ভূমিকা:
ভারতের সংবিধানিক আইন এবং শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে কলেজিয়াম পদ্ধতি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, সংবেদনশীল ও ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয়। বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে সাধারণত বিচারক নিয়োগে সংসদ বা শাসনবিভাগের (Executive) একটি মুখ্য ভূমিকা থাকে, সেখানে ভারতে বিচার বিভাগ নিজেই বিচারক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে। মূলত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সমূহের বিচারপতি নিয়োগ এবং তাঁদের এক আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তরের (Transfer) সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্যানেল বা ব্যবস্থাই হলো কলেজিয়াম। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ভারতের মূল সংবিধানে ‘কলেজিয়াম’ শব্দটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের তিনটি ঐতিহাসিক রায়ের (Three Judges Cases) মধ্য দিয়ে এই পদ্ধতির জন্ম ও ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেছে।
একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও রাজনীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা বজায় রাখতে কলেজিয়াম পদ্ধতির অবদান অপরিসীম। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৪ ও ২১৭-এর কাঠামোর অধীনে থেকে কীভাবে বিচার বিভাগ ও শাসনবিভাগের মধ্যে বিচারক নিয়োগ নিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষিত হয়, তা অনুধাবন করা দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কেন্দ্রীয় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যকার বিভিন্ন টানাপোড়েন, ৯৯তম সংবিধান সংশোধনী ও এনজেএসি (NJAC) বিতর্ক এবং বিচারিক পর্যালোচনার নানা অধ্যায় মিলিয়ে এই ব্যবস্থাটি ভারতের রাজনীতি ও আইনি পরিমণ্ডলে এক অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে। এই বিস্তৃত গাইডে আমরা কলেজিয়াম পদ্ধতির ইতিহাস, এর অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি, ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক এবং এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছি।

কলেজিয়াম পদ্ধতি কী?
সহজ কথায়, ভারতের উচ্চতর বিচার বিভাগে (সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট) নতুন বিচারক নিয়োগ এবং বিদ্যমান বিচারকদের বদলির প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য প্রবীণ বিচারকদের গঠিত একটি বিশেষ ফোরাম বা প্যানেলকে কলেজিয়াম পদ্ধতি বলা হয়।
এই ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India) এবং তাঁর সহকর্মী প্রবীণতম বিচারপতিরা মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে কারা বিচারকের পদে আসীন হবেন।
আরো পড়ুন: ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা:
কলেজিয়াম পদ্ধতির কাঠামো ও সদস্যসংখ্যা:
উচ্চতর আদালতের দুটি স্তরে এই ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন প্যানেল নিয়ে কাজ করে:
- সুপ্রিম কোর্ট লেভেল: ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) এবং সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী ৪ জন প্রবীণতম বিচারপতি নিয়ে এই ৫ সদস্যের প্যানেল গঠিত হয়।
- হাইকোর্ট লেভেল: সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ওই হাইকোর্টের অন্য ২ জন প্রবীণতম বিচারপতি নিয়ে ৩ সদস্যের প্যানেল গঠিত হয়।
কলেজিয়াম পদ্ধতির উদ্ভব: তিন বিচারক মামলা (Three Judges Cases)
ভারতের মূল সংবিধানে এই ব্যবস্থার কোনো উল্লেখ নেই। সুপ্রিম কোর্টের ৩টি ঐতিহাসিক রায়ের (Three Judges Cases) মধ্য দিয়ে এর জন্ম:
প্রথম বিচারক মামলা (S.P. Gupta Case, 1981)
এটি “First Judges Case” নামে পরিচিত। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে —
বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতির পরামর্শই চূড়ান্ত হবে, প্রধান বিচারপতির মতামত বাধ্যতামূলক নয়।
ফলে, এই সময়ে নির্বাহী বিভাগ বিচারপতি নিয়োগে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিচারক মামলা (Advocates-on-Record Association vs Union of India, 1993)
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রথম রায় উল্টে দিয়ে ঘোষণা করে যে —
বিচারপতি নিয়োগে প্রধান বিচারপতির মতামতই প্রধান ও প্রাধান্যপূর্ণ হবে।
এটি ছিল কলেজিয়াম পদ্ধতির সূচনা।
এই রায়ে বলা হয়, “বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমান ভূমিকা থাকা উচিত নয়।”
