হরপ্পার নগর পরিকল্পনা: 15 Amazing Features & Ultimate History Guide.
ভূমিকা:
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ব্রোঞ্জ যুগের এই সভ্যতার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো হরপ্পার নগর পরিকল্পনা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০-১৯০০ অব্দে) সিন্ধু নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা শহরগুলোর স্থাপত্য ও নগর বিন্যাস আধুনিককালের পরিকল্পিত শহরের সাথে তুলনীয়। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, কালিবঙ্গান এবং ধোলাভিড়ার মতো শহরগুলোতে যে উন্নত নগর কাঠামো, সুসংহত রাস্তাঘাট, সুনির্দিষ্ট পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তা প্রত্নতাত্ত্বিকদের আজও বিস্মিত করে।
প্রাচীন সমসাময়িক সভ্যতা যেমন মিসর বা মেসোপটেমিয়ার স্থাপত্যে পিরামিড বা প্রাসাদের মতো বৃহৎ ধর্মীয় ও রাজকীয় কীর্তির প্রাধান্য থাকলেও, হরপ্পার নগর বিন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছিল নাগরিক সুবিধা, জনস্বাস্থ্য এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে তো বটেই, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা (যেমন: WBCS, UPSC, SSC CGL/CHSL, Railway NTPC, Group D, PSC Clerkship ও School Service Commission)-এর ইতিহাসের প্রাচীন ভারত অংশ থেকে এই বিষয় সংক্রান্ত প্রশ্ন প্রায় বাধ্যতামূলকভাবে আসে। আজকের এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা হরপ্পা সভ্যতার নগর কাঠামোর বিভিন্ন দিক, অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব।
আরো পড়ুন: বৈদিক সভ্যতা ও বৈদিক সাহিত্য

দ্বি-বিভক্ত শহর ব্যবস্থা (Citadel and Lower Town)
হরপ্পা সভ্যতার অধিকাংশ নগর প্রধানত দুটি সুস্পষ্ট অংশে বিভক্ত ছিল। এই ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিভাজন হরপ্পীয়দের উন্নত সামাজিক কাঠামোর পরিচয় বহন করে।
- দূর্গ বা সিটাডেল (The Citadel):
- শহরের পশ্চিম দিকে অপেক্ষাকৃত উঁচু কাদা-ইটের তৈরি মঞ্চের (Platform) ওপর সিটাডেল বা দুর্গ অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছিল।
- এটি সুরক্ষাপ্রাচীর বা শক্ত দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত ছিল।
- ধারণা করা হয়, শাসকশ্রেণী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পুরোহিত সম্প্রদায় এই উঁচু অংশে বসবাস করতেন। প্রশাসনিক ভবন, শস্যগোলা এবং বৃহৎ স্নানাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ইমারতগুলো সিটাডেল চত্বরেই নির্মিত হতো।
- নিম্ন নগর বা নিচু শহর (The Lower Town):
- সিটাডেলের পূর্ব দিকে এবং অপেক্ষাকৃত নিচু সমতল স্থানে বিশাল নিম্ন নগর বিস্তৃত ছিল।
- এখানে সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী, কারিগর এবং শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের বসতি ছিল। এই অংশটিও সুনির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী বিভক্ত ও সাজানো ছিল।
গ্রিড প্রথা ও চওড়া রাস্তাঘাট (Grid System Roads)
হরপ্পীয় নগর নির্মাণের ভিত্তি ছিল সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশা বা গ্রিড প্রথা (Grid Pattern)।
