ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা: Indian banking system.

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা: Indian banking system.

Table of Contents

ভূমিকা:

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক যুগে যেকোনো দেশের মেরুদণ্ড হলো তার আর্থিক বা ব্যাংকিং সেক্টর। ঠিক একইভাবে, বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ভারতের মূল চালিকাশক্তি হলো ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা। প্রাচীনকালের মহাজনি প্রথা থেকে শুরু করে আজকের সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন ইউপিআই (UPI) লেনদেন—ভারতের ব্যাংকিং খাতের এই রূপান্তর অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

আপনি যদি কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা জানতে চান, কিংবা ভারতের অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেতে চান, তবে এই পোস্টটি আপনার জন্য। আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র ইতিহাস, এর সাংগঠনিক কাঠামো, বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (History of Indian Banking System)

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র বর্তমান রূপটি একদিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত তিনটি প্রধান ধাপের মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে:

প্রাক-স্বাধীনতা পর্ব বা প্রাথমিক পর্যায় (১৭৭০ – ১৯৪৭):

ভারতের আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সূচনা ঘটে ১৭৭০ সালে ব্যাংক অফ হিন্দুস্তান (Bank of Hindostan) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তিনটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে:

  • ব্যাংক অফ বেঙ্গল (১৮০৬)
  • ব্যাংক অফ বোম্বে (১৮৪০)
  • ব্যাংক অফ মাদ্রাজ (১৮৪৩)

১৯২১ সালে এই তিনটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংককে একত্রিত করে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (Imperial Bank of India) গঠন করা হয়, যা স্বাধীনতার পর ১৯৫৫ সালে রূপান্তরিত হয় আজকের বিখ্যাত স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-তে। ১৯৩৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয়করণ ও মধ্যবর্তী পর্যায় (১৯৪৭ – ১৯৯১):

স্বাধীনতার পর গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবং সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে ব্যাংক জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

  • ১৯৪৯ সাল: রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-কে জাতীয়করণ করা হয়।
  • ১৯৬৯ সাল: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংককে জাতীয়করণ করেন।
  • ১৯৮০ সাল: আরও ৬টি ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়।

এই জাতীয়করণ প্রক্রিয়াই আধুনিক ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র ভিত শক্তিশালী করে এবং গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকের শাখা বিস্তারে সাহায্য করে।

উদারীকরণ ও আধুনিক পর্যায় (১৯৯১ থেকে বর্তমান):

১৯৯১ সালের আর্থিক সংস্কার বা এলপিজি (LPG – Liquidation, Privatization, Globalization) নীতির পর ভারতের ব্যাংকিং ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। ‘নরসিংহম কমিটি’-র সুপারিশে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোকে ভারতের বাজারে কাজ করার লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর ফলেই আইসিআইসিআই (ICICI), এইচডিএফসি (HDFC)-র মতো আধুনিক বেসরকারি ব্যাংকের জন্ম হয়।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো (Structure of Indian Banking)

বর্তমান ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও সুসংগঠিত। সামগ্রিক কাঠামোটি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI)। নিচে এই কাঠামোর একটি বিস্তারিত ছক দেওয়া হলো:

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা

তফশিলি বনাম অ-তফশিলি ব্যাংক (Scheduled vs Non-Scheduled Banks):

  • তফশিলি ব্যাংক: যে সমস্ত ব্যাংক RBI আইন, ১৯৩৪-এর দ্বিতীয় তফশিলভুক্ত (Second Schedule), সেগুলোকে তফশিলি ব্যাংক বলে। এদের ন্যূনতম মূলধন ও রিজার্ভ তহবিল ৫ লক্ষ টাকা হতে হয় এবং এরা RBI-এর থেকে ঋণ পাওয়ার সুবিধা পায়।
  • অ-তফশিলি ব্যাংক: যে সমস্ত ব্যাংক এই তফশিলের অন্তর্ভুক্ত নয়। ভারতে বর্তমানে এদের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র অধীনে বিভিন্ন প্রকার ব্যাংক:

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত ৪টি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে তাদের গ্রাহকদের পরিষেবা দিয়ে থাকে। নিচে প্রতিটি বিভাগের বিস্তারিত তথ্য আলোচনা করা হলো:

বাণিজ্যিক ব্যাংক (Commercial Banks):

