নাগরিকতা: Citizenship. (ভারতীয় সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নং ধারা).

নাগরিকতা: Citizenship. (ভারতীয় সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নং ধারা).

Table of Contents

ভূমিকা:

একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তার জনগণ বা নাগরিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘নাগরিকতা’ (Citizenship) কেবল একটি পরিচয়পত্র বা আইনি দলিল নয়; এটি হলো ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার এমন এক পবিত্র সামাজিক ও আইনি চুক্তি, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করেন। বিনিময়ে, তিনি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকেন এবং নিজের মৌলিক কর্তব্যসমূহ পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর যখন ভারত স্বাধীন হয়, তখন দেশভাগের ক্ষত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের অনিয়ন্ত্রিত স্থানান্তরের কারণে নাগরিকত্বের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছিল। এই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ভারতীয় সংবিধানের প্রণেতারা অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে সংবিধানের দ্বিতীয় খণ্ডে (Part II) নাগরিকতার মূল কাঠামোটি নির্ধারণ করেন।

ভারতীয় সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নম্বর ধারা মূলত ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সংবিধান কার্যকরের মুহূর্তে কারা ভারতের নাগরিক হবেন, তা নির্ধারণ করেছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে বিশ্বায়ন, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং শরণার্থী সংকটের মতো চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হয়ে ভারতের নাগরিকতা আইন একাধিকবার পরিবর্তিত ও সংশোধিত হয়েছে। ১৯৫৫ সালের মূল নাগরিকত্ব আইন থেকে শুরু করে আজকের বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত CAB (Citizenship Amendment Bill) এবং CAA (Citizenship Amendment Act)—এই সমস্ত কিছুর আইনি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা যেকোনো সচেতন নাগরিক এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (যেমন WBCS, UPSC, PSC) পরীক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য।

আজকের এই বিস্তারিত ও গবেষণামূলক নিবন্ধে আমরা ভারতীয় সংবিধানের নাগরিকতা সংক্রান্ত প্রতিটি ধারা, প্রধান প্রধান সংশোধনী আইন এবং সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চর্চিত বিষয় সিএএ (CAA) নিয়ে সম্পূর্ণ ও সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

নাগরিকতা

ভারতীয় নাগরিকতা -র মূল ভিত্তি ও সাধারণ বৈশিষ্ট্য (Core Features of Indian Citizenship):

ভারতীয় সংবিধানের নাগরিকত্ব অধ্যায়ে প্রবেশ করার আগে এর কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন, যা ভারতকে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে:

  • একক নাগরিকতা (Single Citizenship): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ডের মতো ফেডারেল রাষ্ট্রগুলোতে দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) দেখা যায়, যেখানে একজন ব্যক্তি একই সাথে নির্দিষ্ট রাজ্যের এবং সমগ্র দেশের নাগরিক হন। কিন্তু ভারতে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো থাকা সত্ত্বেও একক নাগরিকতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা মহারাষ্ট্রের আলাদা নাগরিক নন; তিনি শুধুমাত্র এবং সর্বাগ্রে “ভারতের নাগরিক”। এই ধারণাটি আমরা ব্রিটিশ সংবিধান (British Constitution) থেকে গ্রহণ করেছি। এটি দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  • সংবিধানের ২য় খণ্ড এবং ধারা: নাগরিকতার বিষয়টি সংবিধানের দ্বিতীয় খণ্ডে (Part II) ধারা ৫ থেকে ১১-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
  • সংসদের একচেটিয়া ক্ষমতা: ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, নাগরিকতা সম্পর্কিত যেকোনো আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা রদবদল করার চূড়ান্ত এবং একচেটিয়া ক্ষমতা রয়েছে কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় আইনসভা অর্থাৎ ভারতের সংসদের (Parliament)। রাজ্য আইনসভাগুলোর এই বিষয়ে কোনো এক্তিয়ার নেই।

ভারতীয় সংবিধানের নাগরিকতা ৫ থেকে ১১ নং ধারা:

সংবিধান চালুর সময় (২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০) কারা ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন, তা এই ৭টি ধারার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। নিচে প্রতিটি ধারার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

