ভূমিকা:
স্বাধীন ভারতের সর্বাঙ্গীন বিকাশ ও উন্নয়ন কেবল বড় বড় মেট্রোপলিটন শহর কিংবা রাজধানী কেন্দ্রিক নীতি নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে না; বরং তার প্রকৃত মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তিক গ্রামে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ভারতে উদ্ভব ঘটেছিল পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা নামক অনন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে মহাত্মা গান্ধীর ‘গ্রাম স্বরাজ’-এর স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে এই পঞ্চায়েতি শাসন ব্যবস্থা এক অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে। এটি কেবল কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কোনো সাধারণ আঞ্চলিক প্রশাসনিক সমিতি নয়, বরং ক্ষমতার চরম বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রের শাসনভারকে একদম সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার এক দূরদর্শী মাস্টারপ্ল্যান।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের এই বিশাল বৈচিত্র্যময় দেশে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের পক্ষে প্রতিটি গ্রামের অতি সূক্ষ্ম স্থানীয় সমস্যা যেমন—পানীয় জলের সঙ্কট, কাঁচা রাস্তা সংস্কার, প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কিংবা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলি সরাসরি তদারকি করা কার্যত অসম্ভব। এই বিশাল শূন্যতা পূরণেই পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা তৈরি করেছে তৃণমূল স্তরের স্বায়ত্তশাসন। গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হতে পারেন, নিজেদের অগ্রাধিকার নিজেরা স্থির করতে পারেন এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান স্থানীয় সম্পদ ও বুদ্ধিমত্তা দিয়েই সম্পন্ন করতে পারেন—সেই মহান উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থার জন্ম। আজকের এই বিস্তর ও তথ্যভিত্তিক নিবন্ধে আমরা ভারতে এই ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ, বিভিন্ন কমিটি, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, তিন-স্তরের পরিকাঠামো এবং এর মূল তাৎপর্য বিশ্লেষণ করব।

পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কী এবং এর মূল উদ্দেশ্য:
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা হলো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন (Local Self-Government) ব্যবস্থার এমন একটি আধুনিক রূপ, যার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামাজিক শাসনকার্য পরিচালিত হয়। সহজ কথায়, গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেদের মধ্য থেকে স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা গ্রামের রাস্তাঘাট, জল সরবরাহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিচালনা করেন।
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ:
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization of Power): কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সরাসরি সাধারণ মানুষের স্তরে স্থানান্তর করা।
- গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ: প্রতিটি নাগরিককে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।
- স্থানীয় সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান: গ্রামের পানীয় জল, বৈদ্যুতিক আলো, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির মতো স্থানীয় জটিলতার দ্রুত সমাধান করা।
- সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা: সমাজের অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
- আত্মনির্ভরশীল গ্রাম গঠন: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে প্রতিটি গ্রামকে একটি স্বাবলম্বী ইউনিটে পরিণত করা।
ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি:
ভারতে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক স্বাধীন ভারত পর্যন্ত এটি বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
আরো পড়ুন: ভারতের পরিবহন ব্যবস্থা:
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারত:
প্রাচীন ভারতের বৈদিক যুগে ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ নামে গ্রাম ভিত্তিক পরিষদের অস্তিত্ব ছিল। কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এ গ্রামের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ‘গ্রামণী’ বা ‘গ্রামিক’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে চোল রাজাদের শাসনামলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা সবচেয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
ব্রিটিশ শাসনকাল ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন:
ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়লেও, ১৮৮২ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড রিপন (Lord Ripon) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এই যুগান্তকারী পদক্ষেেপের কারণেই লর্ড রিপনকে “ভারতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার জনক” (Father of Local Self-Government in India) বলা হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলন ও মহাত্মা গান্ধীর ‘গ্রাম স্বরাজ’:
