প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মগধ সাম্রাজ্য। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতের ষোড়শ মহাজনপদের (১৬টি ক্ষুদ্র রাজ্য) অন্যতম একটি রাজ্য হিসেবে মগধের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা, উর্বর কৃষিজমি, খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য এবং দূরদর্শী শাসকদের হাত ধরে মগধ দ্রুত বাকি সব রাজ্যকে ছাড়িয়ে এক বিশাল ও অখণ্ড সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
হর্যঙ্ক বংশের রাজা বিম্বিসার ও অজাতশত্রুর হাত ধরে যে সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে নন্দ ও মৌর্য বংশের আমলে এক বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। বিশেষ করে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং সম্রাট অশোকের শাসনামলে মগধের সীমানা ও গৌরব সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থানের প্রধান কেন্দ্রভূমিই ছিল এই মগধ সাম্রাজ্য।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক (6th Century BC) ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। এই সময় উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকাকে কেন্দ্র করে প্রাক-বৌদ্ধ যুগের অবসান ঘটে এবং দ্বিতীয় নগরায়নের (Second Urbanization) সূচনা হয়। বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘অঙ্গুত্তর নিকায়’ এবং জৈন গ্রন্থ ‘ভগবতী সূত্র’ থেকে জানা যায় যে, এই সময়ে সমগ্র উত্তর ভারতে ১৬টি বড় বড় আঞ্চলিক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটেছিল, যেগুলিকে একত্রে ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলা হয়।
এই ১৬টি মহাজনপদের মধ্যে কিছু ছিল রাজতান্ত্রিক (Monarchical) এবং কিছু ছিল প্রজাতান্ত্রিক বা সংঘরাষ্ট্র (Republican)। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, উর্বর জমির দখল এবং বাণিজ্যিক রুট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই মহাজনপদগুলির মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে এক অন্তহীন পারস্পরিক সংঘাত ও যুদ্ধ চলতে থাকে। এই দীর্ঘকালীন শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে বাকি ১৫টি মহাজনপদকে (বিশেষ করে অবন্তী, কোশল এবং বৎস রাজ্যকে) সম্পূর্ণ পরাস্ত করে, গাঙ্গেয় উপত্যকার দক্ষিণভাগে অবস্থিত ‘মগধ’ এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মগধের এই অভাবনীয় উত্থান কেবল একটি আঞ্চলিক রাজ্যের জয়যাত্রা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে প্রথম ‘সাম্রাজ্যবাদী’ (Imperialistic) ধারণার বাস্তব রূপায়ন।

মগধ সাম্রাজ্য -এর ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা:
মগধ সাম্রাজ্য -এর ভৌগোলিক অবস্থান এর অর্থনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতির প্রধান কারণ ছিল। বর্তমান বিহারের পাটনা, গয়া এবং শাহাবাদ জেলা নিয়ে প্রাচীন মগধ গঠিত হয়েছিল।
- উত্তর সীমানা: গঙ্গা নদী।
- পূর্ব সীমানা: চম্পা নদী (অঙ্গ রাজ্যের সীমানা)।
- দক্ষিণ সীমানা: ছোটনাগপুর মালভূমির জঙ্গল ও বিন্ধ্য পর্বতমালা।
- পশ্চিম সীমানা: সোন নদী।
আরো পড়ুন: মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস:
মগধ সাম্রাজ্য -এর উত্থানের প্রধান কারণসমূহ:
কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে নয়, বরং একাধিক অনুকূল উপাদানের মেলবন্ধনে মগধ অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল:
কৌশলগত ও নিরাপদ রাজধানী:
- রাজগৃহ (প্রথম রাজধানী): এটি পাঁচটি পাহাড় (গিরিব্রজ) দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত হওয়ায় শত্রুপক্ষ সহজে এখানে আক্রমণ করতে পারত না। এটিকে একপ্রকার ‘দুর্গ-শহর’ বলা চলে।
