মৌর্য সাম্রাজ্য: Mauryan Empire.

মৌর্য সাম্রাজ্য: Mauryan Empire.

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের পাতায় যে কয়েকটি রাজবংশ নিজেদের বীরত্ব, কূটনীতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে অমর হয়ে রয়েছে, তার মধ্যে সর্বাগ্রে আসে মৌর্য সাম্রাজ্য। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যই ছিল ভারতের ইতিহাসের প্রথম সর্বভারতীয় এবং সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি। মগধের বুক থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে রয়েছে বীরত্ব এবং পরিবর্তনের গল্প।

আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা জানবো মৌর্য সাম্রাজ্য কীভাবে গঠিত হয়েছিল, এর শ্রেষ্ঠ সম্রাটদের কীর্তি, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ভূমিকা এবং অবশেষে কোন কারণে এই বিশাল শক্তির পতন ঘটেছিল। আপনি যদি ইতিহাসের ছাত্র হন কিংবা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হন, তবে এই লেখাটি আপনার জন্য একটি সম্পূর্ণ গাইডবুক।

মৌর্য সাম্রাজ্য

Table of Contents

মৌর্য সাম্রাজ্য কি এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি:

খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের হাত ধরে মৌর্য সাম্রাজ্য এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত আক্রমণের পর যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই এই রাজবংশের উত্থান ঘটে। তৎকালীন মগধের অত্যাচারী নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দকে সিংহাসনচ্যুত করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই নতুন যুগের সূচনা করেন।

এই সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র বা রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র (বর্তমান বিহারের পাটনা)। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গঙ্গা ও সোন নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত পাটলিপুত্র তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং সুরক্ষিত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল।

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ – ২৯৮)

মৌর্য সাম্রাজ্য এর ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তিনি ছিলেন একাধারে একজন দক্ষ সামরিক দূরদর্শী এবং অসাধারণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক।

নন্দ বংশের পতন ও সিংহাসন লাভ:

তৎকালীন মগধের রাজা ধননন্দের বিপুল সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রজাদের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয় ছিলেন। অতিরিক্ত করের বোঝা এবং নিষ্ঠুর আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগান চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং তার গুরু চাণক্য। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ধননন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসনে বসেন চন্দ্রগুপ্ত।

সেলুকাসের সাথে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য বিস্তার:

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সেনাপতি সেলুকাস নিকেটর ভারতের অধিকৃত অঞ্চলগুলো পুনর্দখল করতে এগিয়ে আসেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ অব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শক্তিশালী বাহিনীর সাথে সেলুকাসের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সেলুকাস একটি সন্ধি করতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্তানুযায়ী:

  • সেলুকাস তার কন্যা হেলেনকে চন্দ্রগুপ্তের সাথে বিয়ে দেন।
  • আরকোসিয়া (কান্দাহার), জেরোসিয়া (বেলুচিস্তান) এবং পারোপামিসাদাই (কাবুল) অঞ্চলগুলো মৌর্য সাম্রাজ্য এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
  • বিনিময়ে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সেলুকাসকে ৫০০টি যুদ্ধহস্তী উপহার দেন।

জীবনের শেষ দিন ও জৈন ধর্মে দীক্ষা:

জীবনের শেষভাগে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য রাজ্যপাট ত্যাগ করেন। তিনি জৈন আচার্য ভদ্রবাহুর কাছে জৈন ধর্মে দীক্ষা নেন এবং শ্রবণবেলগোলায় (বর্তমান কর্ণাটক) চলে যান। সেখানে জৈন প্রথা ‘সল্লেখনা’ বা অনশনের মাধ্যমে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

চাণক্য বা কৌটিল্য: মৌর্য সাম্রাজ্যের নেপথ্যের কারিগর

চাণক্য, যিনি কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও পরিচিত, ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী। তাকে ছাড়া হয়তো মৌর্য সাম্রাজ্য এর অস্তিত্বই কল্পনা করা যেত না। নন্দ রাজার রাজসভায় অপমানিত হয়ে চাণক্য প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি নন্দ বংশ ধ্বংস করবেন এবং সেই প্রতিজ্ঞা তিনি চন্দ্রগুপ্তের মাধ্যমে পূরণ করেন।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র (Arthashastra):

