ভূমিকা:
ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি ছিল উপনিবেশিক শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসকরা প্রশাসনিক সুবিধা ও তাদের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শিক্ষানীতি প্রবর্তন করেন। ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যেমন ১৮৩৫ সালের ম্যাকলে মিনিট, ১৮৫৪ সালের উডস ডিসপ্যাচ এবং ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তার লাভ করে এবং আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও পাশ্চাত্য চিন্তাধারার প্রসার ঘটে। ফলে সমাজে একটি নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়, যা পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ভারতের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ বুঝতে হলে ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি সম্পর্কে জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ মূলত ব্রিটিশ শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা, কিন্তু শাসনভার সুসংহত করার জন্য শিক্ষানীতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৮৩৫ সালে থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে-এর ‘ম্যাকলের মিনিট’ ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি পাশ্চাত্য জ্ঞান ও ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন, যারা ব্রিটিশ শাসনের সহায়ক হবে।
পরবর্তীতে ১৮৫৪ সালের উডস ডিসপ্যাচ শিক্ষাব্যবস্থার সংগঠিত রূপরেখা প্রদান করে, যা ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে ‘শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা’ নামে পরিচিত। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা আধুনিক উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে।
তবে এই শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে মানবকল্যাণমূলক ছিল না; বরং প্রশাসনিক কাজের জন্য এক শ্রেণির কর্মচারী তৈরি করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তবুও এই নীতির ফলে ভারতে নবজাগরণ, জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে। ফলে ব্রিটিশ আমলের শিক্ষানীতি ভারতীয় সমাজে গভীর ও বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে।

ব্রিটিশ শাসনে শিক্ষার সূচনা ও প্রারম্ভিক পদক্ষেপ:
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তার ঘটাচ্ছিল, তখন শিক্ষার উন্নতির প্রতি তাদের কোনো বিশেষ আগ্রহ ছিল না। ব্যবসায়ী কোম্পানি হিসেবে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। তবুও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং পরবর্তীতে শাসনকার্য পরিচালনার প্রশাসনিক তাগিদে কয়েকজন ইংরেজ কর্মকর্তা প্রাথমিক কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
ওয়ারেন হেস্টিংস ও কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৮১)
বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম আইন ও আরবি-ফারসি ভাষায় পারদর্শী এমন ব্যক্তিদের তৈরি করা, যারা কোম্পানিকে বিচারব্যবস্থা ও রাজস্ব আদায়ে সাহায্য করতে পারবে।
স্যার উইলিয়াম জোন্স ও এশিয়াটিক সোসাইটি (১৭৮৪)
১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি স্থাপন করেন। প্রাচ্যের ঐতিহ্য, সংস্কৃত ও ফারসি সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার, গবেষণা এবং অনুবাদে এই সংস্থা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।
জোনাথন ডানকান ও বারাণসী সংস্কৃত কলেজ (১৭৯১)
১৭৯১ সালে বারাণসীর রেসিডেন্ট জোনাথন ডানকান একটি সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করেন। এর লক্ষ্য ছিল হিন্দু আইন ও দর্শন চর্চার মাধ্যমে আদালত ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে হিন্দু পণ্ডিতদের সহায়তা গ্রহণ করা।
লর্ড ওয়েলেসলি ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০)
বিলেত থেকে ভারতে আসা তরুণ সিভিল সার্ভেন্ট বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভারতীয় ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন।
চার্টার অ্যাক্ট ১৮১৩: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম আইনি ভিত্তি
১৮১৩ সালের সনদের আইন বা Charter Act of 1813 আধুনিক ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি গঠনে একটি জলবিভাজক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার দায়ভার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে অর্পিত হয়।
চার্টার অ্যাক্ট ১৮১৩-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- বার্ষিক অনুদান: ভারতে শিক্ষা প্রসারের জন্য কোম্পানিকে প্রতি বছর অন্তত ১ লাখ টাকা বরাদ্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
- খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন: মিশনারিদের ভারতে প্রবেশ এবং শিক্ষা ও ধর্মপ্রচারের অবাধ অনুমতি দেওয়া হয়।
- প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য বিতর্ক: এই অনুদানের টাকা কোন শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে ব্যয় করা হবে—সংস্কৃত ও আরবি প্রাচ্য শিক্ষার পেছনে নাকি ইংরেজি পাশ্চাত্য শিক্ষার পেছনে—তা নিয়ে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক।
প্রাচ্যবিদ ও পাশ্চাত্যবিদ বিতর্ক (Anglicist-Orientalist Controversy)
১৮১৩ সালের পর শিক্ষা সংক্রান্ত অনুদানের টাকা কীভাবে খরচ করা হবে, তা নিয়ে কোম্পানির প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা দুটি স্পষ্ট অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েন:
- প্রাচ্যবিদ (Orientalists): এইচ. টি. প্রিন্সেপ এবং উইলিয়াম জোন্সের মতো ব্যক্তিরা মনে করতেন ভারতের ঐতিহ্যবাহী ভাষা যেমন সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি শিক্ষার বিকাশ ঘটানো উচিত।
- পাশ্চাটাইজড বা পাশ্চাত্যবিদ (Anglicists): লর্ড মেকলে, চার্লস ট্র্যাভেলিয়ান এবং ভারতীয় সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় যুক্তি দেন যে প্রাচ্যের শিক্ষা অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে ভরা। ভারতকে আধুনিক করতে হলে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রসার ঘটাতে হবে।
মেকলে মিনিট (১৮৩৫) ও ‘ডাউনওয়ার্ড ফিল্টারেশন থিওরি’
১৮৩৫ সালে জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি লর্ড ব্যাবিংটন মেকলে তাঁর বিখ্যাত ‘মেকলে মিনিট’ (Macaulay’s Minute) পেশ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে প্রাচ্যের সমস্ত সাহিত্য ইউরোপের একটি উন্নত লাইব্রেরির মাত্র একটি তাকের সমান।
ডাউনওয়ার্ড ফিল্টারেশন থিওরি (Downward Filtration Theory):
মেকলে বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ভারতের বিশাল জনসংখ্যার কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব। তাই তিনি প্রস্তাব করেন যে কেবল উচ্চবিত্ত ও সমাজের উচ্চস্তরের কিছু লোককে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করা হবে। সেই শিক্ষিত শ্রেণী থেকে ধীরে ধীরে শিক্ষা চুইয়ে বা পরিশ্রুত হয়ে (Filtration) সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
মেকলের বিখ্যাত উক্তি:“আমরা এমন এক শ্রেণী তৈরি করতে চাই যা আমাদের এবং আমাদের কোটি কোটি প্রজার মধ্যে দোভাষী হিসেবে কাজ করবে—রক্তে ও বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় ইংরেজ।”
আরো পড়ুন:রাজা রামমোহন রায় ও আধুনিক ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলন
উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): ভারতীয় শিক্ষার ‘ম্যাগনা কার্টা’
১৮৫৪ সালে বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতের শিক্ষার জন্য একটি সার্বিক ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা পেশ করেন, যা ঐতিহাসিক মহলে উডের ডেসপ্যাচ (Wood’s Despatch) নামে পরিচিত। এটিকে ভারতীয় আধুনিক শিক্ষা কাঠামোর ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলা হয়।
প্রধান প্রধান সুপারিশসমূহ:
১. শিক্ষা দপ্তর গঠন: ভারতের প্রতি প্রদেশে একটি করে পৃথক ‘জনশিক্ষা বিভাগ’ বা Department of Public Instruction (DPI) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২. বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন: লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় (এরই প্রেক্ষিতে ১৮৫৭ সালে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়)।
৩. অনুপাতভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা: প্রাথমিক স্তরে দেশীয় ভাষা (Vernacular), মাধ্যমিক স্তরে দ্বিভাষিক এবং উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি মাধ্যম চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪. নারী শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: নারী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং শিক্ষকদের মানোন্নয়নে টিচার্স ট্রেনিং স্কুল স্থাপনের কথা বলা হয়।
৫. অনুদান প্রথা (Grants-in-Aid): বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়।
ব্রিটিশ আমলের প্রধান শিক্ষা কমিশন ও তাদের প্রভাব
উডের ডেসপ্যাচের পর ভারতে শিক্ষার বিস্তার পর্যালোচনা ও নতুন দিশা দেওয়ার জন্য একাধিক কমিশন গঠন করা হয়।
| কমিশনের নাম | বছর | তৎকালীন গভর্নর জেনারেল / ভাইসরয় | প্রধান লক্ষ্য ও সুপারিশ |
| হান্টার কমিশন | ১৮৮২ | লর্ড রিপন | প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর জোরদান, বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ |
| র্যালে কমিশন (বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন) | ১৯০২ | লর্ড কার্জন | বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুনর্গঠন ও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি |
| স্যাডলার কমিশন (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন) | ১৯১৭ | লর্ড চেমসফোর্ড | মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পৃথকীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার |
| হার্টগ কমিটি | ১৯২৯ | লর্ড আরউইন | প্রাথমিকে শিক্ষার অপচয় (Wastage and Stagnation) রোধ করা |
| সার্জেন্ট পরিকল্পনা | ১৯৪৪ | লর্ড ওয়াভেল | ৬ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু |
বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
হান্টার কমিশন (১৮৮২)
স্যার উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন মূলত ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে গঠিত হয়। এই কমিশন সুপারিশ করে যে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা যেমন জেলা বোর্ড ও পৌরসভার হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
১৯০৪ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন
লর্ড কার্জন মনে করতেন যে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিপ্লবী চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। তাই ১৯০২ সালের র্যালে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯০৪ সালে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
স্যাডলার কমিশন (১৯১৭)
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকারিতা ও সমস্যা সমাধানের জন্য ড. মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ নামক দুজন ভারতীয় সদস্য ছিলেন। এই কমিশনই প্রথম ১২ বছরের স্কুল শিক্ষার পর ৩ বছরের ডিগ্রি কোর্সের ধারণা প্রবর্তন করে।
আরো পড়ুন:ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ও ইতিহাস
জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন ও দেশীয় প্রতিক্রিয়া
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি ভারতীয়দের প্রশাসনিক প্রয়োজনে ব্যবহারের উপযোগী করে তুললেও তা জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের (National Education Movement) সূচনা হয়।
- ১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলন: বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত স্কুল-কলেজ বর্জন করে ভারতীয়রা নিজস্ব ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ (National Council of Education) গঠন করেন, যার মাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের জন্ম হয়।
- ওয়ার্ধা শিক্ষা পরিকল্পনা (১৯৩৭): মহাত্মা গান্ধী ১৯৩৭ সালে তাঁর ‘হরিজন’ পত্রিকায় ‘বুনিয়াদি শিক্ষা’ বা Basic Education-এর রূপরেখা তুলে ধরেন। জাকির হোসেন কমিটির নেতৃত্বে এই পরিকল্পনায় ৭ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের মাতৃভাষায় কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতির প্রভাব: ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক
ব্রিটিশ আমলের শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য যাই থাক না কেন, ভারতীয় সমাজে এর বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল।
ইতিবাচক প্রভাব:
- আধুনিক মানস ও রেনেসাঁস: ইংরেজি শিক্ষার দরুন ভারতীয় সমাজ পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান, এবং উনবিংশ শতকের ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সান্নিধ্যে আসে। ফলে বাংলায় এবং ভারতে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের জোয়ার আসে।
- জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: ইংরেজি ভাষা ভারতের বহুভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করে। আনন্দমোহন বসু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দাদাভাই নওরোজির মতো শিক্ষিত নেতারা ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ করে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন।
- বিজ্ঞান ও আইনি শিক্ষার বিকাশ: আধুনিক আইন, প্রকৌশল ও চিকিৎসা শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
নেতিবাচক প্রভাব:
- গণশিক্ষার অবহেলা: ‘ডাউনওয়ার্ড ফিল্টারেশন থিওরি’-র কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণে ঔপনিবেশিক সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
- কেরানি তৈরির কারখানা: শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল সরকারি চাকুরি ও কেরানি তৈরি করা, যা গবেষণামূলক চিন্তাভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।