- পাটলিপুত্র (পরবর্তী রাজধানী): এটি গঙ্গা, সোন ও গণ্ডক নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ছিল। জলবেষ্টিত থাকায় একে ‘জলদুর্গ’ বা ‘নদীদুর্গ’ বলা হতো। এর ফলে বাণিজ্য এবং সেনা পরিচালনা অত্যন্ত সহজ হয়েছিল।
উর্বর পলল মৃত্তিকা ও উদ্বত্ত কৃষি:
মগধ সাম্রাজ্য -এর মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকা ছিল অত্যন্ত উর্বর। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং গঙ্গা-সোনের পলিমাটির কারণে এখানে বিপুল পরিমাণ শস্য উৎপন্ন হতো। কৃষকদের থেকে সংগৃহীত উদ্বৃত্ত রাজস্ব (Tax) রাজকোষকে সমৃদ্ধ করেছিল, যা দিয়ে বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী (Standing Army) রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হতো।
লোহা ও তামার খনি:
মগধ সাম্রাজ্য -এর নিকটবর্তী ছোটনাগপুর অঞ্চলে (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের লোহার আকরিক পাওয়া যেত। এই লোহা দিয়ে মগধের শাসকরা দুর্ধর্ষ ও ধারালো অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি জঙ্গল পরিষ্কার ও কৃষিকাজের জন্য লোহার লাঙল তৈরি হওয়ায় উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়।
যুদ্ধক্ষেত্রে হাতির ব্যবহার:
ভারতের ইতিহাসে মগধই প্রথম বড় আকারে যুদ্ধক্ষেত্রে হাতি বা গজবাহিনীর ব্যবহার শুরু করে। মগধের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের ঘন জঙ্গল থেকে প্রচুর বুনো হাতি ধরা হতো। গ্রিক ঐতিহাসিকদের মতে, নন্দ রাজাদের সেনাবাহিনীতে প্রায় ৬,০০০ যুদ্ধ-হাতী ছিল। এই হাতিগুলি শত্রুপক্ষের দুর্গ ধ্বংস করতে এবং পদাতিক বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করত।
দূরদর্শী ও পরাক্রমশালী শাসক:
মগধ সাম্রাজ্য -এর সিংহাসনে পর পর এমন কিছু রাজারা বসেছিলেন (যেমন— বিম্বিসার, অজাতশত্রু, মহাপদ্ম নন্দ), যাঁরা অত্যন্ত লড়াকু, কূটনীতিবিদ এবং সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার ছিলেন।
মগধ সাম্রাজ্য -এর প্রধান রাজবংশসমূহ (Chronology of Dynasties):
মগধ সাম্রাজ্য -এর রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত চারটি প্রধান রাজবংশের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে। নিচে ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো:
বৃহদ্রথ বংশ (পৌরাণিক) ➔ হর্যঙ্ক বংশ ➔ শিশুনাগ বংশ ➔ নন্দ বংশ ➔ মৌর্য বংশ
বৃহদ্রথ বংশ (প্রাচীনতম পৌরাণিক বংশ)
মহাভারত এবং পুরাণ অনুসারে, মগধের প্রাচীনতম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বৃহদ্রথ।
- এই বংশের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা ছিলেন জরাসন্ধ (বৃহদ্রথের পুত্র)।
- মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় ভীম জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করেছিলেন।
- এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন রিপুঞ্জয়, যাঁকে তাঁর মন্ত্রী পুলিক হত্যা করে নিজের পুত্রকে সিংহাসনে বসান। (তবে এই বংশের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা কিছুটা কম, মূল ঐতিহাসিক পর্ব শুরু হয় হর্যঙ্ক বংশ থেকে)।
হর্যঙ্ক বংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৪ – খ্রিস্টপূর্ব ৪১২)
হর্যঙ্ক বংশের মাধ্যমেই মগধের ঐতিহাসিক এবং সাম্রাজ্যবাদী যাত্রার সূচনা হয়।
বিম্বিসার ➔ অজাতশত্রু ➔ উদয়িন ➔ নাগদশক (শেষ রাজা)
বিম্বিসার (খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৪ – খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২)
- প্রতিষ্ঠাতা: তিনি হর্যঙ্ক বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
- উপাধি: তাঁর উপাধি ছিল ‘শ্রেণিক’ (Senika)। তিনি প্রথম ভারতীয় রাজা যিনি স্থায়ী সেনাবাহিনী (Standing Army) গঠন করেছিলেন।
- সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি: তিনি মূলত দুটি নীতির মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন— বৈবাহিক সম্পর্ক এবং সামরিক অভিযান।
- বৈবাহিক মিত্রতা: তিনি কোশল রাজকন্যা মহাশ্বেতা দেবী (প্রসেনজিতের বোন), বৈশালীর লিচ্ছবি রাজকন্যা চেল্লনা এবং মদ্র দেশের (পাঞ্জাব) রাজকন্যা খেমাকে বিবাহ করেন। যৌতুক হিসেবে তিনি কোশলরাজ থেকে কাশীর একটি অংশ লাভ করেন, যা থেকে বার্ষিক ১ লক্ষ মুদ্রা রাজস্ব আসত।
- সামরিক অভিযান: তিনি মগধের প্রতিবেশী এবং বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্য ‘অঙ্গ’ (রাজধানী: চম্পা) আক্রমণ করে জয় করেন এবং পুত্র অজাতশত্রুকে সেখানকার রাজ্যপাল নিযুক্ত করেন।
- অন্যান্য তথ্য: তিনি গৌতম বুদ্ধ এবং মহাবীর— উভয়েরই সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর রাজবৈদ্য ‘জীবক’ অত্যন্ত বিখ্যাত ছিলেন। বিম্বিসার তাঁর বন্ধু অবন্তীর রাজা প্রদ্যোতের জন্ডিস নিরাময়ের জন্য জীবককে উজ্জয়িনীতে পাঠিয়েছিলেন। তিনি নতুন শহর ‘রাজগৃহ’ নির্মাণ করেন।
অজাতশত্রু (খ্রিস্টপূর্ব ৪৯২ – খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০)
- সিংহাসন লাভ: তিনি তাঁর পিতা বিম্বিসারকে বন্দি করে (মতান্তরে হত্যা করে) সিংহাসনে বসেন।
- উপাধি: তাঁর উপাধি ছিল ‘কুণিক’ (Kunika)।
- যুদ্ধ ও কূটনীতি:
- পিতার মৃত্যুর পর কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কাশী পুনর্দখল করলে অজাতশত্রুর সাথে কোশলের যুদ্ধ বাঁধে। দীর্ঘ যুদ্ধের পর প্রসেনজিৎ নিজের কন্যা বজিরা-র সাথে অজাতশত্রুর বিবাহ দেন এবং কাশী পুনরায় মগধের হস্তগত হয়।
- তিনি বৈশালীর বজ্জি বা লিচ্ছবি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য তিনি তাঁর কূটনীতিবিদ মন্ত্রী ‘বৎসকার’-এর সাহায্য নেন, যিনি লিচ্ছবিদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফাটল ধরিয়েছিলেন।
- নতুন যুদ্ধাস্ত্র: বৈশালীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি দুটি নতুন ও ভয়াবহ অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন— ‘মহাশিলাকণ্টক’ (যার সাহায্যে বড় বড় পাথর শত্রুর দিকে ছোঁড়া হতো, ক্যাটালপল্ট-এর মতো) এবং ‘রথমুশল’ (ব্লেডযুক্ত রথ, যা শত্রুদের কেটে ফেলত)।
- ধর্মীয় অবদান: তিনি প্রথম জীবনে জৈন মতাবলম্বী হলেও পরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৩ অব্দে গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর, অজাতশত্রুর পৃষ্ঠপোষকতায় রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি (First Buddhist Council) অনুষ্ঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন মহাকাশ্যপ।
উদয়িন (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ – খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৪)
- তিনি অজাতশত্রুর পুত্র ছিলেন।
- ঐতিহাসিক অবদান: তিনি গঙ্গা ও সোন নদীর সঙ্গমস্থলে কৌশলগত কারণে ‘পাটলিপুত্র’ (কুসুমপুর) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মগধ সাম্রাজ্য -এর রাজধানী রাজগৃহ থেকে পাটলিপুত্রে স্থানান্তরিত করেন।
- তিনি জৈন ধর্মের অনুসারী ছিলেন।
হর্যঙ্ক বংশের শেষ ভাগ:
উদয়িনের পর তাঁর তিন পুত্র অনিরুদ্ধ, মুণ্ড এবং নাগদশক একে একে রাজত্ব করেন। এরা প্রত্যেকেই পিতৃঘাতী এবং দুর্বল ছিলেন। প্রজারা ক্ষুব্ধ হয়ে শেষ রাজা নাগদশককে সিংহাসন চ্যুত করে এবং তাঁরই যোগ্য অমাত্য (মন্ত্রী) শিশুনাগ-কে মগধের রাজা নির্বাচিত করে।
শিশুনাগ বংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৪১২ – খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৪)
শিশুনাগ ➔ কালাশোক বা কাকবর্ণ ➔ নন্দীবর্ধন (শেষ রাজা)
শিশুনাগ (খ্রিস্টপূর্ব ৪১২ – খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৪)
- প্রতিষ্ঠাতা: তিনি শিশুনাগ বংশের প্রতিষ্ঠাতা।