স্বাধীনতার পূর্বে মহাত্মা গান্ধী গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, “প্রকৃত ভারত তার সাত লক্ষ গ্রামের মধ্যেই বাস করে।” তিনি গ্রামের আত্মনির্ভরশীলতার ওপর জোর দিয়ে ‘গ্রাম স্বরাজ’-এর ধারণার প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণেতারা নির্দেশাত্মক নীতির (Directive Principles of State Policy) অধীনে সংবিধানে ৪০ নং অনুচ্ছেদে (Article 40) রাজ্যগুলোকে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠনের স্পষ্ট নির্দেশ দেন।
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার বিবর্তনে প্রধান কমিটিসমূহ:
স্বাধীন ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কাঠামোগত রূপ দেওয়ার জন্য ভারত সরকার সময়ে সময়ে বেশ কয়েকটি নীতি-নির্ধারক কমিটি গঠন করেছিল:

বলবন্ত রাই মেহতা কমিটি (১৯৫৭):
- সুপারিশ: গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ভারতে ত্রি-স্তর বিশিষ্ট (Three-tier) পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালুর কথা বলে।
- ফলাফল: ১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর রাজস্থানের নাগৌর জেলায় ভারতের প্রথম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু।
অশোক মেহতা কমিটি (১৯৭৭):
- সুপারিশ: ত্রি-স্তরের পরিবর্তে দ্বি-স্তর (মন্ডল পঞ্চায়েত ও জিলা পরিষদ) পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সুপারিশ করে। তবে এই সুপারিশ বাস্তবে গৃহীত হয়নি।
জি. ভি. কে. রাও কমিটি (১৯৮৫):
- সুপারিশ: পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ওপর থেকে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমিয়ে এটিকে স্থানীয় উন্নয়ন মূলক কাজের প্রধান সংস্থায় পরিণত করার তাগিদ দেয়।
এল. এম. সিংভি কমিটি (১৯৮৬):
- সুপারিশ: পঞ্চায়েত সংস্থাসমূহকে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার জন্য ঐতিহাসিক সুপারিশ করে, যা পরবর্তীতে আইনের রূপ নেয়।
৭৩তম সংবিধান সংশোধনী (১৯৯২): সাংবিধানিক স্বীকৃতি:
১৯৯২ সালে পাস হওয়া ৭৩তম সংবিধান সংশোধনী আইন ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-কে একটি বাধ্যতামূলক ও সাংবিধানিক কাঠামো দান করে। ১৯৯৩ সালের ২৪ এপ্রিল এই আইনটি সারা দেশে কার্যকর হয়। তাই প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল ‘জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
৭৩তম সংশোধনীর প্রধান সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- সংবিধানে Part IX এবং 11th Schedule (একাদশ তফসিল) যুক্ত করা হয়, যেখানে পঞ্চায়েতের দায়িত্বে ২৯টি নির্দিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- সমস্ত রাজ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ত্রি-স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েত কাঠামো স্থাপন করা।
- প্রতি ৫ বছর পর পর নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান।
- মহিলাদের জন্য অন্তত ৩৩% (১/৩ অংশ) আসন সংরক্ষণ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গসহ বহু রাজ্যে এটি ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে)।
- জনসংখ্যা অনুপাতে তপশিলি জাতি (SC) ও তপশিলি উপজাতিদের (ST) জন্য আসন সংরক্ষণ।
- প্রতিটি রাজ্যে পঞ্চায়েতের আর্থিক সংস্থানের জন্য ‘রাজ্য অর্থ কমিশন’ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ‘রাজ্য নির্বাচন কমিশন’ গঠন।
ত্রি-স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার পরিকাঠামো:
ভারতের পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা মূলত ৩টি মূল প্রশাসনিক স্তরে বিভক্ত, যা গ্রামীণ জনগণকে তৃণমূল স্তর থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত সংযুক্ত করে:
| স্তর | প্রশাসনিক পর্যায় | জনপ্রতিনিধি প্রধান | প্রশাসনিক কর্মকর্তা |
| ১. গ্রাম পঞ্চায়েত | গ্রাম স্তর (Bottom Level) | প্রধান / সভাপতি | পঞ্চায়েত সচিব (Secretary) |
| ২. পঞ্চায়েত সমিতি | ব্লক স্তর (Middle Level) | সভাপতি | বি.ডি.ও (BDO) |
| ৩. জেলা পরিষদ | জেলা স্তর (Top Level) | সভাধিপতি | ডি.এম (DM) / ডি.ই.ও (DEO) |
গ্রাম পঞ্চায়েত (Village Level):
এটি পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কয়েক হাজার জনসংখ্যা বিশিষ্ট এলাকা নিয়ে এক-একটি গ্রাম পঞ্চায়েত গঠিত হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানকে ‘প্রধান’ বা ‘সারপঞ্চ’ বলা হয়। গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটারদের নিয়ে গঠিত হয় ‘গ্রাম সভা’, যা তৃণমূল গণতন্ত্রের সরাসরি রূপ।
পঞ্চায়েত সমিতি (Block Level):
কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত হয় এক-একটি ব্লক বা পঞ্চায়েত সমিতি। এটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং জেলা পরিষদের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করে। এই স্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রধানকে ‘সভাপতি’ বলা হয় এবং সরকারি অফিসার হিসেবে ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক (BDO) দায়িত্ব সামলান।
জেলা পরিষদ (District Level):