- রাস্তার দিক ও জ্যামিতি: শহরের প্রধান প্রধান রাস্তাগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে একে অপরকে সমকোণে (৯০ ডিগ্রি কোণে) ছেদ করত। এর ফলে পুরো শহরটি কতগুলো আয়তাকার বা বর্গাকার ব্লকে (Grid Blocks) বিভক্ত হয়ে যেত।
- রাস্তার প্রশস্ততা: প্রধান রাস্তাগুলো যথেষ্ট চওড়া ছিল, যা প্রায় ৯ থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হতো। মহেঞ্জোদারোর প্রধান রাজপথটি প্রায় ৩৩ ফুট প্রশস্ত ছিল, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ‘গ্র্যান্ড হাইওয়ে’ বলে অভিহিত করেছেন।
- কোণ গোলাকারকরণ ও বাঁক: রাস্তার মোড়গুলোতে ইটের কোণগুলো সামান্য গোলাকার করা থাকত, যাতে মালামাল বোঝাই গরুর গাড়ি বা যানবাহন সহজে বাঁক নিতে পারে।
- পথবাতির ব্যবস্থা: রাস্তার মোড়ে মোড়ে ল্যাম্পপোস্ট বা পথবাতির মতো স্তম্ভের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা রাতের বেলা আলো জ্বালানোর ইঙ্গিত দেয়।
পয়ঃপ্রণালী ও উন্নত জলনিকাশি ব্যবস্থা (Drainage System)
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, হরপ্পার নগর পরিকল্পনা-র সর্বাপেক্ষা বিস্ময়কর এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর আধুনিক ও সুসংহত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা। প্রাচীন বিশ্বের আর কোনো সভ্যতায় জনস্বাস্থ্যের প্রতি এত নজর দেখা যায়নি।
- পরিকল্পিত ড্রেন: প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘর ও স্নানাগার থেকে নোংরা জল ছোট নালীর মাধ্যমে বেরিয়ে এসে রাস্তার প্রধান ঢাকা ড্রেনে (Main Drain) মিশত।
- পাকা ইটের ব্যবহার: ড্রেনগুলো পোড়ামাটির ইট এবং চুন-সুরকি দিয়ে শক্তভাবে তৈরি করা হতো।
- ঢাকনা ও ম্যানহোল (Manholes): নর্দমাগুলো খোলামেলা ছিল না; বড় বড় পাথরের স্ল্যাব বা পোড়া ইট দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা হতো। নর্দমা পরিষ্কার ও পলল (Silt) অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে ড্রেন ইন্সপেকশন পিট বা ম্যানহোলের ব্যবস্থা ছিল।
- সোয়ারেজ ব্যবস্থাপনা: গৃহস্থালীর কঠিন বর্জ্য আটকানোর জন্য সোয়াক পিট বা সাম্প (Sump) ব্যবহার করা হতো, যাতে প্রধান ড্রেনে জলপ্রবাহ আটকে না যায়।
গৃহনির্মাণ স্থাপত্য ও পোড়া ইটের ব্যবহার (Housing Architecture)
হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের আবাসিক বাড়িগুলোর গঠন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং উপযোগিতানির্ভর।
- পোড়া ইটের ব্যবহার: মেসোপটেমিয়ার মতো সভ্যতায় রোদে শুকানো কাঁচা ইট বেশি ব্যবহৃত হলেও, হরপ্পীয়রা গৃহনির্মাণে প্রচুর পরিমাণে আগুনে পোড়ানো ইট (Burnt Bricks) ব্যবহার করত। ইটের দৈঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার অনুপাত ছিল নির্দিষ্ট—৪:২:১।
- আঙিনা বা উঠোন কেন্দ্রিক বাড়ি: গৃহের মূল কেন্দ্রে থাকত একটি উন্মুক্ত উঠোন (Courtyard)। উঠোনকে ঘিরে চারপাশে থাকার ঘর, রান্নাঘর ও স্নানাগার তৈরি করা হতো।
- একই সাথে গোপনীয়তা ও বায়ু চলাচল:
- রাস্তার দিকে সরাসরি কোনো জানালা খোলা হতো না। বাইরের ধুলোবালি ও শোরগোল এড়াতে এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে ঘরের দরজা-জানালা ভেতরের গলি বা উঠোনের দিকে মুখ করে রাখা হতো।