ধারাআইনি বিষয়বস্তু ও মূল নির্যাস
ধারা ৫সংবিধান চালুর সময়ে (২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০) ভারতের আদি বাসিন্দা বা মূল অধিবাসীদের নাগরিকতা।
ধারা ৬দেশভাগের পর পাকিস্তান থেকে ভারতে স্থানান্তরিত (Migrated) ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের অধিকার।
ধারা ৭ভারত থেকে পাকিস্তানে গমনকারী এবং পুনরায় ভারতে ফিরে আসা ব্যক্তিদের নাগরিকতার নিয়ম।
ধারা ৮অবিভক্ত ভারতের বাইরে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের (PIO) নাগরিকত্ব পাওয়ার বিশেষ সুবিধা।
ধারা ৯স্বেচ্ছায় কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে ভারতীয় নাগরিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোপ পাওয়া (একক নাগরিকত্ব নীতি)।
ধারা ১০নাগরিকদের নাগরিকত্বের অধিকারের ধারাবাহিকতা ও আইনি সুরক্ষা (সংসদের আইন ছাড়া নাগরিকত্ব হরণ অসম্ভব)।
ধারা ১১সংসদকে (Parliament) ভবিষ্যৎ নাগরিকত্ব আইন নিয়ন্ত্রণ, অর্জন, অবসান ও সংশোধনের চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রদান।
  • উৎস: এই পুরো নাগরিকত্ব ব্যবস্থা এবং একক নাগরিকত্বের (Single Citizenship) ধারণাটি ব্রিটেনের সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত।
  • ক্ষমতা: ধারা ১১-এর ওপর ভিত্তি করেই ভারতের সংসদ নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ (Citizenship Act, 1955) তৈরি করেছে, যা পরবর্তীতে বহুবার (যেমন: ১৯৮৬, ২০০৩, ২০১৯-CAA) সংশোধিত হয়েছে।

ধারা ৫: সংবিধান প্রবর্তনের সময় নাগরিকতা (Citizenship at the Commencement of the Constitution):

ধারা ৫ অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যারা ভারতের ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন (Domicile), তারা প্রত্যেকেই ভারতের নাগরিক হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন, যদি তারা নিচের তিনটি শর্তের মধ্যে যেকোনো একটি পূরণ করতেন:

  1. যদি ওই ব্যক্তি নিজে ভারতের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে থাকেন; অথবা
  2. যদি ওই ব্যক্তির পিতা বা মাতার মধ্যে যেকোনো একজন ভারতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন; অথবা
  3. যদি ওই ব্যক্তি সংবিধান কার্যকর হওয়ার ঠিক আগের অন্তত ৫ বছর ধরে ভারতে সাধারণভাবে বসবাস করে আসছিলেন (অর্থাৎ ১৯৪৫ সাল থেকে ভারতে থাকছিলেন)।

ধারা ৬: পাকিস্তান থেকে ভারতে আগত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব (Citizenship of Certain Persons who migrated to India from Pakistan):

দেশভাগের ফলে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলা ও বিশাল শরণার্থী স্রোতকে সামাল দিতে ধারা ৬ যুক্ত করা হয়। এই ধারায় অবিভক্ত পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসা মানুষের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (Cut-off Date) নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা হলো ১৯ জুলাই, ১৯৪৮ (এই দিন ভারতে প্রবেশাধিকার বা পারমিট ব্যবস্থা চালু হয়েছিল)।

  • শর্ত (ক): যারা ১৯ জুলাই, ১৯৪৮-এর আগে পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন, তারা ভারতে আসার পর থেকে সাধারণভাবে বসবাস করলেই সরাসরি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন।
  • শর্ত (খ): যারা ১৯ জুলাই, ১৯৪৮-এর পরে ভারতে এসেছেন, তাদের নাগরিকত্ব পেতে হলে ভারতে আসার পর অন্তত ৬ মাস একটানা বসবাস করতে হতো এবং তারপর ভারত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত উপযুক্ত অফিসারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে নিজের নাম নথিভুক্ত (Register) করতে হতো।

ধারা ৭: পাকিস্তানে স্থানান্তরিত এবং পুনরায় ভারতে প্রত্যাবর্তনকারীদের নাগরিকত্ব (Rights of Citizenship of Certain Migrants to Pakistan):

দেশভাগের সময় এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বহু মানুষ আবেগের বশে বা আতঙ্কে ভারতে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান, কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে পুনরায় ভারতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ধারা ৭ এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