- কৃতিত্ব: তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল মগধের দীর্ঘদিনের প্রবল শত্রু ‘অবন্তী’ রাজ্যকে পরাজিত করে মগধের অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে মগধ ও অবন্তীর মধ্যে চলা ১০০ বছরের পুরোনো সংঘাতের অবসান ঘটে। এছাড়া তিনি বৎস ও কোশল রাজ্যকেও মগধের অধীনে নিয়ে আসেন।
- তিনি সাময়িকভাবে রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে বৈশালী-তে স্থানান্তরিত করেছিলেন।
কালাশোক বা কাকবর্ণ (খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৪ – খ্রিস্টপূর্ব ৩৬৬)
- তিনি শিশুনাগের পুত্র ছিলেন। গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারণে পুরাণে তাঁকে ‘কাকবর্ণ’ বলা হয়েছে।
- কৃতিত্ব: তিনি পুনরায় মগধের রাজধানী পাকাপাকিভাবে বৈশালী থেকে পাটলিপুত্রে ফিরিয়ে আনেন।
- দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি: তাঁর রাজত্বকালে খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৩ অব্দে বৈশালীতে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি (Second Buddhist Council) অনুষ্ঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন সবকামী (Sabakami)। এই কাউন্সিলেই বৌদ্ধ সংঘ ‘স্থবিরবাদী’ ও ‘মহাসাংঘিক’— এই দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
- মৃত্যু: বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ অনুযায়ী, পাটলিপুত্রের প্রাসাদের কাছে ঘোরার সময় এক ব্যক্তি (মহাপদ্ম নন্দ) কালাশোকের গলায় ছুরি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে।
শেষ রাজা:
কালাশোকের পর তাঁর ১০ পুত্র প্রায় ২২ বছর মগধ শাসন করেন। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন নন্দীবর্ধন বা মহানন্দিন।
নন্দ বংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৪ – খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪)
নন্দ বংশের উত্থান ভারতীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, এঁরা ছিলেন ভারতের ইতিহাসে প্রথম অ-ক্ষত্রিয় (Non-Kshatriya) রাজবংশ। পুরাণ মতে, এঁরা শূদ্র বংশোদ্ভূত ছিলেন।
মহাপদ্ম নন্দ ➔ ধননন্দ সহ আট পুত্র (নবনন্দ)
মহাপদ্ম নন্দ (ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট)
- প্রতিষ্ঠাতা: তিনি নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। পুরাণে তাঁকে ‘মহাপদ্ম’ বলা হয়েছে কারণ তাঁর কাছে পদ্ম সংখ্যার মতো বিশাল পরিমাণ ধনসম্পদ ও সৈন্য ছিল।
- উপাধিসমূহ:
- উগ্রসেন: গ্রিক লেখকদের মতে তাঁর বিশাল ও উগ্র সেনাবাহিনীর কারণে এই নাম।
- সর্বক্ষত্রিয়ান্তক: পরশুরামের মতো সমস্ত ক্ষত্রিয় বংশকে ধ্বংস করার জন্য এই উপাধি।
- দ্বিতীয় পরশুরাম (Bhargava): পুরাণে তাঁকে পরশুরামের অবতার বলা হয়েছে।
- একরাট বা একচ্ছত্র: সমগ্র উত্তর ভারতকে একক শাসনের অধীনে আনার জন্য।
- সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি ইক্ষ্বাকু, পাঞ্চাল, কাশী, কলিঙ্গ, অস্মক প্রভৃতি রাজ্য জয় করে মগধকে একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। খারবেলের হাতিগুম্ফা শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মহাপদ্ম নন্দ কলিঙ্গ জয় করেছিলেন এবং সেখান থেকে ‘জিন’-এর (জৈন তীর্থঙ্করের) মূর্তি মগধে নিয়ে এসেছিলেন। এছাড়াও তিনি কলিঙ্গে একটি জলসেচ খাল খনন করেছিলেন।
ধননন্দ (নন্দ বংশের শেষ রাজা)
- তিনি মহাপদ্ম নন্দের ৯টি পুত্রের মধ্যে অন্যতম এবং এই বংশের শেষ সম্রাট ছিলেন।
- গ্রিক নামকরণ: গ্রিক সাহিত্যে তাঁকে ‘আগ্রামেস’ (Agrammes) বা ‘জ্যান্ড্রামেস’ বলা হয়েছে।
- আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ: তাঁর রাজত্বকালেই খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে মেসিডোনের গ্রিক বীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন। কিন্তু ধননন্দের বিশাল সেনাবাহিনীর (২ লক্ষ পদাতিক, ২০ হাজার অশ্বারোহী, ২ হাজার রথ এবং ৩ হাজার যুদ্ধ-হাতী) কথা শুনে এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা বিপাশা (Beas) নদী পার হয়ে মগধের দিকে এগোতে অস্বীকার করে। ফলে আলেকজান্ডার ভারত থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
- চরিত্র ও পতন: ধননন্দ অত্যন্ত কৃপণ, বিলাসী এবং প্রজাপীড়ক রাজা ছিলেন। চামড়া, কাঠ এবং পাথরের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানোর কারণে প্রজারা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তিনি তাঁর রাজসভায় পন্ডিত চাণক্য বা কৌটিল্যকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। চাণক্য এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন এবং তরুণ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সহায়তায় এক বিশাল বিদ্রোহ গড়ে তোলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪-৩২১ অব্দের মধ্যে ধননন্দকে পরাজিত ও হত্যা করে মগধে মৌর্য সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
মৌর্য বংশ (খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ – খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫)
মৌর্য বংশের হাত ধরে মগধ সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, বিন্দুসার এবং সম্রাট অশোকের আমলে মগধ সাম্রাজ্য -এর সীমানা আফগানিস্তান থেকে শুরু করে দক্ষিণে কর্ণাটক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।
(দ্রষ্টব্য: মৌর্য সাম্রাজ্য সম্পর্কে আলাদা বিস্তারিত পাঠ্য রয়েছে, তবে মগধের চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিকাশ এই বংশের আমলেই হয়েছিল।)
মগধ সাম্রাজ্য -এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন:
মগধ সাম্রাজ্য -এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো সমকালীন ভারতের চেয়ে অনেকটাই প্রগতিশীল ছিল:
মৌর্য সাম্রাজ্য অর্থনীতি
- আহিল বা কর ব্যবস্থা: কৃষকদের উৎপাদনের 1/6 অংশ কর বা ‘ভাগ’ হিসেবে দিতে হতো। কর আদায়ের জন্য ‘বলিসাধক’ নামক কর্মচারী ছিলেন।
- বাণিজ্য ও যাতায়াত: মগধের অবস্থান গঙ্গা নদীর তীরে হওয়ায় জলপথে উত্তর ও পূর্ব ভারতের সাথে বাণিজ্য চলত। চম্পা ও তাম্রলিপ্ত বন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল।
- মুদ্রার প্রচলন: এই যুগে প্রথম রূপো এবং তামার ‘আহত মুদ্রা’ (Punch-Marked Coins) বা কার্যাপনের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। এর ফলে বিনিময় প্রথা লোপ পায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপ্লব আসে।
মৌর্য সাম্রাজ্য সমাজ ও ধর্ম
- মগধ সাম্রাজ্য -এর সমাজ প্রথাগত বৈদিক সংস্কৃতির বাইরে ছিল। বৈদিক সাহিত্যে মগধের মানুষকে ‘ব্রাত্য’ বা পতিত বলা হয়েছে, কারণ তারা বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান কঠোরভাবে মানত না।
- এই সামাজিক উদারতার কারণেই মগধের মাটিতে বৌদ্ধ ধর্ম এবং জৈন ধর্ম-এর মতো দুটি প্রধান প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের জন্ম ও দ্রুত বিস্তার ঘটেছিল। বিম্বিসার, অজাতশত্রু এবং পরবর্তীকালে অশোকের মতো রাজারা এই ধর্মগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।
মগধ সাম্রাজ্য -এর প্রশাসনিক পদাধিকারী (Administrative Designations):
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশাসনিক পদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| পদের নাম | দায়িত্ব ও কাজ |
| মহামাত্র (Mahamatra) | উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও উপদেষ্টা |
| ভোজক (Bhojaka) | গ্রাম প্রধান (Village Headman) |
| বলিসাধক (Balisadhaka) | কৃষকদের থেকে জোরপূর্বক কর বা ‘বলি’ আদায়কারী |