এটি পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর। একটি জেলার পুরো গ্রামাঞ্চল এর প্রশাসনিক আওতাভুক্ত। জেলা পরিষদের প্রধানকে ‘সভাধিপতি’ বলা হয় এবং জেলার জেলাশাসক (DM) বা একজন সিনিয়র আই.এ.এস (IAS) অফিসার এর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আরো পড়ুন: ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা:
পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ৭টি যুগান্তকারী ও মাস্টারপ্ল্যান নীতি:
১. তৃণমূল গণতন্ত্রের বাস্তবায়ন: রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ভেঙে সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটায়।
2. নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব: আসন সংরক্ষণের ফলে কোটি কোটি নারী রাজনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রণী ভূমিকা পাচ্ছেন।
3. পরিকল্পিত গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন: গ্রামীন রাস্তাঘাট, পাকা বাড়ি, সুপেয় জল, প্রাথমিক শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্র সরাসরি পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
4. স্বচ্ছতা ও গ্রাম সভার কার্যকারিতা: ‘গ্রাম সভা’-র মাধ্যমে প্রকল্পের বাজেট ও কাজের জবাবদিহিতা সাধারণ নাগরিকদের কাছে নিশ্চিত করা হয়।
5. কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণ: ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA)-এর মতো জাতীয় প্রকল্পসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়নের মূলেই রয়েছে পঞ্চায়েত।
৬. সামাজিক সমতা সুরক্ষাসমূহ: পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে স্বায়ত্তশাসনের মূল স্রোতে শামিল করার সাংবিধানিক সুযোগ।
৭. আর্থিক ক্ষমতার স্বায়ত্তশাসন: স্থানীয় কর আদায় ও সরকারি গ্রান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক সমাধান:
সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান ভারতে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় কিছু জটিল বাধা বিদ্যমান:
প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:
- আর্থিক সংকট: নিজস্ব কর বা রাজস্ব আদায়ের পর্যাপ্ত উৎস না থাকায় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের অনুদানের ওপর চরম নির্ভরতা।
- আমলাতান্ত্রিক লালফিতার ফাঁস: সরকারি আমলাদের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের কারণে স্থানীয় সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।
- শিক্ষার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব: গ্রামীণ এলাকায় সঠিক রাজনৈতিক সচেতনতার অভাবে স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ দলীয় রাজনীতির শিকার হয়।
সমাধানের কার্যকরী উপায়:
- পঞ্চায়েতগুলোকে নিজস্ব রাজস্ব (ট্যাক্স, ফি) আদায়ের বাড়তি আইনি ক্ষমতা প্রদান করা।
- নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক কাজের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া।
- ই-পঞ্চায়েত (e-Panchayat) ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতি ও অনলাইন মনিটরিং নিশ্চিত করা।
উপসংহার
সামগ্রিক বিচারে বলা চলে, ভারতের মতো বিশাল জনবহুল ও সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কেবল একটি প্রশাসনিক অঙ্গ নয়, এটি হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল জীবনরেখা। দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমা, একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ এবং পরিশেষে ১৯৯২ সালের ৭৩তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এটি আজ যে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে, তা সমগ্র বিশ্বে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের অন্যতম বৃহৎ উদাহরণ। স্বায়ত্তশাসনের এই ধারা গ্রাম কেন্দ্রিক সামাজিক বৈষম্য হ্রাস করতে, নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখে ভাষা ফোটাতে অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে।
তবে এটিও অনস্বীকার্য যে, শতভাগ সাফল্য অর্জনের পথে এখনো আর্থিক সক্ষমতার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলি অতিক্রম করার জন্য পঞ্চায়েতগুলিকে আরও বেশি আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান, ডিজিটাইজেশন বা ‘ই-পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থার সার্বিক প্রসার এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনায় জোর দেওয়া প্রয়োজন। গ্রাম উন্নত না হলে ভারতবর্ষের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়—মহাত্মা গান্ধীর এই চিরন্তন বাক্যটিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-কে সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি শক্তিশালী, আধুনিক ও অর্থবহ করে তোলা অপরিহার্য।
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সাধারণ প্রশ্নাবলী (Top 20 FAQs):
১. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কী?
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা হলো ভারতের গ্রামীণ এলাকার জন্য গঠিত এক ধরণের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে গ্রামের মানুষ নিজেরাই নিজেদের উন্নয়ন ও শাসন পরিচালনা করতে পারেন।
২. ভারতে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কী?