তৃতীয় বিচারক মামলা (Presidential Reference, 1998)
রাষ্ট্রপতি কে. আর. নারায়ণন একটি রেফারেন্স পাঠান সুপ্রিম কোর্টে — জানতে চান “পরামর্শ” শব্দের প্রকৃত অর্থ কী।
নয় বিচারপতির বেঞ্চ রায় দেয় যে —
প্রধান বিচারপতি এককভাবে নয়, বরং চারজন সিনিয়র বিচারকের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই রায়ের পর থেকেই কলেজিয়াম পদ্ধতির বর্তমান রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সংবিধানের নির্দেশ: বিচারপতি নিয়োগ সম্পর্কিত ধারা:
ধারা ১২৪ – সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ
ভারতের সংবিধানের ১২৪(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,
“সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন, এবং এই নিয়োগ রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে করবেন।”
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নিয়োগের আগে প্রধান বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট বিচারকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ধারা ২১৭ – হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ
এখানে বলা হয়েছে —
“রাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও রাজ্যের গভর্নরের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করবেন।”
অর্থাৎ, হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগেও প্রধান বিচারপতির মতামত অপরিহার্য।
কলেজিয়াম গঠন ও কার্যপ্রণালী:
সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়াম
সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম গঠিত হয়:
- ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI)
- ও চারজন জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি নিয়ে।
এই প্যানেল হাইকোর্টের বিচারকদের সুপ্রিম কোর্টে উন্নীত করা, অথবা বিচারকদের স্থানান্তর বা পদোন্নতি সংক্রান্ত সুপারিশ করে।
হাইকোর্ট কলেজিয়াম
প্রত্যেক হাইকোর্টের কলেজিয়ামে থাকে:
- হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি
- ও সেই আদালতের দুইজন জ্যেষ্ঠ বিচারক।
এরা বিচারক নিয়োগের জন্য সুপারিশ তৈরি করে, যা পরে সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়ামে পাঠানো হয়।
কলেজিয়াম পদ্ধতি সম্পর্কিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
- সংবিধানভিত্তিক নয়: এটি সংবিধানের কোনো ধারা দ্বারা গঠিত নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের বিচার বিভাগীয় আদেশের মাধ্যমে সৃষ্ট।
- আইন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা: বিচার বিভাগের পাঠানো তালিকা কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে ভারতের রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠায়।
- পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা: সরকার যদি কোনো প্রস্তাবিত নামে আপত্তি জানায়, তবে তা ফেরত পাঠাতে পারে।
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: বিচার বিভাগ যদি একই নাম পুনরায় সরকারের কাছে পাঠায়, তবে সরকার সেটি মেনে নিতে বাধ্য থাকে।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সরকার যাতে পছন্দসই ব্যক্তিদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ করে বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তাই এই ব্যবস্থা।
- স্বচ্ছতার অভাব: কার ওপর ভিত্তি করে নতুন বিচারকদের নির্বাচন করা হচ্ছে—সেই মাপকাঠি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় এটি সমালোচিত।
- স্বজনপোষণের অভিযোগ: অনেক সমালোচকের মতে, এই ব্যবস্থায় “বিচারকরাই নিজেদের উত্তরসূরি চয়ন করছেন”।
- পেন্ডিং বা বিলম্ব: সরকার ও কলেজিয়ামের মতবিরোধের কারণে অনেক সময় বিচারপতি নিয়োগে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
- এনজেএসি (NJAC) বিতর্ক: ২০১৪ সালে সংসদ ৯৯তম সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করে নতুন এনজেএসি (NJAC) আনতে চেয়েছিল।
- এনজেএসি বাতিল: ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এনজেএসি-কে অসংবিধানিক ঘোষণা করে পুনরায় আগের ব্যবস্থা বহাল রাখে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার কার্যপদ্ধতি:
কিভাবে একটি প্রস্তাব বাস্তবে বাস্তবায়িত হয় তা ধাপে ধাপে নিচে তুলে ধরা হলো:
| ধাপ | কাজ | দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশ |
| ১ম ধাপ | উপযুক্ত প্রার্থীদের নাম বাছাই ও আলোচনা | সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট প্যানেল |