| শুল্কাদক্ষ (Shulkadhyaksha) | বাণিজ্য শুল্ক ও টোল আদায়কারী কর্মচারী |
| নগরক (Nagaraku) | শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষক বা কোতোয়াল |
এক নজরে মগধ সাম্রাজ্য -এর বৌদ্ধ সংগীতি (Buddhist Councils in Magadha)
মগধ সাম্রাজ্য -এর ইতিহাসে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ সম্মেলন বা সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা থেকে প্রায়শই পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে:
| সংগীতি | স্থান | সমকালীন শাসক | সভাপতি | প্রধান অবদান |
| ১ম | রাজগৃহ | অজাতশত্রু | মহাকাশ্যপ | সুক্ত ও বিনয় পিটক সংকলন |
| ২য় | বৈশালী | কালাশোক | সবকামী | সংঘের প্রথম বিভাজন |
| ৩য় | পাটলিপুত্র | অশোক | মোগলিপুত্ত তিসা | অভিধম্ম পিটক সংকলন (ত্রিপিটক পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়) |
| ৪র্থ | কাশ্মীর | কণিষ্ক | বসুমিত্র | হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ে চূড়ান্ত বিভাজন |
শর্টকাট ট্রিক (রাজার নাম মনে রাখার জন্য):
“অ-কা-অ-ক” ➔ অজাতশত্রু ➔ কালাশোক ➔ অশোক ➔ কণিষ্ক।
শর্টকাট ট্রিক (স্থানের নাম মনে রাখার জন্য):
“রাজা-বড়ো-পা-কা” ➔ রাজগৃহ ➔ বৈশালী ➔ পাটলিপুত্র ➔ কশ্মীর।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে মগধ সাম্রাজ্য -এর রাজত্ব ও মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনকাল কেবলই এক রাজবংশের উত্থান-পতনের কাহিনী নয়; এটি ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সফল দলিল। অর্থনৈতিক প্রাচুর্য, সামরিক অভিনবত্ব এবং দূরদর্শী কূটনীতির ওপর ভর করে পাটলিপুত্রকে কেন্দ্র করে যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তী ভারতের রাষ্ট্রনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বিশেষ করে সম্রাট অশোকের জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা এবং অহিংসার নীতি মগধের রাজশক্তিকে এক অনন্য নৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ অব্দে মৌর্য বংশের পতন ঘটলেও, তারা ভারতীয় সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং অখণ্ডতার যে ঐতিহ্য রেখে গিয়েছিল, তা আজও ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।
মগধ সাম্রাজ্য: ওয়ান-লাইনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (Quick Revision Capsule)
১. ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট কাকে বলা হয়?
উঃ মহাপদ্ম নন্দ-কে।
২. মগধ সাম্রাজ্য -এর কোন রাজা প্রথম হাতি বাহিনীকে বড় আকারে যুদ্ধে ব্যবহার করেন?
উঃ মহাপদ্ম নন্দ ও নন্দ বংশের রাজারা।
৩. ‘শ্রেণিক’ এবং ‘কুণিক’ কার কার উপাধি ছিল?
উঃ বিম্বিসারের উপাধি ছিল ‘শ্রেণিক’ এবং তাঁর পুত্র অজাতশত্রুর উপাধি ছিল ‘কুণিক’।
৪. পাটলিপুত্র নগরী কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
উঃ হর্যঙ্ক বংশের রাজা উদয়িন (Udayin)।
৫. আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় মগধের সিংহাসনে কে ছিলেন?
উঃ নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দ (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দ)।
৬. মগধ সাম্রাজ্য -এর প্রাচীনতম রাজধানী গিরিব্রজ বা রাজগৃহ কয়টি পাহাড় দিয়ে ঘেরা ছিল?
উঃ ৫টি পাহাড় দিয়ে।
৭. কোন শিলালিপি থেকে জানা যায় যে মহাপদ্ম নন্দ কলিঙ্গ জয় করেছিলেন?
উঃ কলিঙ্গরাজ খারবেলের ‘হাতিগুম্ফা শিলালিপি’ থেকে।
৮. বিম্বিসারের বিখ্যাত রাজবৈদ্যের নাম কী ছিল এবং তিনি কার সমসাময়িক ছিলেন?
উঃ জীবক। তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন।
৯. হর্যঙ্ক বংশের শেষ রাজার নাম কী ছিল?
উঃ নাগদশক।
১০. মগধ সাম্রাজ্য -এর কোন রাজবংশকে ভারতের ইতিহাসে প্রথম ‘অ-ক্ষত্রিয়’ বা ‘শূদ্র’ রাজবংশ বলা হয়?
উঃ নন্দ রাজবংশকে