- প্রধান রাস্তা থেকে সরাসরি বাড়ির ভেতরের অংশ দেখা যেত না।
- বহুতল ভবন: কাদা-ইট ও কাঠের সিঁড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায় যে, অনেক বাড়িই দোতলা বা বহুতলবিশিষ্ট ছিল।
মহেঞ্জোদারোর বৃহৎ স্নানাগার (The Great Bath)
মহেঞ্জোদারোর সিটাডেল অঞ্চলে আবিষ্কৃত বৃহৎ স্নানাগার হরপ্পা স্থাপত্যের প্রকৌশলগত দক্ষতার এক অসামান্য নিদর্শন।
- আয়তন ও গঠন: এই স্নানাগারটির বহিরাংশের পরিমাপ ১৮০ ফুট × ১০৮ ফুট। এর কেন্দ্রে থাকা মূল জলাশয়টি (Pool) ৩৯ ফুট দীর্ঘ, ২৩ ফুট চওড়া এবং ৮ ফুট গভীর।
- জলনিরোধক স্তর (Waterproofing): জলাশয়ের দেয়াল ও মেঝে পোড়া ইট দিয়ে তৈরি এবং জল চুইয়ে পড়া বন্ধ করতে ইটের জোড়ায় প্রাকৃতিক পিচ বা অ্যাসফাল্ট (Bitumen) এবং জিপসামের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল।
- জল সরবরাহ ও নিষ্কাশন: জলাশয়ে পরিষ্কার জল ভরার জন্য পাশে একটি ইঁট-বাঁধানো কুয়ো ছিল। ব্যবহৃত নোংরা জল বের করে দেওয়ার জন্য একটি বিশাল খিলানযুক্ত ড্রেন (Arched Drain) ছিল।
- পরিবর্তন কক্ষ: জলাশয়ের তিন দিকে ছোট ছোট ঘর ছিল, যা পোশাক পরিবর্তনের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয়। সম্ভবত কোনো ধর্মীয় বা আচার-ানুষ্ঠানিক স্নানের জন্য এটি ব্যবহৃত হতো।
হরপ্পার বৃহৎ শস্যগোলা (The Great Granary)
খাদ্যশস্য সঞ্চয় ও তা সুসংহতভাবে সংরক্ষণের জন্য হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো উভয় শহরের সিটাডেলে বিশালাকার শস্যগোলা নির্মিত হয়েছিল।
- হরপ্পার শস্যগোলা: হরপ্পায় দুটি সারিতে মোট ১২টি শস্যগোলা দেখা যায়, যা একটি ইটের তৈরি উচ্চ মঞ্চের ওপর নির্মিত ছিল।
- বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা (Ventilation): শস্য যাতে ভেজা বাতাসের কারণে পচে না যায় বা পোকা না ধরে, সেজন্য শস্যগোলার মেঝেতে বাতাস চলাচলের (Air-ducts) জন্য সুনির্দিষ্ট খাঁজ বা ফাঁক রাখা হয়েছিল।
- শস্য মাড়াইয়ের চাতাল: শস্যগোলার কাছেই গোল ইটের চাতাল বা মঞ্চ পাওয়া গেছে, যেখানে গম ও বার্লি মাড়াই করার প্রমাণ মিলেছে।
- প্রশাসনিক গুরুত্ব: ধারণা করা হয়, শস্যগোলাগুলোতে সংগৃহীত শস্য জরুরি অবস্থার জন্য বা রাষ্ট্রীয় কর (Tax) হিসেবে জমা রাখা হতো।
সুপেয় জলের উৎস ও বাঁধানো কুয়ো (Water Supply System)
নগরবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত ও সুপেয় জলের সুব্যবস্থা করা হরপ্পীয় স্থপতিদের একটি বড় সাফল্য ছিল।
- বাড়িভিত্তিক কুয়ো: মহেঞ্জোদারোর প্রায় প্রতিটি বৃহৎ বাড়িতে নিজস্ব ইঁট-বাঁধানো কুয়ো ছিল। অনুমান করা হয় যে কেবল মহেঞ্জোদারো শহরেই প্রায় ৭০০টিরও বেশি কুয়ো বিদ্যমান ছিল।
- পাবলিক ওয়েল (Public Wells): রাস্তার পাশে সাধারণ পথচারী ও নাগরিকদের সুবিধার্থে গণ-কুয়োর ব্যবস্থা ছিল।
- ধোলাভিড়ার জলাধার (Reservoirs of Dholavira): গুজরাতের ধোলাভিড়ায় পাথর কেটে তৈরি বিশালাকার জলাধার বা রিজার্ভার আবিষ্কৃত হয়েছে, যা হরপ্পার দূরদর্শী জল সংরক্ষণ বা ‘Water Harvesting’ পদ্ধতির পরিচয় দেয়।
বাণিজ্য বন্দর ও ডকইয়ার্ড: লোথাল (Lothal Dockyard)