  • এই ধারায় বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি ১ মার্চ, ১৯৪৭-এর পর ভারত ভূখণ্ড ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গিয়ে থাকেন, তবে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব হারাবেন।
  • তবে, সেই ব্যক্তি যদি পাকিস্তান যাওয়ার পর সেখানে স্থায়ীভাবে না থেকে, পুনরায় পুনর্বাসন বা স্থায়ীভাবে বসবাসের আইনি পারমিট (Permit for Resettlement) নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন, তবে তাকে ধারা ৬(খ) এর মতো নিয়ম মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ, তাকে ভারতে অন্তত ৬ মাস থাকতে হবে এবং তারপর নিবন্ধীকরণের জন্য আবেদন করতে হবে।

ধারা ৮: ভারতের বাইরে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের নাগরিকত্ব (Rights of Citizenship of Certain Persons of Indian Origin Residing Outside India):

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং তার আগে বহু ভারতীয় শিক্ষা, ব্যবসা বা জীবিকার তাগিদে বিদেশে (যেমন ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, আফ্রিকা) বসবাস করছিলেন। সংবিধান চালুর সময় তাদের এবং তাদের সন্তানদের নাগরিকত্বের অধিকার সুনিশ্চিত করে ধারা ৮।

  • যদি কোনো ব্যক্তি বা তার পিতা-মাতা অথবা পিতামহ-পিতামহীর কেউ একজন অবিভক্ত ভারতে (Government of India Act, 1935 অনুযায়ী নির্ধারিত ভারতে) জন্মগ্রহণ করে থাকেন এবং তিনি ভারতের বাইরে যেকোনো দেশে সাধারণভাবে বসবাস করছেন, তবে তিনি ভারতের নাগরিক হতে পারবেন।
  • এর জন্য তাকে ওই নির্দিষ্ট দেশে অবস্থিত ভারতের কূটনৈতিক বা কনস্যুলার প্রতিনিধির (Diplomatic or Consular Representative) কাছে ভারত সরকার নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে নাগরিক হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে হতো।

ধারা ৯: বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলে নাগরিকত্ব বিলোপ (Persons Voluntarily Acquiring Citizenship of a Foreign State not to be Citizens):

ধারা ৯ ভারতের একক নাগরিকত্ব নীতিকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়। এটি একটি নেতিবাচক বা বর্জনমূলক ধারা।

  • এই ধারা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে যে, যদি কোনো ভারতীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় অন্য কোনো দেশের (বিদেশী রাষ্ট্রের) নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব সেই মুহূর্তেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
  • এর পর তিনি ধারা ৫, ৬ বা ৮-এর অধীনে ভারতের নাগরিকত্বের দাবি করতে পারবেন না।

ধারা ১০: নাগরিকত্বের অধিকারের স্থায়িত্ব (Continuance of the Rights of Citizenship):

নাগরিকত্ব যেন কোনো রাজনৈতিক দলের বা সরকারের খামখেয়ালিপনার শিকার না হয়, তার জন্য ধারা ১০ নাগরিকদের আইনি নিশ্চয়তা দেয়।

  • এই ধারা অনুযায়ী, যে সকল ব্যক্তি সংবিধানের এই দ্বিতীয় খণ্ডের পূর্ববর্তী ধারাগুলোর (ধারা ৫ থেকে ৮) অধীনে ভারতের নাগরিক হয়েছেন বা নাগরিক বলে গণ্য হয়েছেন, তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ভবিষ্যৎ দিনগুলোতেও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
  • সংসদ যদি কোনো নির্দিষ্ট আইন পাস করে, তবে একমাত্র সেই আইনের বিধান সাপেক্ষেই কারো নাগরিকত্ব পরিবর্তন বা খর্ব করা যেতে পারে, অন্য কোনো নির্বাহী আদেশে নয়।

ধারা ১১: সংসদ কর্তৃক নাগরিকত্ব আইন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (Parliament to Regulate the Right of Citizenship by Law):

ধারা ১১ হলো ভারতের নাগরিকত্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। সংবিধান প্রণেতারা জানতেন যে, সংবিধানের ২য় খণ্ডের ধারাগুলো কেবল ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারির সাময়িক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তৈরি। ভবিষ্যৎ ভারতের নাগরিকত্ব কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তার স্থায়ী রূপরেখা সংবিধানে সরাসরি না রেখে সেই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয় দেশের আইনসভাকে।