- শ্রেণী বিভাজন: সমাজে একটি ক্ষুদ্র ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত শ্রেণী এবং এক বিশাল অশিক্ষিত নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ব্যবধান বহুগুণ বেড়ে যায়।
- দেশীয় ভাষার অবমূল্যায়ন: সংস্কৃত, টোল ও মাদ্রাসার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা অবক্ষয়ের মুখে পড়ে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি কোনো জনকল্যাণমূলক চিন্তাভাবনা থেকে গড়ে ওঠেনি; বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক প্রয়োজন, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষিত করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। তা সত্ত্বেও, এই নীতি ভারতীয় সমাজে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষার ছোঁয়ায় ভারতীয় মননে যে আধুনিকতা, যুক্তিযোগ ও গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তা পরবর্তীতে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আজকের আধুনিক ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার যে মৌলিক অবকাঠামো আমরা দেখতে পাই, তার বহু গোড়াপত্তনই হয়েছিল ঔপনিবেশিক যুগে। অতীত ইতিহাসের এই বিকাশধারা অনুধাবন করা আজকের শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি থেকে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ MCQ:
১️. ম্যাকলে মিনিট প্রকাশিত হয়—
A) 1813
B) 1833
C) 1835
D) 1854
উত্তর: C (1835)
ব্যাখ্যা: ১৮৩৫ সালে Thomas Babington Macaulay ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে তার বিখ্যাত মিনিট প্রকাশ করেন।
২️. উডস ডেসপ্যাচ জারি হয়—
A) 1835
B) 1854
C) 1882
D) 1904
উত্তর: B (1854)
ব্যাখ্যা: ১৮৫৪ সালের উডস ডেসপ্যাচকে ভারতের শিক্ষার “Magna Carta” বলা হয়।
৩️. 1813 সালের চার্টার অ্যাক্টে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ ছিল—
A) ৫০,০০০ টাকা
B) ১ লক্ষ টাকা
C) ৫ লক্ষ টাকা
D) ১০ লক্ষ টাকা
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: প্রথমবার ব্রিটিশ সরকার শিক্ষার জন্য ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে।
৪️. ডাউনওয়ার্ড ফিল্ট্রেশন তত্ত্ব কার সঙ্গে যুক্ত?
A) কার্জন
B) রিপন
C) ম্যাকলে
D) বিদ্যাসাগর
উত্তর: C
ব্যাখ্যা: এই তত্ত্ব অনুযায়ী উচ্চশ্রেণিকে শিক্ষিত করলে শিক্ষা নিচে ছড়াবে।
৫️. হান্টার কমিশন গঠিত হয়—
A) 1854
B) 1882
C) 1902
D) 1917
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: ১৮৮২ সালে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য হান্টার কমিশন গঠিত হয়।
৬️. বিশ্ববিদ্যালয় আইন 1904 প্রবর্তন করেন—
A) লর্ড বেন্টিঙ্ক
B) লর্ড ডালহৌসি
C) Lord Curzon
D) লর্ড রিপন
উত্তর: C
ব্যাখ্যা: কার্জনের এই আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়।
৭️. Saddler কমিশন সম্পর্কিত—
A) প্রাথমিক শিক্ষা
B) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
C) নারী শিক্ষা
D) কৃষি শিক্ষা
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যালোচনার জন্য গঠিত হয়।
৮️. সার্জেন্ট প্ল্যান প্রকাশিত হয়—
A) 1917
B) 1929
C) 1944
D) 1935
উত্তর: C
ব্যাখ্যা: ১৯৪৪ সালে সর্বজনীন শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে সার্জেন্ট প্ল্যান প্রকাশিত হয়।
৯️. উডস ডেসপ্যাচের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য—
A) ইংরেজি নিষিদ্ধ
B) বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব
C) দেশীয় শিক্ষা বন্ধ
D) কৃষি শিক্ষা বাধ্যতামূলক
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়।
১০. ইংরেজি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল—
A) শিল্পোন্নয়ন
B) কেরানি তৈরি
C) গ্রামীণ উন্নয়ন
D) সামরিক প্রশিক্ষণ
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: প্রশাসনিক কাজে সহায়ক শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করা ছিল লক্ষ্য।
১১️. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়—
A) 1854
B) 1857
C) 1882
D) 1904
উত্তর: B
১২️. উডস ডেসপ্যাচকে বলা হয়—
A) Charter Act
B) Education Code
C) Magna Carta of Education
D) Minute Policy
উত্তর: C
১৩️. 1902 সালের বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠন করেন—
A) বেন্টিঙ্ক
B) রিপন
C) কার্জন
D) ডালহৌসি
উত্তর: C
১৪️. নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন—
A) বিদ্যাসাগর
B) কার্জন
C) ম্যাকলে
D) ডালহৌসি
উত্তর: A
১৫️. হান্টার কমিশন গুরুত্ব দেয়—
A) উচ্চশিক্ষা
B) প্রাথমিক শিক্ষা
C) সামরিক শিক্ষা
D) আইন শিক্ষা
উত্তর: B
১৬️. ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি র ফলে কী গড়ে ওঠে?
A) কৃষক শ্রেণি
B) শ্রমিক শ্রেণি
C) মধ্যবিত্ত শ্রেণি
D) সামন্ত শ্রেণি
উত্তর: C
১৭️. ম্যাকলে ভারতীয় ভাষা সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করেন?
A) সমর্থন
B) নিরপেক্ষ
C) বিরোধিতা
D) বাধ্যতামূলক
উত্তর: C
১৮️. চার্টার অ্যাক্ট 1813-এর আরেকটি গুরুত্ব—
A) বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন
B) মিশনারিদের অনুমতি
C) প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক
D) নারী শিক্ষা
উত্তর: B
১৯️. সার্জেন্ট প্ল্যানের লক্ষ্য ছিল—
A) সামরিক শিক্ষা
B) সর্বজনীন শিক্ষা
C) ইংরেজি বাধ্যতামূলক
D) কৃষি উন্নয়ন
উত্তর: B
২০️. ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি র একটি ইতিবাচক ফলাফল—
A) দেশীয় শিক্ষা ধ্বংস
B) জাতীয়তাবাদের উত্থান
C) গ্রামীণ শিক্ষার অবহেলা
D) ইংরেজি আধিপত্য
উত্তর: B
ব্যাখ্যা: পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে নতুন শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি হয়, যারা জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।
ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি: SAQ উত্তর
১. ম্যাকলে মিনিট কী?
১৮৩৫ সালে Thomas Babington Macaulay একটি প্রতিবেদন দেন, যেখানে তিনি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলনের পক্ষে মত দেন। এটি “Macaulay’s Minute” নামে পরিচিত।
২. উডস ডেসপ্যাচ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৮৫৪ সালে প্রকাশিত এই নথিকে ভারতের শিক্ষার “Magna Carta” বলা হয়। এটি প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণ করে।
৩. ডাউনওয়ার্ড ফিল্ট্রেশন তত্ত্ব কী?
এই তত্ত্ব অনুযায়ী প্রথমে উচ্চশ্রেণিকে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হবে, পরে সেই শিক্ষা নিচের স্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
৪. হান্টার কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?
১৮৮২ সালে গঠিত এই কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার উপর জোর দেয়।
৫. সার্জেন্ট প্ল্যান কী?
১৯৪৪ সালে প্রকাশিত একটি শিক্ষানীতি পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু করা।
৬. বিশ্ববিদ্যালয় আইন 1904 কী?
Lord Curzon-এর আমলে পাশ হয়। এই আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করা হয়।
৭. ব্রিটিশ শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য কী ছিল?
প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক কাজে সহায়ক এক শ্রেণির শিক্ষিত কেরানি তৈরি করা।
৮. চার্টার অ্যাক্ট 1813-এর শিক্ষাগত গুরুত্ব কী?
এই আইনে প্রথমবার ভারতে শিক্ষার জন্য ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয় এবং মিশনারিদের শিক্ষা প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়।
৯. ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষানীতি র জনক কাকে বলা হয়?
লর্ড ব্যাবিংটন মেকলে-কে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তক বলা হয়, তবে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ও চার্লস উডের অবদানও ছিল অনস্বীকার্য।
১০. ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষানীতি র ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব লিখ।
ইতিবাচক প্রভাব:
- আধুনিক শিক্ষার প্রসার
- জাতীয়তাবাদের উত্থান
- সামাজিক সংস্কার আন্দোলন
নেতিবাচক প্রভাব:
- দেশীয় শিক্ষার অবমূল্যায়ন
- ইংরেজি ভাষার আধিপত্য
- শিক্ষার শহরকেন্দ্রিকতা