গুজরাটের লোথালে প্রাপ্ত পৃথিবীর প্রাচীনতম কৃত্রিম সামুদ্রিক ডকইয়ার্ড (Dockyard) হরপ্পীয়দের আন্তর্জাতিক নদী ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
- গঠন ও প্রকৌশল: পোড়া ইটের তৈরি এই ডকইয়ার্ডটি প্রায় ২১৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৩৭ মিটার চওড়া ছিল।
- জোয়ার-ভাটার ব্যবহার: এটি ভোগাবো (Bhogavo) নদীর সাথে খালের মাধ্যমে যুক্ত ছিল। প্রকৌশলীরা জোয়ারের জল ব্যবহার করে জাহাজ বন্দরে আনতেন এবং ভাটার সময় স্লুইস গেট বন্ধ করে জলের গভীরতা ধরে রাখতেন।
- মেসোপটেমীয় বাণিজ্য: এখান থেকে হরপ্পার ব্যবসায়ীরা পারস্য উপসাগর ও মেসোপটেমিয়ার (স্লোগান: মেলুহা) সাথে প্রত্যক্ষ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করতেন।
প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Fortification)
হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলো কেবল বাসযোগ্যই ছিল না, বাহ্যিক আক্রমণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ (যেমন প্লাবন) থেকে সুরক্ষার জন্য দুর্গপ্রাচীরে আবৃত ছিল।
- সুরক্ষাপ্রাচীর: সিটাডেল অঞ্চল তো বটেই, এমনকি অনেক শহরে পুরো নিম্ন নগরটিই বিশাল কাদা-ইট ও পাথরের প্রকাণ্ড প্রাচীর দিয়ে ঘেরা থাকত।
- প্রবেশদ্বার ও ওয়াচ টাওয়ার: প্রাচীরের নির্দিষ্ট দূরত্বে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার (Watch Towers) এবং পাহারা দেওয়া প্রবেশদ্বার (Gated Entrances) ছিল।
- বন্যা প্রতিরোধক বেষ্টনী: সিন্ধু ও তার উপনদীগুলোর বার্ষিক বন্যা থেকে শহরকে রক্ষা করতে নদীর তীর ঘেঁষে উঁচু ইটের বাঁধ ও প্লাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল।
কাঁচামাল ও স্থানীয় ইটের বৈচিত্র্য
হরপ্পীয় স্থপতিরা অঞ্চলের মেঝের গঠন ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপাদান ব্যবহারে বৈচিত্র্য এনেছিলেন।
- সমতল সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চল (হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো): পলিমাটির প্রাচুর্যের কারণে এখানে রোদে শুকানো এবং পোড়ানো কাঁদা-ইটের ব্যবহারই ছিল প্রধান।
- পাথুরে অঞ্চল (ধোলাভিড়া, সুরকোটডা): গুজরাটের ধোলাভিড়ায় ইটের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে নিখুঁতভাবে কাটা পাথর (Dressed Stones) দুর্গপ্রাচীর ও ভবনে ব্যবহৃত হয়েছিল।
- কালিবঙ্গানের ইটের ধরণ: রাজস্থানের কালিবঙ্গানে সাধারণ আবাসিক বাড়ি তৈরিতে বেশি কাঁচা ইট এবং ড্রেন ও স্নানাগার তৈরিতে পোড়া ইট ব্যবহৃত হতো।
শহরের প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরবিন্যাস
নগর কাঠামোর সুনির্দিষ্ট বিন্যাস দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তৎকালীন হরপ্পীয় সমাজ একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত হতো।
- মানকীকরণ (Standardization): প্রতিটি শহরে ইটের পরিমাপ, ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থা (Weights & Measures), এবং ড্রেনের নকশা একই মানদণ্ডের ছিল।
- নগর পরিচ্ছন্নতা ও আইন: আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা নিষেধ ছিল। রাস্তার পাশে আবর্জনার পাত্র (Dustbins) রাখা থাকত। এতে স্পষ্ট হয় যে একটি কঠোর পৌরসভা বা নগর কর্তৃপক্ষ (Municipal Authority) শহর রক্ষণাবেক্ষণ করত।