| ২য় ধাপ | কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দা (IB) ও আইন মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট যাচাই | কেন্দ্রীয় সরকার / আইন মন্ত্রণালয় |
| ৩য় ধাপ | রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও গ্যাজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ | ভারতের রাষ্ট্রপতি |
কলেজিয়াম পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা
স্বচ্ছতার অভাব:
কলেজিয়াম পদ্ধতির অন্যতম বড় সমালোচনা হল — এর সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ গোপন।
সাধারণ মানুষ বা সংবাদমাধ্যম জানে না কে, কেন, এবং কীভাবে বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হচ্ছেন।
জবাবদিহিতার অভাব:
বিচারপতিদের নিজেরাই বিচারক নিয়োগ করলে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কোনও ভূমিকা থাকে না।
ফলে এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিচার বিভাগের আধিপত্য:
অনেকে মনে করেন, এই পদ্ধতিতে বিচার বিভাগ নিজেই নিজের জন্য বিচারপতি বেছে নিচ্ছে, যা এক ধরনের “জুডিশিয়াল ওলিগার্কি” তৈরি করছে।
সুবিধা ও নেতিবাচক দিক:
ইতিবাচক দিক (সুবিধা):
- রাজনৈতিক বা সরকারি চাপ থেকে মুক্ত থেকে নিরপেক্ষ রায় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
- সংবিধানের মূল ভিত্তি (Separation of Powers) রক্ষিত হয়।
নেতিবাচক দিক (অসুবিধা):
- জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি বা সংসদদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
- নিয়োগের নির্দিষ্ট যোগ্যতা বা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সরকারি লিখিত গাইডলাইন না থাকা।
আরো পড়ুন: নাগরিকতা: Citizenship. (ভারতীয় সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নং ধারা).
উপসংহার:
সামগ্রিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ভারতের আইনি কাঠামোয় কলেজিয়াম পদ্ধতি যেমন বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষায় একটি শক্ত ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, তেমনই সময়ের সাথে সাথে এর পরিচালনাগত কিছু সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে। শাসনবিভাগ বা রাজনৈতিক শক্তির কোনো অনুচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে রায় প্রদানের যে নিশ্চয়তা এই ব্যবস্থা বিচারকদের দেয়, তা যেকোনো সুস্থ গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক পূর্বশর্ত। তবে একই সাথে, বিচারক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতামান নির্ধারণ, আবেদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্বজনপোষণের মতো অভিযোগগুলো দূর করতে এই ব্যবস্থার ভেতরের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করাও একান্ত প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে জাতীয় বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (NJAC) বাতিল হলেও, কলেজিয়াম পদ্ধতিকে কীভাবে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য, আধুনিক এবং স্বচ্ছ করে তোলা যায়—তা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞ, সরকার এবং শীর্ষ আদালতের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার অবকাশ এখনও রয়ে গেছে। একটি রাষ্ট্র তখনই সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে, যখন তার শাসনবিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুনির্দিষ্ট ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আনতে পারলে কলেজিয়াম পদ্ধতি ভারতীয় সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দীর্ঘমেয়াদে আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে তুলবে।
কলেজিয়াম পদ্ধতি সম্পর্কিত শীর্ষ ২০টি সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর:
১. কলেজিয়াম পদ্ধতি কী?
উত্তর: কলেজিয়াম পদ্ধতি হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সমূহের বিচারপতি নিয়োগ এবং এক আদালত থেকে অন্য আদালতে বিচারপতিদের স্থানান্তরের (Transfer) একটি বিশেষ আইনি ব্যবস্থা।
২. ভারতের সংবিধানে কি কলেজিয়াম পদ্ধতির উল্লেখ আছে?
উত্তর: না, ভারতের মূল সংবিধানে ‘কলেজিয়াম’ শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই। সুপ্রিম কোর্টের তিনটি ঐতিহাসিক মামলার রায়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম কতজন সদস্য নিয়ে গঠিত?
উত্তর: সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম ৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত—ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্য ৪ জন প্রবীণতম বিচারপতি।
৪. হাইকোর্টের কলেজিয়ামে কারা থাকেন?