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করে এবং সর্বসাধারণের আমানত গ্রহণ ও ঋণ দেওয়ার কাজ করে। এদের আবার ৪টি ভাগে ভাগ করা যায়:

  1. রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি ব্যাংক (Public Sector Banks – PSBs): এই ব্যাংকগুলোর সিংহভাগ শেয়ার (৫১% বা তার বেশি) সরকারের হাতে থাকে। যেমন- স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI), পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (PNB), ব্যাংক অফ বরোদা (BoB) ইত্যাদি।
  2. বেসরকারি ব্যাংক (Private Sector Banks): এগুলোর মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ থাকে বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে। যেমন- HDFC Bank, ICICI Bank, Axis Bank।
  3. বিদেশি ব্যাংক (Foreign Banks): যে সমস্ত ব্যাংকের সদর দফতর বিদেশে কিন্তু শাখা ভারতে রয়েছে। যেমন- Citibank, HSBC, Standard Chartered।
  4. আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক (Regional Rural Banks – RRBs): গ্রামীণ এলাকার কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও কুটির শিল্পের উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সালের আইন অনুযায়ী এগুলো তৈরি হয়। এগুলোর মালিকানা কেন্দ্র সরকার (৫০%), রাজ্য সরকার (১৫%) এবং স্পন্সরড বাণিজ্যিক ব্যাংকের (৩৫%) যৌথ অংশীদারিত্বে থাকে।

সমবায় ব্যাংক (Cooperative Banks):

সমবায় আইনের অধীনে নিবন্ধিত এই ব্যাংকগুলো মূলত “লাভ নয়, লোকসান নয়” ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এগুলো স্থানীয় কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমবায় ব্যাংক প্রধানত ত্রি-স্তরীয় কাঠামোয় কাজ করে:

  • রাজ্য সমবায় ব্যাংক (State Cooperative Banks)
  • জেলা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক (District Central Cooperative Banks)
  • প্রাথমিক কৃষি ঋণ সমিতি (Primary Agricultural Credit Societies – PACS)

ডিফারেনশিয়েটেড ব্যাংক (Differentiated Banks):

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) ত্বরান্বিত করতে বিগত কয়েক বছরে ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-য় দুটি নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়েছে:

  • স্মল ফাইন্যান্স ব্যাংক (Small Finance Banks – SFBs): ক্ষুদ্র চাষী, ক্ষুদ্র শিল্প এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য এগুলো তৈরি হয়েছে। যেমন- AU Small Finance Bank, Equitas SFB।
  • পেমেন্ট ব্যাংক (Payments Banks): এই ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আমানত (Deposit) গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু কোনো ধরনের ঋণ (Loan) বা ক্রেডিট কার্ড দিতে পারে না। যেমন- Airtel Payments Bank, Paytm Payments Bank।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র প্রধান কার্যাবলি (Functions of Indian Banking):

ভারতের ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বহুমুখী কাজ করে থাকে। এদের কাজগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

প্রাথমিক কার্যাবলি (Primary Functions):

  • আমানত গ্রহণ (Accepting Deposits): ব্যাংকগুলো জনগণের অলস টাকা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট, সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ফিক্সড ডিপোজিট (FD) এবং রেকারিং ডিপোজিট (RD)-এর মাধ্যমে জমা রাখে।
  • ঋণ প্রদান (Granting Loans and Advances): সংগৃহীত আমানত থেকে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং সাধারণ মানুষকে গৃহঋণ, গাড়িঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ বা ক্যাশ ক্রেডিট হিসেবে অর্থ ধার দেয়।

মাধ্যমিক ও সহযোগী কার্যাবলি (Secondary Functions):

  • বিল ডিসকাউন্টিং: ব্যবসায়িক বিল অব এক্সচেঞ্জ ভাঙিয়ে অর্থ প্রদান।
  • লকার সুবিধা: মূল্যবান গয়না বা নথিপত্র নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা।
  • ফান্ড ট্রান্সফার: আরটিজিএস (RTGS), নেফট (NEFT), এবং আইএমপিএস (IMPS) এর মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাঠানো।
  • সরকারি কর সংগ্রহ: ট্যাক্স বা বিদ্যুৎ বিলের মতো ইউটিলিটি পেমেন্ট সম্পন্ন করা।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI):