কালিবঙ্গান, ধোলাভিড়া ও লোথালের বিশেষ নগর বৈচিত্র্য
যদিও হরপ্পীয় নগর পরিকল্পনায় একটি সার্বিক মিল দেখা যায়, তবুও কয়েকটি নগরে অনন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়:
- ধোলাভিড়া (Dholavira): এটি দুটি অংশের বদলে তিনটি অংশে (Citadel, Middle Town, Lower Town) বিভক্ত ছিল। শহরের চারপাশে সুসংহত জল সংরক্ষণাগার ও বিশাল খেলার মাঠ (Stadium)-এর প্রমাণ মিলেছে।
- কালিবঙ্গান (Kalibangan): এখানে লাঙ্গল দেওয়া জমির প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রতিটি বাড়িতে কাঠের তৈরি নর্দমা এবং কাঠের তৈরি পয়ঃপ্রণালীর নিদর্শন মেলে।
- চানহুদারো (Chanhudaro): এই শহরটিতে কোনো সিটাডেল বা দুর্গ অঞ্চল ছিল না। এটি মূলত একটি কারুশিল্প ও পুতি (Bead-making) তৈরির শিল্পনগরী ছিল।
হরপ্পা সভ্যতার প্রধান নগরসমূহ:
| নগরের নাম | বর্তমান অবস্থান | প্রধান নদী | নগর পরিকল্পনার বিশেষ নিদর্শন |
| হরপ্পা (Harappa) | পাঞ্জাব (পাকিস্তান) | রবি (Ravi) | ১২টি শস্যগোলা, শস্য মাড়াইয়ের চাতাল, কারিগরদের বসতি |
| মহেঞ্জোদারো (Mohenjo-daro) | সিন্ধু (পাকিস্তান) | সিন্ধু (Indus) | বৃহৎ স্নানাগার, বৃহৎ শস্যগোলা, সমকোণে ছেদ করা রাজপথ |
| লোথাল (Lothal) | গুজরাট (ভারত) | ভোগাবো (Bhogavo) | কৃত্রিম পোড়া ইটের ডকইয়ার্ড, ধান চাষের প্রাচীনতম প্রমাণ |
| কালিবঙ্গান (Kalibangan) | রাজস্থান (ভারত) | ঘগ্গর (Ghaggar) | কাঠের তৈরি ড্রেন, চাষ করা জমি, কাদা-ইটের বাড়ি |
| ধোলাভিড়া (Dholavira) | গুজরাট (ভারত) | লুনি (Luni) | ৩টি অংশে বিভক্ত নগর, পাথর কাটা জলসংরক্ষণাগার |
| চানহুদারো (Chanhudaro) | সিন্ধু (পাকিস্তান) | সিন্ধু (Indus) | দুর্গহীন শহর (No Citadel), পুঁতি ও অলংকার তৈরির কারখানা |
কেন হরপ্পার নগর পরিকল্পনা আধুনিক শহরের সমতুল্য?
আধুনিক নগর পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলোর ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়, তার প্রায় প্রতিটি উপাদানই হরপ্পীয় স্থপতিরা হাজার বছর আগেই বাস্তবায়ন করেছিলেন:
- জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা: নর্দমা ঢেকে রাখা এবং ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিনের ব্যবহার আধুনিক পৌর ব্যবস্থার মতোই উন্নত ছিল।
- গ্রিড সিস্টেম: আধুনিক নিউইয়র্ক বা চণ্ডীগড় শহরের মতো গ্রিড প্যাটার্নে রাস্তা ও ব্লকের বিন্যাস।
- পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য: প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা রেখে গৃহনির্মাণ।
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: বন্যা ও ভূমিকম্প প্রতিহত করতে মজবুত প্ল্যাটফর্ম ও মজবুত ভিত্তি নির্মাণ।
আরো পড়ুন: মেসোপটেমিয়া সভ্যতা:
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর:
১. হরপ্পার নগর পরিকল্পনায় শহরের প্রধান দুটি অংশ কী কী ছিল?
উত্তর: উঁচু পশ্চিম অংশ যাকে দুর্গ বা সিটাডেল (Citadel) এবং নিচু পূর্ব অংশ যাকে নিম্ন নগর (Lower Town) বলা হতো।
২. হরপ্পা সভ্যতার কোথায় বিখ্যাত ‘বৃহৎ স্নানাগার’ (The Great Bath) আবিষ্কৃত হয়েছে?