উত্তর: হাইকোর্ট কলেজিয়াম ৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত—সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ওই হাইকোর্টের অন্য ২ জন প্রবীণতম বিচারপতি।
৫. ‘Three Judges Cases’ বা ৩টি বিচারক মামলা কী কী?
উত্তর: কলেজিয়াম পদ্ধতির উদ্ভবের পেছনে ৩টি ঐতিহাসিক মামলা হলো:
- First Judges Case (১৯৮১)
- Second Judges Case (১৯৯৩)
- Third Judges Case (১৯৯৮)
৬. প্রথম বিচারক মামলায় (১৯৮১) সুপ্রিম কোর্টের রায় কী ছিল?
উত্তর: এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির মতামতের চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের (Executive) সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
৭. কোন মামলার মাধ্যমে কলেজিয়াম পদ্ধতির সূচনা হয়?
উত্তর: ১৯৯৩ সালের ‘Second Judges Case’-এর মাধ্যমে কলেজিয়াম পদ্ধতির সূচনা হয় এবং বিচারপতি নিয়োগে প্রধান বিচারপতির মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৮. ১৯৯৮ সালের তৃতীয় বিচারক মামলায় (Third Judges Case) কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়?
উত্তর: এই মামলার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের এবং হাইকোর্টের ৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কলেজিয়াম গঠনের নিয়ম সুনির্দিষ্ট করা হয়।
৯. কলেজিয়াম কীভাবে বিচারপতি পদে নাম সুপারিশ করে?
উত্তর: কলেজিয়াম উপযুক্ত প্রার্থীদের নাম বাছাই করে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয় তা যাচাই-বাছাইয়ের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে।
১০. কলেজিয়ামের সুপারিশ কি সরকার প্রত্যাখ্যান করতে পারে?
উত্তর: সরকার একবার পুনর্বিবেচনার জন্য নাম ফেরত পাঠাতে পারে। তবে কলেজিয়াম যদি সেই একই নাম পুনরায় পাঠায়, তবে সরকার তা গ্রহণে বাধ্য থাকে।
১১. বিচারপতিদের চূড়ান্তভাবে কে নিয়োগ দেন?
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগপত্র প্রদান করেন।
১২. NJAC বা জাতীয় বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন কী?
উত্তর: ২০১৪ সালে ৯৯তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার কলেজিয়াম পদ্ধতি বাতিল করে বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে ‘NJAC’ গঠন করতে চেয়েছিল।
১৩. NJAC কেন কার্যকর হয়নি?
উত্তর: ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের ৫ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ NJAC-কে অসংবিধানিক ঘোষণা করে এবং বাতিল করে দেয়, কারণ এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছিল।
১৪. সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: সংবিধানের ১২৪(২) অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত বিধান রয়েছে।
১৫. হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে বর্ণিত?
উত্তর: সংবিধানের ২১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে।
১৬. কলেজিয়াম পদ্ধতির প্রধান সুবিধা কী?
উত্তর: এই ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হলো এটি রাজনৈতিক বা সরকারের অহেতুক প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা (Independence of Judiciary) সুনিশ্চিত করে।
১৭. কলেজিয়াম পদ্ধতির প্রধান সমালোচনা বা অসুবিধা কী?
উত্তর: এতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, যোগ্যতার সুনির্দিষ্ট লিখিত মানদণ্ড নেই এবং “বিচারক নিজেই বিচারক নির্বাচন করছেন” (Nepotism) বলে সমালোচনা করা হয়।
১৮. Memorandum of Procedure (MoP) কী?
উত্তর: এটি বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্মত হওয়া একটি নির্দেশিকা বা লিখিত চুক্তি, যার ওপর ভিত্তি করে বিচারপতি নিয়োগের কাজ পরিচালিত হয়।
১৯. হাইকোর্টের বিচারপতি স্থানান্তরে (Transfer) কার ভূমিকা থাকে?
উত্তর: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ৪ জন প্রবীণ বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কলেজিয়াম যেকোনো হাইকোর্টের বিচারপতি স্থানান্তরের সুপারিশ করে।
২০. ভারতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (CJI) কীভাবে নির্বাচিত হন?
উত্তর: সাধারণত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে (Seniority) সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে প্রবীণ বিচারপতিকে ভারতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।