  • এই ধারা সংসদকে (Parliament) নাগরিকত্ব অর্জন (Acquisition), নাগরিকত্ব অবসান (Termination) এবং নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অন্য যেকোনো বিষয়ে সম্পূর্ণ আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের চূড়ান্ত ও সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করে।
  • এই ধারাটির ওপর ভিত্তি করেই ভারতের সংসদ ১৯৫৫ সালে বিখ্যাত মূল নাগরিকত্ব আইনটি পাস করে।

নাগরিকতা আইন, ১৯৫৫ (The Citizenship Act, 1955):

সংবিধানের ১১ নম্বর ধারার ক্ষমতা ব্যবহার করে ভারতের সংসদ ১৯৫৫ সালে নাগরিকতা আইন, ১৯৫৫ (The Citizenship Act, 1955) পাস করে। এই আইনটিই হলো স্বাধীন ভারতে নাগরিকত্ব পাওয়া বা হারানোর মূল আইনি দলিল। এই আইনের অধীনে ভারতে নাগরিকত্ব পাওয়ার ৫টি উপায় এবং নাগরিকত্ব হারানোর ৩টি উপায়ের কথা বলা হয়েছে।

নাগরিকত্ব অর্জনের ৫টি উপায় (Ways to Acquire Citizenship):

  1. জন্মসূত্রে (By Birth): ভারতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিরা এই নিয়মে নাগরিকত্ব পান। তবে সময়ের সাথে সাথে এতে কড়াকড়ি আনা হয়েছে (যেমন বর্তমানে কেবল ভারতে জন্মালেই হবে না, পিতা-মাতার অন্তত একজনকে ভারতীয় হতে হবে এবং অপরজনকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হওয়া চলবে না)।
  2. বংশানুক্রমিকভাবে (By Descent): যদি কোনো ব্যক্তি ভারতের বাইরে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু তার জন্মের সময় তার পিতা বা মাতা ভারতের নাগরিক থাকেন, তবে তিনি বংশানুক্রমে ভারতের নাগরিকত্ব দাবি করতে পারেন।
  3. নিবন্ধীকরণ বা রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে (By Registration): কোনো ব্যক্তি যদি ভারতীয় বংশোদ্ভূত হন কিন্তু বর্তমানে বিদেশে আছেন, অথবা কোনো বিদেশী ব্যক্তি যদি কোনো ভারতীয় নাগরিককে বিবাহ করেন, তবে তারা নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৭ বছর) ভারতে বসবাসের পর আবেদনের মাধ্যমে এই নাগরিকত্ব পেতে পারেন।
  4. দেশীয়করণের মাধ্যমে (By Naturalization): কোনো বিদেশী নাগরিক (যিনি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন) যদি ভারতে দীর্ঘ সময় (সাধারণত ১২ বছর) বসবাস করেন, ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হন এবং সংবিধানের ৮ম তফসিলের যেকোনো একটি ভাষা জানেন, তবে তিনি ভারত সরকারের কাছে দেশীয়করণের আবেদন করতে পারেন।
  5. ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্তির দ্বারা (By Incorporation of Territory): যদি কোনো নতুন ভৌগোলিক অঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় (যেমন ১৯৬১ সালে গোয়া বা ১৯৭৫ সালে সিকিম যখন ভারতের অংশ হয়েছিল), তবে ভারত সরকার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে।

নাগরিকত্ব হারানোর ৩টি উপায় (Ways to Lose Citizenship):

  1. স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ (By Renunciation): কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিক যদি সুস্থ মস্তিস্কে নিজে থেকে ঘোষণা করেন যে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন, তবে তার নাগরিকত্ব শেষ হয়।
  2. অবসান বা বিলুপ্তি (By Termination): ধারা ৯-এর ওপর ভিত্তি করে, কোনো ভারতীয় নাগরিক যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনি প্রক্রিয়ায় অবসান ঘটে।
  3. সরকার কর্তৃক হরণ বা বঞ্চনা (By Deprivation): যদি কোনো ব্যক্তি জালিয়াতি, জালিয়াতি সার্টিফিকেট বা দেশদ্রোহিতার মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করে থাকেন, অথবা যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষকে সাহায্য করেন, তবে ভারত সরকার বাধ্যতামূলকভাবে তার নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে নাগরিকতা আইনের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীবালী (Major Amendments to Citizenship Act):

১৯৫৫ সালের মূল নাগরিকতা আইনটি সময়ের প্রয়োজনে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান বা আইনি সংশোধনীগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:

