী?
হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ ছিল ভাববাদী (Idealist)—তিনি মনে করতেন চিন্তা বা পরম আত্মা বিশ্ব চালায়। মার্কস হেগেলের দ্বন্দ্ববাদী পদ্ধতি গ্রহণ করলেও ভাববাদ বাতিল করে তা বস্তুর ওপর প্রয়োগ করেন। মার্কসের মতে, অর্থনৈতিক ও বস্তুগত বাস্তবতাই মানুষের চেতনা নির্ধারণ করে।
৪. ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ (Historical Materialism) কী?
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে যখন মানব সমাজের ইতিহাস ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন তাকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলা হয়। এটি দেখায় যে উৎপাদনের উপায় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনই ইতিহাসকে পরিচালনা করে।
৫. মার্কসের মতে ইতিহাস ও সমাজের ৫টি পর্যায় কী কী?
- আদিম সাম্যবাদ (Primitive Communism)
- দাস সমাজ (Slavery System)
- সামন্তবাদ (Feudalism)
- পুঁজিবাদ (Capitalism)
- সমাজতন্ত্র/সাম্যবাদ (Socialism/Communism)
৬. ‘বুর্জোয়া’ এবং ‘প্রোলেতারিয়েত’ বলতে কী বোঝায়?
- বুর্জোয়া (Bourgeoisie): পুঁজিবাদী সমাজের ধনী শ্রেণী বা শিল্পকারখানার মালিক, যারা উৎপাদনের উপকরণের অধিকারী।
- প্রোলেতারিয়েত (Proletariat): মজুরিভিত্তিক শ্রমিক শ্রেণী, যাদের নিজেদের কোনো কারখানা বা জমি নেই এবং শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
৭. শ্রেণী সংগ্রাম (Class Struggle) কী এবং কেন হয়?
শ্রেণী সংগ্রাম হলো শোষক ও শোষিত শ্রেণীর মধ্যকার স্বার্থের দ্বন্দ্ব। পুঁজিবাদে বুর্জোয়ারা মুনাফা বাড়াতে শ্রমিকদের শোষণ করে, আর শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার চায়—এই বিপরীতমুখী স্বার্থের সংঘাতই হলো শ্রেণী সংগ্রাম।
৮. “হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ মাথার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল…”—এই উক্তির অর্থ কী?
হেগেল মনে করতেন বস্তু নয়, বরং ‘চিন্তা’ থেকে জগতের সৃষ্টি। মার্কস এই ধারণাকে উল্টো বা অস্বাভাবিক মনে করতেন। তাই তিনি হেগেলের দ্বন্দ্ববাদকে ভাববাদের আকাশ থেকে নামিয়ে বস্তুর বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।
৯. আদিম সাম্যবাদে কোনো শ্রেণী দ্বন্দ্ব ছিল না কেন?
আদিম সাম্যবাদে ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সবাই মিলে শিকার করত এবং খাবার ভাগ করে খেত। উৎপাদনের কোনো উদ্বৃত্ত বা মালিকানা না থাকায় সেখানে শোষক ও শোষিত শ্রেণীর জন্ম হয়নি।
১০. আধুনিক যুগে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কেন প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্য, পুঁজিবাদী সংকট, শ্রমিক-মালিক বিরোধ এবং জলবায়ু সংকটের মতো জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করতে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ আজও বিজ্ঞানসম্মত ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।