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা চালুর প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূল স্তরে সাধারণ মানুষের সরাসরি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৩. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার জনক কে?
ব্রিটিশ ভারতে ১৮৮২ সালে লর্ড রিপন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের যে ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাশ করেন, সেই কারণে তাকে ভারতে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের জনক বলা হয়।
৪. স্বাধীন ভারতে প্রথম কোথায় পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা চালু করা হয়?
১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর রাজস্থানের নাগৌর জেলায় স্বাধীন ভারতের প্রথম পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
৫. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সংবিধানে কোন অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে?
ভারতীয় সংবিধানের ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে (Article 40) রাজ্যগুলোকে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা বা গ্রাম পঞ্চায়েত গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৬. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা কত সালে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়?
১৯৯২ সালের ৭৩তম সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে।
৭. জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল তারিখে জাতীয় পঞ্চায়েতি রাজ দিবস পালিত হয়, কারণ ১৯৯৩ সালের এই দিনে ৭৩তম সংবিধান সংশোধনী আইন সারা দেশে কার্যকর হয়েছিল।
৮. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার ৩টি স্তর কী কী?
ভারতে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা মূলত ৩টি স্তরে বিভক্ত:
- গ্রাম স্তর: গ্রাম পঞ্চায়েত
- ব্লক স্তর: পঞ্চায়েত সমিতি
- জেলা স্তর: জেলা পরিষদ
৯. বলবন্ত রাই মেহতা কমিটি কেন বিখ্যাত?
১৯৫৭ সালে গঠিত বলবন্ত রাই মেহতা কমিটি প্রথম ভারতে ৩ স্তর বিশিষ্ট পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সুপারিশ করেছিল।
১০. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার অধীনে ভারতীয় সংবিধানে মোট কয়টি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে?
সংবিধানের একাদশ তফসিলে (11th Schedule) পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা পরিচালন ও স্থানীয় উন্নয়নের জন্য ২৯টি বিষয় নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
১১. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সর্বনিম্ন বয়স কত?
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-র যেকোনো স্তরে প্রার্থী হওয়ার জন্য সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ২১ বছর।
১২. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সংবিধানে কত নম্বর অংশে (Part) যুক্ত করা হয়েছে?
ভারতীয় সংবিধানের পার্ট IX (Part 9)-এ পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মাবলী সংযোজিত হয়েছে।
১৩. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য কত আসন সংরক্ষিত থাকে?
সংবিধান অনুসারে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-য় মহিলাদের জন্য অন্তত ৩৩% (১/৩ অংশ) আসন সংরক্ষিত থাকা বাধ্যতামূলক। তবে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ একাধিক রাজ্যে এটি ৫০% পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
১৪. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদ কত বছর?
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও বোর্ডের কার্যকালের সাধারণ মেয়াদ হলো ৫ বছর।
১৫. মেয়াদের আগেই পঞ্চায়েত ভেঙে গেলে কত দিনের মধ্যে নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক?
মেয়াদের পূর্বে পঞ্চায়েত ভেঙে দেওয়া হলে পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন সম্পন্ন করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।
১৬. পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার নির্বাচন পরিচালনা কে করে?
প্রতিটি রাজ্যের নিরপেক্ষ ‘রাজ্য নির্বাচন কমিশন’ (State Election Commission) পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-র নির্বাচন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।
১৭. অশোক মেহতা কমিটি কয়টি স্তরের পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল?
১৯৭৭ সালের অশোক মেহতা কমিটি ৩ স্তরের পরিবর্তে ২ স্তর বিশিষ্ট (মন্ডল পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদ) পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল।
১৮. কোন কমিটি প্রথম পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়ার কথা বলে?
১৯৮৬ সালের এল. এম. সিংভি কমিটি (L.M. Singhvi Committee) প্রথম পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
১৯. গ্রাম সভা এবং পঞ্চায়েতের মধ্যে পার্থক্য কী?
গ্রাম পঞ্চায়েতের সমস্ত নিবন্ধিত ভোটারদের নিয়ে গঠিত সংস্থাই হলো ‘গ্রাম সভা’, আর ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘গ্রাম পঞ্চায়েত’।
২০. পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান প্রশাসনিক অফিসার কে হন?
পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা-র দ্বিতীয় স্তর অর্থাৎ ব্লক স্তরের পঞ্চায়েত সমিতির সরকারি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলান ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক বা বি.ডি.ও (BDO)।