বছরসংশোধনের মূল ফোকাস ও গুরুত্ব
১৯৮৬আসাম চুক্তির প্রেক্ষাপট: জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়মে প্রথমবার কড়াকড়ি আরোপ করা হয় (শুধুমাত্র ভারতে জন্মালেই হবে না, পিতা-মাতার যেকোনো একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে)।
১৯৯২লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ: ভারতের বাইরে জন্ম নেওয়া সন্তানদের ক্ষেত্রে মাতার বংশানুক্রমেও ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি অধিকার প্রদান করা হয় (পূর্বে যা কেবল পিতার সূত্রে ছিল)।
২০০৩অনুপ্রবেশ রোধ ও নতুন কার্ড: নাগরিকত্ব আইনে প্রথমবার ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শব্দের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (NRC) এবং ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (OCI) কার্ড ব্যবস্থার আইনি সূচনা হয়।
২০০৫OCI ব্যবস্থার সম্প্রসারণ: নির্দিষ্ট কিছু দেশের প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া (OCI) সুবিধা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
২০১৫কার্ড একত্রীকরণ: প্রবাসীদের আইনি প্রক্রিয়া সহজ করতে পূর্বের PIO (Person of Indian Origin) এবং OCI কার্ডকে একসাথে মার্জ (Merge) বা একত্রীকরণ করা হয়।
২০১৯শরণার্থী সংক্রান্ত (CAA): পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪-এর আগে ভারতে আসা নির্দিষ্ট ৬টি অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদানের বিশেষ নিয়ম করা হয়।

১৯৮৬ সালের নাগরিকতা সংশোধনী (The 1986 Amendment):

এই সংশোধনীর মূল কারণ ছিল আসামের ছাত্র আন্দোলন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের সমস্যা (আসাম চুক্তি ১৯৮৫)। এই সংশোধনীর মাধ্যমে নিয়ম করা হয় যে, ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে ১ জুলাই ১৯৮৭ সালের মধ্যে ভারতে জন্মানো সবাই জন্মসূত্রে নাগরিক। কিন্তু ১ জুলাই ১৯৮৭-এর পর ভারতে জন্মালে কেবল নিজে জন্মালেই হবে না, জন্মের সময় তার পিতা বা মাতার যেকোনো একজনকে ভারতের নাগরিক হতে হবে।

১৯৯২ সালের নাগরিকতা সংশোধনী (The 1992 Amendment):

পূর্বের আইনে বলা ছিল, ভারতের বাইরে জন্মালে কেবল পিতার ভারতীয় নাগরিকত্বের সূত্রেই সন্তান নাগরিকত্ব পাবে। ১৯৯২ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা হয়। এখন থেকে পিতার পাশাপাশি মাতার ভারতীয় নাগরিকত্বের সূত্রেও ভারতের বাইরে জন্মানো সন্তান বংশানুক্রমিক নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী হয়।

২০০৩ সালের নাগরিকতা সংশোধনী (The 2003 Amendment):

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংশোধনী (বাজপেয়ী সরকারের আমলে)।

  • এই আইনে প্রথমবার “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” (Illegal Migrant) শব্দটির আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয় এবং বলা হয় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কোনোভাবেই নাগরিকত্ব পাবে না।
  • জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম আরও কঠিন করা হয়— পিতা-মাতার একজন ভারতীয় এবং অপরজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হওয়া চলবে না।
  • এই সংশোধনীর মাধ্যমেই দেশে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (National Register of Citizens – NRC) তৈরি এবং পাসপোর্ট বা ওআইসি (OCI – Overseas Citizenship of India) কার্ড দেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়।

২০০৫ ও ২০১৫ সালের নাগরিকতা সংশোধনী (2005 & 2015 Amendments):

এই সংশোধনীগুলো মূলত ভারতীয় প্রবাসী বা ডায়াসপোরার (Diaspora) সুবিধার্থে করা হয়েছিল। ২০১৫ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্বের PIO (Person of Indian Origin) কার্ড এবং OCI (Overseas Citizen of India) কার্ডকে একত্রিত করে একটি মাত্র “OCI Cardholder” স্কিম চালু করা হয়।

CAB এবং CAA (The CAB & CAA Phenomenon):

বর্তমান ভারতের রাজনীতি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো CAB এবং CAA। অনেকের মনে এই দুটি শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। নিচে এদের সহজ ও নিখুঁত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

CAB বনাম CAA: পার্থক্য কী?