উত্তর: মহেঞ্জোদারোতে।
৩. হরপ্পা সভ্যতায় ব্যবহৃত ইটের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার অনুপাত কত ছিল?
উত্তর: ৪ : ২ : ১ (4:2:1)।
৪. হরপ্পা সভ্যতার কোন নগরে কোনো দুর্গ বা সিটাডেল ছিল না?
উত্তর: চানহুদারো (Chanhudaro) নগরে।
৫. সিন্ধু সভ্যতার কোন শহরে প্রাচীনতম কৃত্রিম সামুদ্রিক ডকইয়ার্ড পাওয়া গেছে?
উত্তর: গুজরাটের লোথালে।
৬. হরপ্পীয় নগর পরিকল্পনায় রাস্তাগুলো কীভাবে ছেদ করত?
উত্তর: রাস্তাগুলো একে অপরকে সমকোণে (৯০ ডিগ্রি কোণে) বা গ্রিড পদ্ধতিতে (Grid System) ছেদ করত।
৭. কোন হরপ্পীয় নগরে শহরের ৩টি স্তর (সিটাডেল, মধ্য নগর ও নিম্ন নগর) দেখা যায়?
উত্তর: গুজরাটের ধোলাভিড়া (Dholavira) নগরে।
৮. মহেঞ্জোদারোর বৃহৎ স্নানাগারে জলনিরোধক স্তর তৈরি করতে কী ব্যবহার করা হতো?
উত্তর: প্রাকৃতিক পিচ বা বিটুমেন (Bitumen) এবং জিপসাম।
৯. কোন হরপ্পীয় নগরে কাঠের তৈরি নর্দমা বা ড্রেনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে?
উত্তর: রাজস্থানের কালিবঙ্গানে।
১০. ফুসফুস বা শহরের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা শস্যগোলা কোথায় পাওয়া গেছে?
উত্তর: হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো উভয় স্থানেই (প্রধানত হরপ্পাতে ১২টি শস্যগোলার সারি)।
১১. ধোলাভিড়া শহরটি কোন নদীর তীরে অবস্থিত ছিল?
উত্তর: লুনি নদীর তীরে।
১২. হরপ্পার বাড়িগুলোর দরজা-জানালা প্রধান রাস্তার বদলে ভেতরের গলির দিকে থাকত কেন?
উত্তর: গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং বাইরের ধুলোবালি ও শোরগোল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
১৩. হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলোতে বর্জ্য জল নিষ্কাশনের জন্য নর্দমাগুলো কী দিয়ে ঢাকা থাকত?
উত্তর: পোড়ানো ইট এবং বড় পাথরের স্ল্যাব (Stone Slabs) দিয়ে।
১৪. হরপ্পা সভ্যতার স্থানগুলো খননকার্যে ইঁট-বাঁধানো কুয়ো সবচেয়ে বেশি কোথায় পাওয়া গেছে?
উত্তর: মহেঞ্জোদারোতে (প্রায় ৭০০টিরও বেশি)।
১৫. সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীনতম নগর হরপ্পা কোন নদীর তীরে অবস্থিত ছিল?
উত্তর: রবি বা রাভি (Ravi) নদীর তীরে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, হরপ্পার নগর পরিকল্পনা কেবল ব্রোঞ্জ যুগের প্রাচীন ভারতীয়দের অনন্য শৈল্পিক কারুকাজ নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত ও দূরদর্শী নাগরিক ভাবনার এক উজ্জ্বল ঐতিহাসিক দলিল। জ্যামিতিক গ্রিড প্রথায় চওড়া রাস্তা নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত ও ঢাকা পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা, পোড়া ইটের সুসংহত ব্যবহার এবং জল সংরক্ষণের মতো প্রযুক্তি প্রমাণ করে যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সুশীল ও সংগঠিত নাগরিক জীবনযাপন করতেন।
ইতিহাসের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং ডব্লিউবিসিএস বা এসএসসি-র মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের জন্য হরপ্পীয় নগর স্থাপত্যের প্রতিটি খুঁটিনাটি ধারণা রাখা অপরিহার্য। এই সভ্যতার নগর পরিকল্পনা আধুনিক নগর উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।