সমগ্র ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র মধ্যমণি এবং নিয়ন্ত্রক হলো রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। ১৯৩৫ সালের ১ এপ্রিল রিজার্ভ ব্যাংক আইন, ১৯৩৪-এর অধীনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের বর্তমান সদর দফতর মুম্বাইতে অবস্থিত এবং এটি দেশের মুদ্রানীতি (Monetary Policy) নিয়ন্ত্রণ করে।

আরবিআই (RBI)-এর প্রধান কাজসমূহ:

  • নোট ইস্যু করা: দেশের সমস্ত কাগজের মুদ্রা বা নোট (১ টাকার নোট ও কয়েন ছাড়া) ছাপানোর একমাত্র অধিকার আরবিআই-এর রয়েছে।
  • সরকারের ব্যাংক: এটি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের আর্থিক উপদেষ্টা এবং ব্যাংকার হিসেবে কাজ করে।
  • ব্যাংকের ব্যাংক: দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের নগদ জমার অনুপাত (CRR) এবং বিধিবদ্ধ তরল অনুপাত (SLR) নিয়ন্ত্রণ করে এবং আপৎকালীন সময়ে সাহায্য করে।
  • ঋণ নিয়ন্ত্রণ: রেপো রেট (Repo Rate) এবং রিভার্স রেপো রেট (Reverse Repo Rate) হ্রাসের বা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • বৈদেশিক মুদ্রার রক্ষক: ভারতের ফরেক্স রিজার্ভ (Foreign Exchange Reserves) বা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণ করা এর অন্যতম দায়িত্ব।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকের গঠন ও কার্যকারিতা আরও সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো:

ব্যাংকের ধরনপ্রধান লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যঋণের সুবিধাসর্বাধিক জমার সীমাউদাহরণ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (PSB)জনকল্যাণ ও সামাজিক ব্যাংকিংহ্যাঁ (সব ধরনের)কোনো সীমা নেইState Bank of India (SBI)
বেসরকারি ব্যাংকমুনাফা অর্জন ও গ্রাহক সন্তুষ্টিহ্যাঁ (সব ধরনের)কোনো সীমা নেইHDFC Bank, ICICI Bank
স্মল ফাইন্যান্স ব্যাংকক্ষুদ্র ঋণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিহ্যাঁ (সীমিত ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে)কোনো সীমা নেইAU Small Finance Bank
পেমেন্ট ব্যাংকডিজিটাল পেমেন্ট ও রেমিট্যান্সনা (সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা প্রতি গ্রাহকAirtel Payments Bank

আধুনিক যুগে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ইউপিআই (UPI) বিপ্লব:

বিগত কয়েক বছরে ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক অভাবনীয় ডিজিটাল বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছে। আজ ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিয়েল-টাইম ডিজিটাল লেনদেনের দেশে পরিণত হয়েছে। এই বিপ্লবের মূল ভিত্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI): ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (NPCI) দ্বারা তৈরি UPI ভারতের লেনদেনের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। সামান্য চা বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় শপিং মল—সব জায়গায় আজ স্ক্যানার কিউআর কোডের জয়জয়কার।
  • মোবাইল ব্যাংকিং ও নেট ব্যাংকিং: ব্যাংক লাইনে দাঁড়ানোর দিন শেষ। অ্যাপের এক ক্লিকেই এখন এফডি (FD) খোলা, টাকা পাঠানো কিংবা ঋণের আবেদন করা সম্ভব।
  • আধার এনাবল্ড পেমেন্ট সিস্টেম (AePS): প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার মানুষ এখন ব্যাংকে না গিয়েও কেবল আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারেন।
  • নিওব্যাংকিং (Neobanking): কোনো শারীরিক শাখা ছাড়াই সম্পূর্ণ অ্যাপ ও ক্লাউড-ভিত্তিক ব্যাংক, যা তরুণ প্রজন্মের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হচ্ছে।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা-র প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমস্যাসমূহ:

ডিজিটাল ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি করলেও বর্তমান ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বেশ কিছু বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে:

  1. অনুৎপাদক সম্পদ বা এনপিএ (Non-Performing Assets – NPA): ব্যাংকের দেওয়া ঋণ যখন সময়মতো ফেরত আসে না, তখন তাকে এনপিএ বলে। বড় বড় শিল্পপতিদের ঋণখেলাপির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনো বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
  2. সাইবার অপরাধ এবং জালিয়াতি: ব্যাংকিং ডিজিটাল হওয়ার সাথে সাথে ফিশিং, অনলাইন স্ক্যাম ও এটিএম জালিয়াতির ঘটনা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব এর অন্যতম কারণ।
  3. গ্রামীণ ও শহুরে বৈষম্য: শহরাঞ্চলে ডিজিটাল পেমেন্ট খুব সহজে ছড়িয়ে পড়লেও প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার মানুষ এখনো ক্যাশ বা কাগজের টাকার ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট সংযোগের অভাব ও ডিজিটাল নিরক্ষরতা এর প্রধান কারণ।
  4. গ্রাহক পরিষেবার মান: বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি ব্যাংকের কর্মী ও পরিষেবার গতি নিয়ে এখনো সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা উন্নত করার সরকারি পদক্ষেপ:

ভারতের ব্যাংকিং ক্ষেত্রকে আরও সুরক্ষিত ও আধুনিক করতে রিজার্ভ ব্যাংক এবং কেন্দ্র সরকার একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:

  • প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (PMJDY): ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের “জিরো ব্যালেন্স” ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি।
  • ব্যাংক একীভূতকরণ (Bank Merger): ছোট ও দুর্বল সরকারি ব্যাংকগুলোকে বড় ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হয়েছে (যেমন- ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অফ কমার্স এবং ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া মিশে গেছে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের সাথে)। এর ফলে ব্যাংকের পরিচালনাগত দক্ষতা ও মূলধনী শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপটসি কোড (IBC – 2016): এই আইনের মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি দ্রুত বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকের টাকা আদায়ের পথ সুগম হয়েছে।
  • ডিজিটাল রুপি (e-Rupee): আরবিআই ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ভারতের নিজস্ব সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) বা ই-রুপি চালু করেছে, যা কাগজের টাকার ব্যবহার আরও কমিয়ে আনবে।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা সময়ের সাথে সাথে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। একদা ধীরগতির লাল ফিতার ফাঁসে বন্দি থাকা ব্যাংকিং আজ গ্রাহকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। একদিকে আরবিআই-এর কঠোর নজরদারি ও সময়োপযোগী নিয়মাবলী, অন্যদিকে ফিনটেক (Fintech) স্টার্টআপগুলোর অভাবনীয় উদ্ভাবন—সব মিলিয়ে ভারতের ব্যাংকিং সেক্টর আগামী দিনে দেশকে “৫ ট্রিলিয়ন ডলার” অর্থনীতিতে পরিণত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।

গ্রাহক হিসেবে আমাদেরও উচিত ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং ব্যাংকিংয়ের সুযোগ-সুবিধাগুলোর সঠিক ব্যবহার করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অংশীদার হওয়া।

ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ):

১. ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনটি এবং এটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। এটি ১৯৩৫ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৯ সালে এটির জাতীয়করণ করা হয়।

২. সিআরআর (CRR) এবং এসএলআর (SLR) বলতে কী বোঝায়?

  • CRR (Cash Reserve Ratio): প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগদ হিসেবে আরবিআই-এর কাছে জমা রাখতে হয়। একে সিআরআর বলে।
  • SLR (Statutory Liquidity Ratio): ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ নগদ, সোনা বা সরকারি সিকিউরিটিজ রূপে নিজেদের কাছে তরল অবস্থায় রাখতে হয়। একে এসএলআর বলে।

৩. ইউপিআই (UPI)-এর পূর্ণরূপ কী এবং এটি কে পরিচালনা করে?

UPI-এর পূর্ণরূপ হলো Unified Payments Interface। এটি ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (NPCI) দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

৪. ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সর্ববৃহৎ পাবলিক সেক্টর ব্যাংক কোনটি?

স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI) হলো ভারতের বৃহত্তম পাবলিক সেক্টর বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক।

৫. ফিনটেক (Fintech) এবং নিওব্যাংক (Neobank) কী?

ফিনটেক হলো ফাইনান্সিয়াল টেকনোলজি (আর্থিক প্রযুক্তি)। আর নিওব্যাংক হলো এমন ব্যাংক যার কোনো ফিজিক্যাল শাখা বা অফিস থাকে না, এটি সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যাংকিং পরিষেবা দিয়ে থাকে।

PDF Download