  • CAB (Citizenship Amendment Bill): এটি হলো ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল’ বা খসড়া প্রস্তাব। কোনো আইন যখন সংসদে আলোচনার জন্য আনা হয় কিন্তু তা পাস হয় না, তখন তাকে বিল (Bill) বলা হয়। এটি ছিল বিল নম্বর ১২৬ (২০১৯)।
  • CAA (Citizenship Amendment Act): যখন এই বিলটি লোকসভা এবং রাজ্যসভা—উভয় কক্ষে পাস হয়ে যায় এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি তাতে স্বাক্ষর করেন, তখন তা আইনে পরিণত হয়। ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর CAB পরিবর্তিত হয়ে CAA (Citizenship Amendment Act, 2019) বা ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯’-এ রূপান্তরিত হয়।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, ২০১৯ (CAA) এর মূল বিষয়বস্তু:

এই আইনের মাধ্যমে ১৯৫৫ সালের মূল নাগরিকত্ব আইনে একটি বিশেষ ছাড় বা সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মূল শর্তগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  1. নির্দিষ্ট ৩টি দেশ: পাকিস্তান (Pakistan), বাংলাদেশ (Bangladesh), এবং আফগানিস্তান (Afghanistan)।
  2. নির্দিষ্ট ৬টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়: হিন্দু (Hindu), শিখ (Sikh), বৌদ্ধ (Buddhist), জৈন (Jain), পার্সি (Parsi), এবং খ্রিস্টান (Christian)।
  3. কাট-অফ ডেট (Cut-off Date): ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ বা তার আগে যারা ধর্মীয় নিপীড়নের (Religious Persecution) শিকার হয়ে এই তিনটি দেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন।
  4. আইনি শিথিলতা: এই নির্দিষ্ট শরণার্থীদের আর “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে গণ্য করা হবে না। তাদের ক্ষেত্রে দেশীয়করণের (Naturalization) মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সময়সীমা ১১ বছর থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ বছর করা হয়েছে।

বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও আইনি চ্যালেঞ্জ:

CAA আইনটি নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল আন্দোলন ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। বিতর্কের মূল কারণগুলো হলো:

  • ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব: সমালোচকদের মতে, এই আইনে মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারার (সাম্যের অধিকার) এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) কাঠামোর পরিপন্থী।
  • উত্তর-পূর্ব ভারতের উদ্বেগ: আসাম, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের আশঙ্কা, এই আইনের ফলে বিপুল সংখ্যক বিদেশী শরণার্থী নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন, যার ফলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যার ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংবিধানের ৬ষ্ঠ তফসিলভুক্ত আদিবাসী এলাকা এবং ইনার লাইন পারমিট (ILP) থাকা রাজ্যগুলোতে CAA কার্যকর হবে না।

সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া কিছু বিভ্রান্তি ও তার আসল সত্য (Myth vs Reality)

ভুল ধারণা ১: CAA-এর মাধ্যমে ভারতের বর্তমান মুসলিম নাগরিকদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে।

  • আসল সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। CAA হলো নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন, কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আইন নয়। ভারতের কোনো বৈধ নাগরিকের (তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন) নাগরিকত্বের সাথে এই আইনের কোনো সম্পর্ক নেই।

ভুল ধারণা ২: এই আইনের মাধ্যমে যেকোনো বিদেশী ভারতে এসে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন।

  • আসল সত্য: না, শুধুমাত্র বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ সালের আগে আসা নির্দিষ্ট ৬টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেবল তারাই এই আইনের সুফল পাবেন।

NRC কি?

NRC-এর পুরো নাম হলো National Register of Citizens (বাংলায়: জাতীয় নাগরিক পঞ্জী)।

সহজ কথায়, এটি হলো একটি নির্দিষ্ট দেশের বৈধ আইনি নাগরিকদের একটি সরকারি খাতা বা ডেটাবেস। কোনো ব্যক্তি আসলেই সেই দেশের বৈধ নাগরিক কি না, তা যাচাই করার জন্য এই তালিকা ব্যবহার করা হয়।

নিচে NRC সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হলো:

এনআরসি (NRC)-এর মূল উদ্দেশ্য কী?