চাণক্যের রচিত ‘অর্থশাস্ত্র’ রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং সামরিক কৌশলের এক অনন্য দলিল। এই গ্রন্থে একটি রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, কর ব্যবস্থা কেমন হবে এবং গুপ্তচরবৃত্তির গুরুত্ব কতটা—তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কৌটিল্যের এই বাস্তবসম্মত নীতিগুলোই মৌর্য সাম্রাজ্য কে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে সাহায্য করেছিল।

সম্রাট বিন্দুসার: সাম্রাজ্য ধরে রাখার নীতি (খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ – ২৭৩)

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৃত্যুর পর তার পুত্র বিন্দুসার সিংহাসনে আরোহণ করেন। গ্রিক গ্রন্থে তাকে ‘অমিত্রঘাত’ বা ‘শত্রুহন্তা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

বিন্দুসারের মূল কৃতিত্ব ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য কে অক্ষুণ্ন রাখা এবং দক্ষিণ ভারতের দিকে এর আরও কিছুটা বিস্তার ঘটানো। তিনি দাক্ষিণাত্যের (মহীশূর পর্যন্ত) ১৬টি রাজ্য জয় করেছিলেন বলে জানা যায়। তার সময়ে সিরিয়া ও মিশরের রাজাদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় ছিল।

মহামতি অশোক: চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক (খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮ – ২৩২)

মৌর্য সাম্রাজ্য এর ইতিহাসে তো বটেই, সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসেই সম্রাট অশোকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। বিন্দুসারের মৃত্যুর পর এক গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তিনি সিংহাসন লাভ করেন। সিংহাসনে বসার পর প্রথম আট বছর তিনি প্রথাগত দিগ্বিজয় নীতি বা যুদ্ধ নীতির মাধ্যমেই সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন।

কলিঙ্গ যুদ্ধ: ইতিহাসের এক টার্নিং পয়েন্ট

খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ অব্দে অশোক উড়িষ্যার ‘কলিঙ্গ’ রাজ্য আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী। শিলালিপি থেকে জানা যায়, এই যুদ্ধে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ নিহত হন এবং দেড় লক্ষ মানুষ গৃহহীন ও বন্দী হন। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা, মানুষের আর্তনাদ এবং রক্তগঙ্গা দেখে সম্রাট অশোকের মন গভীরভাবে আলোড়িত হয়। তিনি তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে জীবনে আর কখনো অস্ত্র ধারণ করবেন না।

দিগ্বিজয় (যুদ্ধের মাধ্যমে জয়) ───► কলিঙ্গ যুদ্ধ (রক্তপাত) ───► ধর্মবিজয় (শান্তির নীতি)

বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা ও ‘ধম্ম’ প্রচার:

কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উপগুপ্তের কাছে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি তার যুদ্ধ নীতি (রণভেরী) ত্যাগ করে ধর্ম নীতি (ধর্মভেরী) গ্রহণ করেন। তিনি প্রজানিলী বা ‘ধম্ম’ (Dhamma) এর প্রচলন করেন, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না, বরং ছিল মানবতা, অহিংসা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রাণীদের প্রতি দয়ার এক নৈতিক আচরণবিধি।

তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে বিশ্বধর্মে পরিণত করতে তার পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে শ্রীলঙ্কায় পাঠান। এ ছাড়া সিরিয়া, মিশর, মেসিডোনিয়াতেও দূত পাঠানো হয়।

মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি:

একটি বিশাল ভূখণ্ডকে একক নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ ছিল না। কিন্তু মৌর্য সাম্রাজ্য এর প্রশাসনিক কাঠামো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও সুশৃঙ্খল। মূলত কেন্দ্রীয় শাসন, প্রাদেশিক শাসন এবং স্থানীয় শাসনের মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্র পরিচালিত হতো।

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক প্রশাসন:

সম্রাট ছিলেন সমস্ত ক্ষমতার উৎস, তবে তাকে সহায়তার জন্য একটি ‘মন্ত্রিপরিষদ’ ছিল। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সমগ্র সাম্রাজ্যকে পাঁচটি প্রধান প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল:

  • উত্তরাপথ: রাজধানী তক্ষশীলা
  • অবন্তী রাষ্ট্র: রাজধানী উজ্জয়িনী
  • দক্ষিণাপথ: রাজধানী সুবর্ণগিরি
  • কলিঙ্গ: রাজধানী তোশালি
  • প্রাচ্য (কেন্দ্রীয় অঞ্চল): রাজধানী পাটলিপুত্র

রাজস্ব ব্যবস্থা ও অর্থনীতি:

কৃষি ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। কৃষকদের সাধারণত উৎপাদিত ফসলের ১/৬ বা ১/৪ অংশ কর (যাকে ‘ভাগ’ বলা হতো) দিতে হতো। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ‘বলী’ নামক বিশেষ কর ধার্য করা ছিল। মৌর্য আমলে মুদ্রা হিসেবে রূপার ‘পন’ (Pana) ব্যবহার করা হতো। ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ‘উত্তরাপথ’ বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের প্রাচীন রূপ, যা পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশীলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

শক্তিশালী সামরিক ও গুপ্তচর বাহিনী:

মেগাস্থিনিসের বিবরণ অনুযায়ী, মৌর্যদের একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল, যার মধ্যে ৬ লক্ষ পদাতিক, ৩০ হাজার অশ্বারোহী, ৯ হাজার যুদ্ধহস্তী এবং ৮ হাজার রথ ছিল। এই বিশাল বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩০ জন সদস্যের একটি সামরিক বোর্ড ছিল। পাশাপাশি, চাণক্যের পরামর্শে তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী গুপ্তচর বাহিনী ভেতরের ও বাইরের সমস্ত খবরাখবর সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিত।

মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ এবং মৌর্য সমাজ:

গ্রিক শাসক সেলুকাসের দূত হিসেবে মেগাস্থিনিস দীর্ঘ সময় পাটলিপুত্রের রাজসভায় অবস্থান করেছিলেন। তার চোখে দেখা ভারতের বিবরণ তিনি ‘ইন্ডিকা’ (Indica) নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। যদিও মূল বইটি হারিয়ে গেছে, তবে পরবর্তীকালের গ্রিক ও রোমান লেখকদের উদ্ধৃতি থেকে এর অনেক তথ্য জানা যায়।

মেগাস্থিনিসের মতে, পাটলিপুত্র শহরটি ছিল ৯ মাইল দীর্ঘ এবং ১.৫ মাইল চওড়া, যা কাঠের প্রাচীর এবং গভীর পরিখা দিয়ে ঘেরা ছিল। তিনি ভারতীয় সমাজকে সাতটি শ্রেণীতে ভাগ করেছিলেন (যেমন: দার্শনিক, কৃষক, পশুপালক, কারিগর, সৈনিক, পরিদর্শক ও উপদেষ্টা)। তার বিবরণী থেকে তৎকালীন ভারতের সমৃদ্ধি এবং সুশাসনের এক স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।

মৌর্য শিল্পকলা ও স্থাপত্যের অবদান:

স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের ক্ষেত্রে মৌর্য সাম্রাজ্য এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। পাথর কেটে স্তম্ভ এবং গুহা নির্মাণের কৌশল এই সময়েই চরম উৎকর্ষ লাভ করে।

  • অশোক স্তম্ভ: চুনাপাথর দিয়ে তৈরি এই মনোলিথিক (একক পাথরের) স্তম্ভগুলো ছিল মসৃণ ও চকচকে।
  • সারনাথের সিংহচতুর্মুখ: সারনাথের অশোক স্তম্ভের শীর্ষে থাকা চারটি সিংহের মূর্তিটি আজ স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীক (National Emblem)।
  • স্তূপ নির্মাণ: সাঁচির বিখ্যাত বৌদ্ধ স্তূপ সম্রাট অশোকের আমলেই নির্মিত হতে শুরু করে।
  • বরাবর গুহা: বিহারের গয়ার কাছে অবস্থিত এই গুহাগুলো পাথর কেটে তৈরি স্থাপত্যের প্রাচীনতম উদাহরণ।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন:

খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর থেকেই মৌর্য সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে। অশোকের পরবর্তী উত্তরসূরিরা (যেমন: দশরথ, সম্প্রতি, শতধন্বা) ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল এবং অযোগ্য। অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ অব্দে শেষ মৌর্য সম্রাট সম্রাট বৃহদ্রথকে তার নিজস্ব সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ এক সামরিক কুচকাওয়াজের সময় হত্যা করেন এবং মগধে শুঙ্গ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে ১৩৭ বছরের গৌরবময় মৌর্য শাসনের।

এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

দুর্বল ও অযোগ্য উত্তরসূরি:

অশোকের পর এমন কোনো শক্তিশালী রাজা সিংহাসনে বসেননি যিনি এই বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারেন। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতেই দূরবর্তী প্রদেশগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শুরু করে।

অর্থনৈতিক সংকট:

অশোকের আমলে ধর্ম প্রচার, স্তূপ নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক কাজে রাজকোষের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিশাল সেনাবাহিনী এবং বিশাল আমলাতন্ত্রের খরচ চালাতে গিয়ে সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

অতিরিক্ত অহিংসা নীতি ও সামরিক শৈথিল্য:

কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোকের সম্পূর্ণ অহিংস নীতি গ্রহণের ফলে সেনাবাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি ও মানসিকতা ঝিমিয়ে পড়েছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে গ্রিক ও অন্যান্য বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করার মতো শক্তি মৌর্যদের ছিল না।

ব্রাহ্মণদের অসন্তোষ:

পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ। অশোকের বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগের কারণে এবং পশুবলি নিষিদ্ধ করার ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজ মৌর্য শাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল, যা এই বিদ্রোহকে ত্বরান্বিত করে।

এক নজরে মৌর্য রাজবংশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

নিচের তালিকায় মৌর্য সাম্রাজ্য এর মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে দেওয়া হলো:

প্রধান ক্ষেত্রগুরুত্বপূর্ণ বিবরণ
প্রতিষ্ঠাকালখ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দ
প্রতিষ্ঠাতাচন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
রাজধানীপাটলিপুত্র (বর্তমান পাটনা)
শ্রেষ্ঠ সম্রাটমহামতি অশোক
প্রধান ঐতিহাসিক উৎসকৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’, অশোকের শিলালিপি
পতনের বছরখ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ অব্দ
শেষ সম্রাটবৃহদ্রথ মৌর্য

উপসংহার:

মৌর্য সাম্রাজ্য কেবল একটি রাজবংশের ইতিহাস নয়, এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম অখণ্ড রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। চন্দ্রগুপ্তের কঠোর শাসন ও বীরত্ব যেমন এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়েছিল, চাণক্যের কূটনীতি একে স্থায়িত্ব দিয়েছিল, ঠিক তেমনি সম্রাট অশোকের শান্তির বাণী একে বিশ্বমঞ্চে অমর করে তুলেছে। যুদ্ধ জয় থেকে শুরু করে মানুষের হৃদয় জয় করার এই যে ঐতিহাসিক রূপান্তর, তা আজও বিশ্ব ইতিহাসে বিরল এবং শিক্ষণীয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রথম রাজা কে ছিলেন?

মৌর্য সাম্রাজ্য এর প্রথম রাজা এবং প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দে নন্দ বংশের পতন ঘটিয়ে সিংহাসনে বসেন।

২. অশোক কেন যুদ্ধ ত্যাগ করেছিলেন?

খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ অব্দের কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত, প্রায় এক লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং লাখো মানুষের হাহাকার দেখে সম্রাট অশোকের হৃদয়ে গভীর পরিবর্তন আসে। এরপরই তিনি চিরতরে যুদ্ধ নীতি বা ‘ভেড়িঘোষ’ ত্যাগ করেন।

৩. মৌর্যদের প্রধান ভাষা ও লিপি কী ছিল?

মৌর্য আমলে সাধারণ মানুষের প্রধান ভাষা ছিল প্রাকৃত (Prakrit) এবং রাজকীয় শিলালিপিগুলো মূলত ব্রাহ্মী (Brahmi) ও খরোষ্ঠী লিপিতে খোদাই করা হতো।

৪. কৌটিল্য কে ছিলেন এবং তার বিখ্যাত বইয়ের নাম কী?

কৌটিল্য (চাণক্য) ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান মন্ত্রী ও গুরু। তার বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘অর্থশাস্ত্র’, যা প্রাচীন ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি অমূল্য গ্রন্থ।