NRC-এর মূল লক্ষ্য হলো একটি নির্দিষ্ট দেশের বৈধ নাগরিকদের চিহ্নিত করা এবং যারা অবৈধভাবে বা নথিপত্র ছাড়া সেই দেশে প্রবেশ করেছেন (অবৈধ অনুপ্রবেশকারী), তাদের আলাদা করা। এর মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়।

ভারতের প্রেক্ষাপটে NRC:

ভারতে এনআরসি-র ইতিহাস মূলত আসাম রাজ্যের সাথে যুক্ত:

  • ১৯৫১ সালের প্রথম এনআরসি: ১৯৫১ সালের আদমশুমারির (Census) ওপর ভিত্তি করে ভারতের মধ্যে প্রথমবার শুধুমাত্র আসাম রাজ্যে এনআরসি (NRC) তৈরি করা হয়েছিল।
  • আসামের সাম্প্রতিক এনআরসি (২০১৯): বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে আসামে এনআরসি তালিকা আপডেট করা হয়, যা ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছিল। এই তালিকায় নাম তোলার জন্য ২৪ মার্চ, ১৯৭১ (বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগের দিন)-এর আগে ব্যক্তি বা তার পূর্বপুরুষরা যে ভারতে বাস করতেন, তার প্রমাণ বা নথিপত্র দেখাতে হয়েছিল।

এনআরসি-র আইনি ভিত্তি:

২০০৩ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইন (১৯৫৫)-এর সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (NRC) তৈরির আইনি ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, সরকার চাইলে সারা দেশে নাগরিকদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে পারে।

CAA এবং NRC-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

অনেকেই এই দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু এদের মধ্যে বড় তফাত রয়েছে:

  • CAA (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন): এটি পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে ভারতে চলে আসা নির্দিষ্ট ৬টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন।
  • NRC (জাতীয় নাগরিক পঞ্জী): এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য নয়। এটি ভারতের সমস্ত নাগরিকের বৈধতা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বৈধ নাগরিক ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আলাদা করা হয়।

সারসংক্ষেপ: NRC হলো এমন একটি আইনি নাগরিক তালিকা, যা প্রমাণ করে যে আপনি রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই দেশের একজন বৈধ এবং স্বীকৃত বাসিন্দা।

নাগরিকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর:

১. ভারতীয় সংবিধানের কোন পার্টে নাগরিকতা নিয়ে বলা হয়েছে?

ভারতীয় সংবিধানের ২য় খণ্ডে (Part II) ধারা ৫ থেকে ১১-এর মধ্যে নাগরিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন প্রথম কবে পাস হয়?

১৯৫৫ সালে প্রথম ‘নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫’ পাস হয়েছিল।

৩. CAA-এর পুরো নাম কী এবং এটি কবে পাস হয়?

CAA-এর পুরো নাম Citizenship Amendment Act (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন)। এটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সংসদের উভয় কক্ষে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায় (২০২৪ সালের মার্চ মাসে এর রুলস বা নিয়মাবলী নোটিফাই করা হয়)।

৪. ভারতে কি দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদিত?

না, ভারতের সংবিধানে শুধুমাত্র একক নাগরিকত্ব (Single Citizenship) স্বীকৃত। কোনো ভারতীয় নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিলে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়।

৫. NRI এবং OCI-এর মধ্যে মূল তফাত কী?

NRI (Non-Resident Indian) হলেন ভারতের নাগরিক যিনি কেবল কাজের সূত্রে বিদেশে থাকেন (তার কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট থাকে)। অন্যদিকে OCI (Overseas Citizen of India) কার্ডহোল্ডাররা হলেন বিদেশী নাগরিক যাদের শিকড় ভারতে ছিল, তারা ভারতে ভোট দিতে পারেন না কিন্তু ভিসা ছাড়াই ভারতে আসার সুবিধা পান।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নম্বর ধারা এবং পরবর্তী সময়ে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনসমূহ ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শক্তিশালী স্তম্ভ। দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সংবিধানে যে নাগরিকত্বের কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তা সময়ের সাথে সাথে জাতীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধনে পরিবর্তিত হয়েছে।

১৯৮৬, ২০০৩ কিংবা সাম্প্রতিক ২০১৯ সালের সংশোধনী (CAA)—প্রতিটি পদক্ষেপই ভারতের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়ার আইনি তাগিদ থেকে উদ্ভূত। তবে আইন যেমনই হোক না কেন, ভারতীয় সংবিধানের মূল আদর্শ অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, তা সুনিশ্চিত করাই ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও চ্যালেঞ্জ। নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এই আইনগুলোর রাজনৈতিক অপপ্রচারে কান না দিয়ে, এর সঠিক আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা।